হালদা নদীর গুরুত্ব

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৩, ০২:৩৫

বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক নদ-নদী রয়েছে। এর মধ্যে হালদা হচ্ছে ছোট্ট একটি নদী। কিন্তু এই নদীর বৈশিষ্ট্য অন্য যে কোনো নদীর চেয়ে আলাদা। প্রথম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, হালদা একান্তই আমাদের নিজস্ব নদী। এর উত্পত্তি, বিস্তার এবং সমাপ্তি সবই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। দ্বিতীয়ত, হালদা নদী এখন আন্তর্জাতিকভাবে একটি জনপ্রিয় নদীতে রূপ নিয়েছে। হালদা বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী, যেখান থেকে রুইজাতীয় মাছের (রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ) নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। পৃথিবীর আর কোনো জোয়ার-ভাটার নদী থেকে রুইজাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা যায় না। বাংলাদেশে মৎস্য প্রজননক্ষেত্র অনেকগুলো আছে, কিন্তু মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয় এমন নদী একটিও নেই। হালদা নদীর প্রজনন সময় হচ্ছে এপ্রিল, মে, জুন এই তিন মাস। এই তিন মাসে ছয়টি ‘জো’ আছে। অর্থাৎ অমাবস্যা, পূর্ণিমা তিথিতে এখানে রুইজাতীয় মাছ নিষিক্ত ডিম ছাড়ে। যে কোনো জো’র সময় এখানে মা মাছ নিষিক্ত ডিম ছাড়ে। এ বছর ইতিমধ্যে ডিম ছাড়ার সময় হয়েছে। হালদা হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক জিন ব্যাংক।

এই প্রাকৃতিক জিনপুল বাঁচিয়ে রাখার জন্য হালদা নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। অন্যান্য উৎস এবং কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্রগুলোতে অপরিকল্পিত প্রজনন ও ইনব্রিডিংয়ের কারণে মাছের বৃদ্ধি মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে এবং বামনত্ব, বিকলাঙ্গতাসহ বিভিন্ন ধরনের জিনগত সমস্যা দেখা দিচ্ছে। রুইজাতীয় মাছের ওয়াইন্ড স্টক আছে একমাত্র হালদা নদীতে। মূলত সে কারণেই আমরা হালদা নদীকে প্রাকৃতিক জিন ব্যাংক বলি। কোনো কারণে হালদা নদীর মাছ যদি ক্ষতিগ্রস্ত বা অন্য মাছের সঙ্গে ক্রস হয়ে যায়, তাহলে পৃথিবী থেকে অরিজিনাল রুইজাতীয় মাছের অস্তিত্ব হারিয়ে যাবে। রুইজাতীয় মাছের প্রকৃত বংশধরদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য হালদা নদীর প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের বিকল্প নাই। হালদা নদীকে চট্টগ্রামের ‘লাইফ লাইন’ বলা হয়। কারণ চট্টগ্রাম শহরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষ বসবাস করে। তাদের চাহিদা মেটানোর জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত যে পানি সরবরাহ করে, তার মধ্যে প্রতিদিন ১৮ কোটি লিটার পানি এই হালদা নদী থেকে সংগ্রহ করা হয়। চট্টগ্রাম শহরের একদিকে বঙ্গোপসাগর, একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে মারাত্মক দূষণের শিকার কর্ণফূলী নদী। চট্টগ্রামের একমাত্র ফ্রেশ ওয়াটার সোর্স হচ্ছে হালদা নদী। কোনো কারণে যদি হালদা নদী বিপন্ন হয়, তাহলে চট্টগ্রমের মানুষের জীবনযাত্রাই বিপন্ন হবে।

