চলে গেলেন জয়নুল আবেদীনের সহকর্মী চিত্রশিল্পী গোপেশ মালাকার

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৩, ০৩:৩৮

রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চারুশিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের প্রাক্তন শিক্ষক এবং বর্ষীয়ান চিত্রশিল্পী গোপেশ মালাকার গত ১৯ এপ্রিল কানাডা সময় ভোরে ৯৫ বছর বয়সে টরন্টোর নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন।

উল্লেখ্য তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী, ভাষা সৈনিক এবং মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক। প্রগতিশীল রাজনীতির এই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সুনামগঞ্জের ছাতকে জন্মগ্রহণ করেন।

সুনামগঞ্জের ছাতক স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় গোপেশ মালাকার কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য পরিচালিত ‘কিশোর বাহিনী’তে যোগ দেন। সেসময় ‘মুকুল ফৌজ’ নামেও একটি শিশু-কিশোর সংগঠন ছিল। অষ্টম শ্রেণীতে উঠে ১৯৩৪ সালে প্রথম কমিউনিস্ট পার্টি গঠনকালে ছাত্রাবস্থায় বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন এবং আজীবন সেই আদর্শ ধারণ করেন। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি জেল খেটেছেন।

কারাগারে থেকেই তিনি মাস্টার্স ডিগ্রি পাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতাকালে চারুকলা ইন্সটিটিউটে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের সহকর্মী হিসাবে কাজ করেছেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের পরে জয়নুল আবেদীনের করা স্কেচ নিয়ে যে প্রদর্শনী হয়, সেটির মূল উদ্যোক্তা ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। ৫০’র মন্বন্তরের সময় জয়নুল আবেদীনের ৩টি স্কেচ ও সুনীল জানার আঁকা ২টি ছবি দিয়ে পিকচার কার্ড ছাপানো হয়। তৎকালীন ছাত্র ফেডারেশন তা বিক্রির উদ্যোগ নেয়। সিলেটে সেই পিকচার কার্ড কয়েক হাজার বিক্রি হয়।

টরন্টোস্থ লেখক উজ্জ্বল দাশ তার বর্ণাঢ্য জীবন সম্পর্কে জানান, গোপেশ মালাকারকে ছবি আঁকায় উৎসাহিত করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। সে সময়ে সিলেটের মফস্বলে নানকার আন্দোলন গড়ে ওঠে। সিলেটে এর প্রচারের দায়িত্ব পরে গোপেশ মালাকারের ওপর। নানকার আন্দোলনের প্রচারপত্র বিলি করার সময় তিনি প্রথম গ্রেপ্তার হন। জেলখানায় মনকে চাঙা রাখার জন্য কাঠ-কয়লা দিয়ে দেয়ালে বিদ্রোহের ছবি আঁকতেন তিনি। মূলত প্রেস অ্যাক্ট ও স্পেশাল অরডিন্যান্সে তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

৫৮’ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করেন। আর্ট ইন্সটিটিউটের শিক্ষকরাও রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে কর্মসূচি নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করেন। এ কাজে নেতৃত্ব দেন শিল্পী জয়নুল আবেদীন ও কামরুল হাসান। ৫৮’ সালে সিদ্ধান্ত হয় বাংলার ঐতিহ্য নিয়ে বড় আকারে একটি প্রদর্শনী করা হবে ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণে। গোপেশ মালাকার প্রদর্শনী কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়ে আয়োজিত হয় এই প্রদর্শনী; যা দর্শক ও বাঙালি জাতিকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আন্দোলিত করে। সংগ্রহ করা হয় নকশি কাঁথা, নকশি পিঠার ছাঁচ, বিভিন্ন হস্তশিল্প, লোকজ পোশাক, মৃৎপাত্র ও শাড়ি। শণের ঘরের ছাঁচে বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি হয় মূল গেট। প্রবেশ পথে এই প্রথম আঁকা হয় আলপনা।

এই প্রদর্শনীতে ৫৮ সালেই প্রথম ইনস্টিটিউটের বকুল তলায় সভার আয়োজন করা হয়। ৫৮’র চারুকলা প্রদর্শনীর পরের বছর থেকে আলপনা আঁকার ঐতিহ্য আর্ট ইনস্টিটিউটের চৌহদ্দি পেরিয়ে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত পৌঁছায়। নকশি পিঠাও যে বাঙালি ঐতিহ্যের অংশ হতে পারে, ৫৮র চারুকলা প্রদর্শনীর মাধ্যমে তা প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবেই চারুকলা ইনস্টিটিউট বাঙালির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি ৪২টি বই লিখে গিয়েছেন। আর তাঁকে নিয়ে ‘গোপেশ মালাকারঃ তাঁর জীবন ও সময়’ শীর্ষক বই লিখেছেন তাজুল মোহাম্মদ। মৃত্যুকালে তার দুই সন্তানের একজন সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এবং আরেকজন কানাডা প্রবাসী। টরন্টোতেই মালাকারের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। তার মৃত্যুতে কানাডা প্রবাসীদের মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি