আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর, বিচক্ষণ কূটনীতিক, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুরোধা এবং এক বটবৃক্ষ। ২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল ৮৩ বছর ৩ মাস ১২ দিন বয়সে (১৯২২-২০০৫) ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। আজ তার ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাঙালি জাতি তাঁকে আজ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
আব্দুস সামাদ আজাদ ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুরোধা, দেশপ্রেমিক এবং বঙ্গবন্ধুর আপনজন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে কাকা ডাকতেন। ত্রিকালদর্শী তিন পতাকার প্রত্যক্ষদর্শী এই রাজনীতিবিদ ব্রিটিশ-পাকিস্তান দেখে বাংলাদেশ নির্মাণে দেহমন বিলিয়ে দিয়েছিলেন, যে কারণে রাজনীতিতে মহিরুহে পরিণত হয়েছিলেন। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় সমগ্র বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে-ময়দানে সক্রিয় ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বে জনমত গঠন ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তিতে তার অবদান অবিস্মরণীয়।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের দশ জনের মিছিলের প্রস্তাবক ও নির্দেশক ছিলেন তিনি। অনেকেই ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে থাকলেও সামাদ আজাদের সহযোগিতায় মিছিল বের হয়। এই অভিযোগে গ্রেফতার হয়ে তিনি কারাভোগ করেন। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখলের পর তার ওপর হুলিয়া জারি করে মাথার মূল্য ৫০ হাজার টাকা ঘোষণা করে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল। কিছুদিন আত্মগোপনে থাকলেও পরে গ্রেফতার হয়ে চার বছর জেলে থাকার পর ’৬২ সালে মুক্তি লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভারত সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্কের মাধ্যমে মুজিবনগর সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ছিলেন মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূত। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বে জনমত গঠনে কাজ শুরু করেন।
১৯৭১ সালে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে বিশ্বশান্তি সম্মেলনে তিন সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে হাজার বছর যুদ্ধ চালিয়ে যাবে বাংলার মানুষ। সম্মেলনে সামাদ আজাদকে বিশ্ব বর্ণবৈষম্য নিরসন কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়। তিনি আন্তর্জাতিক সংহতি ও জাতিসংঘের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অনুপম দলিল। সম্মেলনে হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট আব্দুস সামাদকে ‘আজাদ’ বলে বারবার সম্বোধন করলে আব্দুস সামাদ বোঝাতে চেষ্টা করেন তার নাম সামাদ, আজাদ নয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট পুনরায় বলেছিলেন, আজাদ শব্দের অর্থ আমি জানি, তোমার দেশ আজাদ (মুক্ত) হবে। তখন থেকে সামাদ শব্দের পরে আজাদ যুক্ত হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু মুক্তিলাভের পর দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে ১০ লাখ মানুষের উপস্থতিতে শ্রীমতি ইন্ধিরা গান্ধী যে সংবর্ধনা দেন, তার মূল কারিগর ছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ। তিনি আগে থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে বঙ্গবন্ধুকে ঐতিহাসিক বিরল সম্মান জানানোর ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্ধিরা চুক্তির ক্ষেত্রে ক্যারিশমাটিক সাফল্য দেখিয়েছেন তিনি। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৪ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের সম্মেলনে যখন চরম কোন্দল, বিশৃঙ্খলা, তখন সামাদ আজাদ সম্মেলনের অভ্যর্থনা কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়ে শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে ইতিহাসে নজিরবিহীন সফলতা অর্জন করেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেদিন উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমরা দেশি-বিদেশি শত্রুদের ঘৃণ্য চক্রান্ত ব্যর্থ করতে সক্ষম হয়েছি।’
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর সিলেট থেকেই এরশাদবিরোধী আন্দালন শুরু হয়। এই আন্দোলনের মূল নায়ক ছিলেন সামাদ আজাদ। তিনি প্রতি সপ্তাহে ঢাকা থেকে সিলেটে এসে অতিগোপনে ছাত্রনেতাদের নিয়ে বৈঠক করে আন্দোলনের নির্দেশনা দিতেন। আমি নিজেও কাছ থেকে এসব ঘটনা দেখেছি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আইকে গুজরাল, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জোতিবসু ছিলেন সামাদ আজাদের ঘনিষ্ঠজন। কূটনৈতিক তৎপরতা ছাড়াও ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ১৯৯৭ সালে ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন চুক্তি সম্পাদন করেন। তার হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন করা হয়।
১৯২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওরের তীরে ভূরাখালী গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতার নাম শরীয়তউল্লাহ। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে সুনামগঞ্জ জুবলী উচ্চ বিদ্যালয়ে থেকে এসএসসি, সিলেট এমসি কলেজ থেকে এইচএসসি ও স্নাতক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও ইতিহাস শাস্ত্রে এমএ পাশ করেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় তার এমএ ডিগ্রি কেড়ে নেওয়া হয়। ১৯৭০ সালে নির্বাচনে গণপরিষদের সদস্য, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২ ও ৩ আসন, ১৯৯১ সালে সুনামগঞ্জের তিনটি আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে নিজ আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে পুনরায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে নির্বাচিত হয়ে প্রবাসী কল্যাণ বৈদেশিক মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।
সামাদ আজাদকে নিয়ে আমার অনেক স্মৃতি জড়িত। কিন্তু এক লেখায় সবকিছু লেখা মোটেই সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকাকালে বাড়িতে আসা-যাওয়ার সময় সিলেট-বিশ্বনাথে পাঁচ জন নেতাকর্মীর জমায়েত দেখলেই গাড়ি থেকে নেমেই কথা বলতেন। আপদে-বিপদে পাশে দাঁড়াতেন। তার এত প্রখর স্মরণশক্তি ছিল যে, একবার নাম শুনলেই পরে পরিচয়ের কোনো দরকার থাকে না। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থেকেই তার এমন স্বভাব হয়েছে বলে নিজেই স্বীকার করতেন। রাজনীতির বরপুত্র আব্দুস সামাদ আজাদের বাড়িটি জীবনে প্রথম দেখতে যাই। সেখানে তার থাকার ঘরে দুটি চেয়ার, একটি খাট, বঙ্গবন্ধু ও তার এবং পুত্র ডনের তিনটি পৃথক ছবি ঘরের দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে। সাদামাটা এই ঘরে শুয়ে থাকতেন মানবতার নেতা সামাদ আজাদ। বাড়িতে মসজিদ, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। সারা বছর, বিশেষ করে শীত মৌসুম্যে শত শত পর্যটক তার বাড়িতে ভিড় জমান। কিন্তু জাতীয় এই নেতার কর্মজীবনের কোনো প্রমাণাধি সংরক্ষিত নেই। সামাদ আজাদের নিকটাত্মীয় সাইদুর রহমান জানালেন, দেশ ও জাতির জন্য অনেক কিছু করলেও নিজের জন্য কিছু করেননি। এনামুল হক জিতু একটি ঘর দেখিয়ে বলেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে শত শত অতিথিকে এই বাংলোতেই আপ্যায়ন করেছি। এখনো দল বেঁধে লোকজন বাড়িতে আসেন। অথচ আমাদের হাতে তার কোনো স্মৃতি নেই। এলাকাবাসী তার ভিটেমাটিতে একটি জাদুঘর নির্মাণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। সামাদ আজাদ প্রায়ই বলতেন, এ দেশেতেই জন্ম আমার এ দেশেতেই যেন মরি। বঙ্গবন্ধুর সহপাঠী হয়ে সৌভাগ্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণের একমাত্র উপায় ছিল তার মেধা ও বিচক্ষণতা।
লেখক : কলামিস্ট ও সমাজবিশ্লেষক