দেশের অর্থনীতিতেও হালদা নদী ব্যাপক অবদান রাখছে। হালদা থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়, তা থেকে উৎপাদিত রেণু, রেণু থেকে ধানি, ধানি থেকে আঙ্গুলি এবং আঙ্গুলি থেকে খাবারের জন্য মাছ সংগ্রহ করা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে হালদা নদী বছরে ৮০০ কোটি টাকার অবদান রাখে। শুধু মাছ এই পরিমাণ অবদান রাখে। পানি এবং অন্যান্য সম্পদের মূল্য বিবেচনায় নিলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হালদার অবদান ২০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করে যাবে। জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় হালদা নদী গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। আইইউসিএনের রেড লিস্ট অনুযায়ী, পৃথিবীতে বর্তমানে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ ফ্রেশ ওয়াটার ডলফিন বা গাঙ্গেয় ডলফিন বেঁচে আছে। হালদা নদীতে এখনো ১৪৭টি গাঙ্গেয় ডলফিন বেঁচে আছে। আগে অন্যান্য নদীতেও এই ডলফিন পাওয়া যেত। অনেক নদী থেকে এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। একমাত্র হালদা নদীতেই এই ডলফিনের সবচেয়ে বড় পপুলেশন পাওয়া যায়।

২০০১ সাল থেকে হালদা নদীতে ডিম সংগ্রহের গতি ক্রমশ নিচের দিকে চলে এসেছে। এভাবে কমতে কমতে ২০১৬ সালের দিকে হালদা নদীতে নিষিক্ত ডিম আহরণের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি চলে আসে। এটা আমাদের জন্য সবচেয়ে অ্যালার্মিং বিষয় ছিল। এটা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। তাই আমরা এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য নতুনভাবে কাজ শুরু করি। হালদা নদীতে ডিমের পরিমাণ এভাবে কমে যাওয়ার পেছনে কিছু কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। এর মধ্যে অন্যতম কারণ ছিল মানিকছড়ি এলাকায় ব্যাপকভাবে তামাকচাষ। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চালানো হয়। বাংলাদেশে একমাত্র হালদা নদী, যা সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয়েছে।

হালদা নদীর একটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এতে বেশ কিছু ‘কুম’ আছে। মা মাছগুলো এসব কুমের মধ্যে বসবাস করে এবং ডিম ছাড়ে। (কুম হচ্ছে কোনো স্রোতস্বিনী নদীর স্রোতের মাধ্যমে সৃষ্ট গভীর স্থান)। ২০২০ সালে হালদা নদীতে নিষিক্ত ডিম আহরণের চিত্র ইউটার্ন নেয়। সেই বছর থেকে ডিম সংগ্রহের পরিমাণ আবারও বাড়তে শুরু করে। ২০২০ সালে বিগত ১৪ বছরের মধ্যে হালদা নদীতে সবচেয়ে বেশি ডিম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এর আগে ২০০৬ সালে ৩২ হাজার ৬২৪ কেজি ডিম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। ২০১৭ সাল থেকে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন হালদা নদীকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসে। এর ফলে ২০২০ সালে ভালো রেজাল্ট পাওয়া সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ২০২১ এবং ২০২২ সলে এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এ সময় মা মাছগুলো শতভাগ নিরাপদ ছিল। আগে মা মাছগুলো ধরে ফেলা হতো। দূষণমুক্ত করার ক্ষেত্রেও হালদা নদী বাংলাদেশের মধ্যে একটি রেকর্ড। আর দেশের কোনো নদী এতটা দূষণমুক্ত হতে পারেনি। আরো কয়েক বছরের মধ্যে হালদাকে আমরা হয়তো সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত করতে পারব। কিন্তু হালদা সংরক্ষণের জন্য যেরকম প্রচেষ্টা হচ্ছে, সেভাবে আমরা রেজাল্ট পাইনি। এর কারণ হচ্ছে আবহাওয়াগত সমস্যা। ২০২১ সালে যখন ডিম ছাড়ার সময়, তখন ঘূর্ণিঝড় আম্ফান আঘাত হানে। ফলে উচ্চমাত্রায় জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়। রেকর্ড পরিমাণ জোয়ারের পানি হালদা নদীতে প্রবেশ করে। জোয়ারের সঙ্গে প্রচুর পরিমাণ লবণাক্ত পানি হালদায় প্রবেশ করে। এতে মা মাছের ডিম ছাড়ার উপযুক্ত পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। মা মাছগুলো ডিম ছাড়ার পরিবর্তে নিজেদের প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করেছে। ২০২২ সালে এসে নতুন একটি সমস্যা দেখা দেয়। এ বছরের এপ্রিল, মে ও জুন মাসে চট্টগ্রামে কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। মা মাছ ডিম দেওয়ার উপযোগী অবস্থায় ছিল, কিন্তু অনুকূল পরিবেশের অভাবে তারা ডিম দিতে পারেনি।

হালদা নদীতে মা মাছের ডিম ছাড়ার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে মনুষ্য সৃষ্ট যেসব সমস্যা আছে, তার বেশির ভাগই আমরা সমাধান করতে পেরেছি। প্রথমেই উল্লেখ করা প্রয়োজন মা মাছগুলো ধরে ফেলার সমস্যা কথা। আগে ডিম দিতে আসা মা মাছগুলো ধরে ফেলা হতো। আমরা সমন্বিত চেষ্টার ফলে এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সমর্থ হয়েছি। পল্লি কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ), আইডিএফ এখানে কিছু স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দিয়েছে, যারা মা মাছ ধরা থেকে মানুষকে বিরত রাখে। স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেওয়া হয়, যারা মাছের ডিম সংগ্রহ করেন তাদের মধ্য থেকে। এরপর আসে তামাক চাষের বিষয়টি। পল্লি কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আমরা তামাক চাষ প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। তামাকচাষিদের আইডিএফ-পিকেএসএফ থেকে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার মাধ্যমে তামাক চাষের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোটায় নিয়ে আসা হয়েছে। দূষণ প্রতিরোধের ব্যাপারে সরকার খুবই আন্তরিকভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর সরকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে হালদা নদীকে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা করেছে। হালদাই একমাত্র নদী, যাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। হাটহাজারীতে সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ১০০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে এশিয়ান পেপার মিল এখন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একটি সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। অন্যান্য আবাসিক এলাকার মাধ্যমে পরিত্যক্ত বর্জ্য হালদা নদীতে পড়ে। আমরা চট্টগ্রামে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি, কীভাবে এই আবাসিক এলাকার পরিত্যক্ত বর্জ্য হালদা নদীতে না ফেলে অন্য কোনো স্থানে ফেলা যায়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আমাদের দাবির সঙ্গে একমত। তারা ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে কাজ শুরু করে দিয়েছে। হয়তো এ বছরের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে। আর সেটা করা গেলে বর্জ্য থেকে হালদা নদীর দূষণ ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

হালদা নদীর একটি জটিল সমস্যা হচ্ছে, পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর ভাঙন রোধের জন্য একটি প্রকল্প চালু করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় নদীতে ব্লক ফেলার জন্য প্রচুর পরিমাণে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করেছে। তারা সেনাবাহিনীর একটি ইউনিটের মাধ্যমে এ কাজ করছে। এ কাজ করতে গিয়ে হালদা নদী যে একটি প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননকেন্দ্র, তারা সেটি বিবেচনায় রাখেনি, এমনকি আমাদের সঙ্গেও এ বিষয়ে কোনো ধরনের আলোচনা করেনি। অন্য দশটি নদীতে ব্লক ফেলে যেভাবে কাজ করা হয়, এখানেও ঠিক সেভাবেই কাজ করা হয়েছে। এতে হালদা নদীর মা মাছের আবাসস্থল ‘কুম’গুলো ভরাট করে ফেলেছে। ১০টি কুমের মধ্যে ৭টি কুমই ভরাট করে ফেলা হয়েছে। অন্য কুমগুলোও ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

লেখক : চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও কো-অর্ডিনেটর, হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
অনুলিখন : এম এ খালেক

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন