শহিদ ক্যাপ্টেন কাদের বীর-উত্তম 

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৩, ০২:৩৩

পশ্চিম পাকিস্তানের হায়দ্রাবাদের কর্মস্থল থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি ’৭১-এ ছুটিতে ঢাকার বাড়িতে আসেন ৪০ ফিল্ড আর্টিলারি রেজিমেন্টের টগবগে তরুণ সেনা অফিসার ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের। ১৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম এসে খালাতো বোন মোর্শেদা জুলিয়াকে গোপনে কোর্টম্যারেজ করে আবার ফিরে যান ঢাকায়। সেখান থেকে ২ এপ্রিল পার্বত্য চট্টগ্রামের ভারত সীমান্তবর্তী মহকুমা শহর রামগড়ে আসেন।

দেশমাতৃকার প্রেমে ব্যাকুল তেজদীপ্ত বাংলার বীর সেনানি ক্যাপ্টেন কাদেরের নেতৃত্বে রামগড় হাইস্কুল মাঠে বিরামহীনভাবে চলতে থাকে যুব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। রামগড়ের একমাত্র সেনা অফিসার কাদের স্থানীয় ইপিআরের সুবেদার মফিজুল বারী, হাবিলদার আবুল কাশেমসহ কয়েক জন ইনস্ট্রাক্টর এবং স্বল্পসংখ্যক অস্ত্র নিয়ে পরিচালনা করেন গেরিলাযুদ্ধের প্রশিক্ষণ। রামগড় আসার পর ক্যাপ্টেন কাদের প্রথম অপারেশন পরিচালনা করেন ফেনীর শুভপুর এলাকায়। রণ কৌশলের আবশ্যকীয়তায় ক্যাপ্টেন কাদের পরিকল্পনা নিয়ে ইপিআরের হাবিলদার কাশেমের প্লাটুনসহ মিরসরাইর জোরারগঞ্জে স্থাপন করেন প্রতিরক্ষা ঘাঁটি। রাঙ্গামাটি শহরে পাকিস্তানি বাহিনীর বড় সমাবেশের খবর পেয়ে ক্যাপ্টেন কাদের তার গ্রুপ নিয়ে বন্দুক ভাঙ্গা নামক এক দ্বীপের মতো স্থানে অবস্থান নেন। এখানে ২১ এপ্রিল দুই লঞ্চবোঝাই পাকিস্তানি সেনাদল হঠাত্ আক্রমণ চালায় মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর। ক্যাপ্টেন কাদেরের নেতৃত্বে যুদ্ধ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছাত্র শওকত ও অন্যান্য সদস্যরা শত্রুদের ওপর বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ করে। ঘণ্টাব্যাপী চলা এ প্রচণ্ড যুদ্ধে শত্রু পক্ষের বেশ কয়েক জন হতাহত হওয়ার পর তারা পিছু হটে যায়। বন্দুক ভাঙ্গায় দুই দিন অবস্থানের পর মেজর শওকতের নির্দেশ পেয়ে ২৪ এপ্রিল তিনি গ্রুপ নিয়ে রওনা হন মহালছড়ির উদ্দেশে। মহালছড়ি যাওয়ার পথে বুড়িঘাট এলাকায় শত্রু পক্ষের অতর্কিত আক্রমণের শিকার হলে ক্যাপ্টেন কাদের ও তার দুই সহযোদ্ধা—হাবিলদার সায়ীদ ও হাবিলদার তাহের তিন জন তিনটি এলএমজি নিয়ে প্রবল আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর। এখানেও শত্রুরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়ে লঞ্চ নিয়ে পালিয়ে যায়। এভাবে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড হামলার মুখে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে স্থল আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে বিমান ও হেলিকপ্টারের সাহায্যেও শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্ভাব্য অবস্থান—ঘাঁটির ওপর প্রবল হামলা। এ অবস্থায় পার্বত্য এলাকায় পূর্ব ট্রেনিংবিহীন মুক্তিযোদ্ধারা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। রসদ ও গোলাবারুদ সংকটও দেখা দেয় তাদের। এই প্রতিকূল ও দুর্বল মুহূর্তে ২৭ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের এক কোম্পানি সৈন্য (১৩৬ জন) এবং একটি মিজো ব্যাটালিয়নকে (১০০০ জন) সঙ্গে নিয়ে আক্রমণ চালায় মহালছড়িতে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর। মেজর মীর শওকত এবং চন্দ্রঘোনা পেপার মিলের প্রকৌশলী ইসহাকের নেতৃত্বে ঐ সময় শত্রুদের আক্রমণ প্রতিহত করা হচ্ছিল। এর মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী হেলিকপটারযোগে দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটালিয়নের আরো এক কোম্পানি সৈন্য এখানে নামিয়ে দিয়ে যায়। দুই পক্ষের প্রচণ্ড এ যুদ্ধের মধ্যে বেলা ৩টায় ক্যাপ্টেন কাদেরের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি মহালছড়ি এসে পৌঁছে। অসীম সাহস আর সুদক্ষ যুদ্ধ কৌশল গ্রহণ করে টগবগে তরুণ সেনা অফিসার কাদের সঙ্গীদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রু মোকাবিলায়। তিন-চার গুণ অধিকসংখ্যক শত্রু পক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় চারপাশ ঘিরে ফেলে। চরম এ বিপজ্জনক অবস্থায় সহযোদ্ধারা পশ্চাত্পসরণের পরামর্শ দেন ক্যাপ্টেন কাদেরকে। কিন্তু অকুতোভয় তেজদীপ্ত বীর সেনানি সহযোদ্ধা ছাত্র শওকত, ফারুক এবং দুই ইপিআর সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে তিনটি এলএমজির অবিরাম গুলিবৃষ্টি কোণঠাসা করে ফেলে শত্রুদের। এই চরম মুহূর্তে হঠাত্ শত্রুর অস্ত্রের কয়েকটি গুলি এসে বিঁধে তার ডান বগলের কয়েক ইঞ্চি নিচে এবং পেটের বাম পাশে। গুলিবৃষ্টির মধ্যেই গুরুতর আহত কাদেরকে বহন করে একটু নিরাপদ স্থানে নিয়ে আসেন শওকত, ফারুক ও ইপিআরের ড্রাইভার আব্বাস। সেখান থেকে জিপগাড়িযোগে রামগড়ে আসার পথে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বাংলার এ তরুণ বীরযোদ্ধা। তখনো তার বিয়ের মেহেদীর রং হাত থেকে মুছে যায়নি। ঐদিন শেষ বিকালে সহযোদ্ধা ফারুক, শওকত ও ড্রাইভার আব্বাস বীর শহিদের মরদেহ নিয়ে আসেন রামগড়ে। পরে রামগড় কেন্দ্রীয়  কবরস্থানে পূর্ণ সামরিক ও ধর্মীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়।

ক্যাপ্টেন কাদেরের দুঃসাহসিক অবস্থান ও ভূমিকার কারণে মেজর শওকতের নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর কমপক্ষে ৫০০ সদস্য নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে ঐদিন রক্ষা পেয়েছিল। ঐ ভয়াবহ যুদ্ধে মিজো ব্যাটালিয়নের ৪০০ সৈন্য এবং পাকিস্তানি বাহিনীর কমান্ডো কোম্পানির ৪০ জনের মতো সৈনিক হতাহত হয়।

মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ ও গৌরবোজ্জ্বল অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪  সালে সরকার ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরকে মরণোত্তর ‘বীরউত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জের টিওরী গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক ড. এম আব্দুল কাদের এবং রওশন আরা বেগমের ৮ পুত্রের মধ্যে ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদেরসহ পাঁচ জনই মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। এদের মধ্যে রেজাউল কাদের, সিরাজুল কাদের ও এমদাদুল কাদের যুদ্ধ শেষে মায়ের কোলে ফিরে এলেও শহিদ হন দুই ভাই ক্যাপ্টেন আফতাবুল কাদের ও ঢাকা ডেন্টাল কলেজের ছাত্র আহসানুল কাদের মামুন। তবে শহিদ আহসানুল কাদেরের সমাধি আজও খুঁজে পাননি বলে জানালেন তার ভাই অবসরপ্রাপ্ত সচিব ও রাষ্ট্রদূত ড. আফসারুল কাদের ও অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের।

লেখক : সাংবাদিক

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন