সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০
দৈনিক ইত্তেফাক

সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখল করতে গিয়ে যেভাবে নাস্তানাবুদ হয়েছিলেন

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২৩, ১৬:৩২

সেদিন ভোরবেলা, ট্যাঙ্ক, হেলিকপ্টার আর ট্রাক নিয়ে প্রায় এক লক্ষ ইরাকি সৈনিক কুয়েতের সীমানায় ঢুকে পড়েছিল। সেই সময়ে ইরাকের সেনাবাহিনী বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম সেনাবাহিনী ছিল। খবর বিবিসি। 

এক ঘণ্টার মধ্যেই ইরাকী সেনাবাহিনী কুয়েত শহরে পৌঁছে যায় আর দুপুরের মধ্যেই ইরাকী ট্যাঙ্ক কুয়েতের রাজপ্রাসাদ দসমান প্যালেস ঘিরে ফেলে।

কুয়েতের আমির ততক্ষণে পালিয়ে সৌদি আরবে পৌঁছে গিয়েছিলেন। তার প্রাসাদে রেখে গিয়েছিলেন সৎভাই শেখ ফাহাদ আল আহমেদ আল সাবাহকে। ইরাকী সেনারা তাকে দেখামাত্রই গুলি করেছিল।

বাথ অভ্যুত্থানের ২২ তম বার্ষিকী পালনের সময়েই সাদ্দাম হোসেন কুয়েতের কাছে একটা দাবিনামা পেশ করেছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী এক ইরাকী সেনার কথায়, তার মৃতদেহ একটা ট্যাঙ্কের সামনে রেখে তার ওপর দিয়ে ট্যাঙ্ক চালিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কুয়েত আক্রমণ করার আগে বাথ অভ্যুত্থানের ২২তম বার্ষিকী পালনের সময়েই সাদ্দাম হোসেন কুয়েতের কাছে একটা দাবিনামা পেশ করেছিলেন।

এর মধ্যে ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থির করার অধিকার, উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ে কুয়েত থেকে নেওয়া ঋণ মওকুফ এবং ইরাকের পুনর্নির্মাণে সাহায্য করার জন্য মার্শাল পরিকল্পনার অনুকরণে একটা আরব পরিকল্পনা বানানোর মতো দাবি।

প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ইরাকী টিভিতে ধমকের সুরে বলেছিলেন, ‘‘যদি কুয়েত আমাদের কথা না মানে তাহলে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো উপায় থাকবে না।’’

সাদ্দাম হোসেনের জীবনী

সাদ্দামকে বোঝানোর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ

সৌদি রাজনীতিক ও শাহ ফাহাদের ঘনিষ্ঠ পরামর্শদাতা ড. গাজি আলগোসেইবি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘উপসাগরীয় যুদ্ধের সময়ে ইরাককে দেওয়া ঋণ ফেরত পাওয়ার আশা সৌদি আরব আর কুয়েত দুটি দেশই মোটামুটিভাবে ছেড়ে দিয়েছিল।’’

‘‘কিন্তু তারা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে ওই ঘোষণা করে দেয়, তাহলে ভুল বার্তা যেতে পারে বলে তারা মনে করেছিল।’’

‘‘শাহ ফাহাদ সাদ্দাম হোসেনকে ঋণ মওকুফ করার বার্তা দিয়েছিলেন, কিন্তু সাদ্দাম এরকম একটা আভাস দিয়েছিলেন যে তিনি সৌদি আরবের এরকম একটা অবস্থানে খুশি নন। তখনই শাহ ফাহাদ বুঝে গিয়েছিলেন যে কুয়েতের খারাপ সময় আসছে।’’

সাদ্দাম হোসেন অবশ্য কুয়েতের সামনে তার দাবিনামা প্রকাশ করার আগেই সেদেশে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। ২১ জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার ইরাকী সৈন্য কুয়েতের সীমান্তের দিকে রওনা হয়ে গিয়েছিল।

২৫ জুলাই দুপুর একটার সময়ে বাগদাদে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত এপ্রিল গিলেস্পিকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কুয়েত অভিযান নিয়ে তার মতামত জানতে চেয়েছিলেন সাদ্দাম হোসেন।

তার আগে, ফেব্রুয়ারি মাসেই গিলেস্পির সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের একটা কূটনীতিক মতবিরোধ হয় গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ভয়েস অফ আমেরিকার এক সম্প্রচারে সাদ্দামের ইরাককে চোসেস্কুর রোমানিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন সেই সম্প্রচারে।

গিলেস্পি ওই সম্প্রচারের জন্য সাদ্দাম হোসেনের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেছিলেন ইরাকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর কোনও অভিপ্রায় নেই যুক্তরাষ্ট্রের। ২৫ জুলাইয়ের বৈঠকটা সাদ্দাম হোসেন এভাবেই শেষ করেছিলেন, কুয়েতের সঙ্গে যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে ইরাক মৃত্যু স্বীকার নিশ্চই করে নেবে না।

সৌদি আরবের শাহ ফাহাদের সঙ্গে সাদ্দাম হোসেন।

সাদ্দামের মনোভাব নিয়ে অনুমান ভুল ছিল

সাদ্দাম হোসেনের জীবনীকার কন কফলিন ‘সাদ্দাম দা সিক্রেট লাইফ’-এ লিখেছেন, ‘‘ওই বৈঠক শেষ করে গিলেস্পির ধারণা হয়েছিল যে সাদ্দাম হোসেন ফাঁকা হুমকি দিচ্ছেন, কুয়েতের ওপরে সত্যিই হামলা করার কোনো অভিপ্রায় তার নেই।

’’পাঁচদিন পরে তিনি প্রেসিডেন্ট বুশের সঙ্গে শলা-পরামর্শ করার জন্য ওয়াশিংটন গিয়েছিলেন। কিছুদিন পরে গিলেস্পি-সাদ্দাম বৈঠকের খবর যখন প্রকাশিত হলো, সেখানে গিলেস্পির ব্যাপারে বলা হলো যে তার চিন্তাভাবনা শিশুসুলভ। এটাও লেখা হলো যে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নাকি সাদ্দাম হোসেনকে কুয়েত অভিযানের সবুজ সংকেত দিয়েছেন,” লিখেছেন কন কফলিন।

গিলেস্পি এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। ১৯৯০ এর দশকে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি বা অন্য কেউই ভাবতেও পারি নি যে ইরাক কুয়েত দখল করার পরিকল্পনা করছে।’’

এই ঘটনায় কুয়েতি, সৌদি আর পশ্চিমা বিশ্লেষক, প্রত্যেকের চিন্তাভাবনাই ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। মিশরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক তো ব্যক্তিগতভাবে ওয়াশিংটন আর লন্ডনকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে কুয়েত আক্রমণ করার কোনও পরিকল্পনা নেই সাদ্দাম হোসেনের। কূটনীতির মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধান হবে, এমনটাও বলেছিলেন তিনি।

প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ইরাকের ওপরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন

বিনা বাধায় কুয়েতে প্রবেশ করল ইরাকী বাহিনী

২ অগাস্ট, ১৯৯০ রাত দুটোর সময়ে প্রায় এক লক্ষ ইরাকী সৈন্য ৩০০টি ট্যাঙ্ক নিয়ে কুয়েতের সীমানা পার হয়। কুয়েতের ১৬ হাজার সদস্যের সেনাবাহিনীর পক্ষে ইরাকী বাহিনীকে মোকাবিলা করা অসম্ভব ছিল। তাই সীমান্তে কোনো বাধার মুখেই পড়তে হয় নি ইরাকী বাহিনীকে।

যখন ইরাকী বাহিনী রাজধানী কুয়েত শহরে পৌঁছায়, তখন সামান্য বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কুয়েতের বাহিনী। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের কব্জা করে ফেলে সাদ্দাম হোসেনের বাহিনী।

কুয়েতের যুদ্ধবিমানগুলো আকাশে উড়েছিল ঠিকই, কিন্তু ইরাকী বাহিনীর ওপরে বোমাবর্ষণ করতে নয়, তারা পালাচ্ছিল সৌদি আরবের দিকে। কুয়েতি নৌবাহিনী তো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে যেন মজা দেখছিল।

সাদ্দাম হোসেনের একমাত্র ব্যর্থতা ছিল কুয়েতের আমীর আর তার মন্ত্রীপরিষদের সব সদস্যের সৌদি আরবে পালিয়ে যাওয়া।

ইরাকের রিপাবলিকান গার্ডকে নির্দেশ দেওয়া ছিল যে কুয়েত শহরে পৌঁছিয়েই প্রথম দসমান প্যালেসে গিয়ে রাজপরিবারকে বন্দী করতে হবে।

কন কফলিন লিখছেন, ‘‘রাজপরিবারের একমাত্র সদস্য শেখ ফাহাদ সৌদি আরবে পালিয়ে যেতে চান নি। যখন ইরাকী বাহিনী রাজপ্রাসাদে পৌঁছয়, তখন তিনি কয়েকজন কুয়েতি সৈন্যের সঙ্গে প্রাসাদের ছাদে একটা পিস্তল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একজন ইরাকী সেনা তাকে গুলি করে।’’

ইয়াসের আরফাত (বাঁয়ে) সাদ্দাম হোসেন (ডানে)

ব্রিটিশ বিমানযাত্রীদের পণ বন্দী করা হয়

সাত ঘণ্টার মধ্যে কুয়েতের দখল নিয়ে নিয়েছিল ইরাকী বাহিনী। পুরো সরকারের সঙ্গে প্রায় তিন লাখ কুয়েতি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলেন। তখনই ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের একটা বিমান দখল করার সুযোগ এসে যায় সাদ্দাম হোসেনের সামনে।

লন্ডন থেকে দিল্লিগামী ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ওই বিমানটি কুয়েত বিমানবন্দরে নেমেছিল জ্বালানি নিতে। পশ্চিমা গুপ্তচর সংস্থাগুলো আন্দাজ করছিল যে ইরাক কুয়েত দখল করেছে, কিন্তু তারা বেসরকারি বিমানগুলিকে সতর্ক করার কথা ভাবে নি।

যখনই বিমানটি কুয়েতের অবতরণ করে, সব কর্মী আর যাত্রীদের পণ বন্দী করে নেওয়া হয়। তাদের বাগদাদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যাতে সেখানে যদি বোমাবর্ষণ হয় তখন এই পণ বন্দীদের মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করা যাবে।

কুয়েত আক্রমণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ইরাকের ওপরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে দেন। যুদ্ধবিমানবাহী জাহাজ ‘ইণ্ডিপেন্ডেন্স’কে ভারত মহাসাগর থেকে পারস্য উপসাগরের দিকে রওনা হতে নির্দেশ দেন।

পণবন্দী শিশু স্টুওয়ার্ট লকউডকে সাদ্দাম হোসেন জিজ্ঞাসা করছেন সে দুধ পেয়েছে কী না

ইরাকের সব অর্থ যুক্তরাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করে

যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাঙ্কগুলিতে জমা থাকা ইরাকের সব অর্থ ও সম্পদ যুক্তরাষ্ট্র বাজেয়াপ্ত করে নেয়। সেই সময়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার যুক্তরাষ্ট্র সফরে ছিলেন।

কুয়েতে ইরাকী হামলাকে তিনি তিরিশের দশকে চেকোস্লাভাকিয়ার ওপরে জার্মান আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। আবার অন্যান্য প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পর বিরোধী অবস্থান নিলেও কুয়েতে ইরাকী হামলার বিষয়ে যৌথ বিবৃতি দিয়ে নিন্দা জানায়।

জাতিসংঘ এবং আরব লীগও ইরাকের এই পদক্ষেপের নিন্দা করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ইরাকের ওপরে সম্পূর্ণভাবে অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে দিয়ে যাওয়া ইরাকের তেলের পাইপলাইন কেটে দেওয়া হয়। সৌদি সীমান্তে ইরাকী সেনাদের জমায়েত হতে দেখে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সামরিক সাহায্য চায়।

ইরাকের কবল থেকে কুয়েতকে রক্ষা করতে নিজেদের সীমাবদ্ধতা জানিয়ে পরবর্তী ছয় মাসে প্রায় ৬০ হাজার সৈন্যকে বিমানযোগে সৌদি আরবের মাটিতে নিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।

৭ অগাস্ট প্রেসিডেন্ট বুশ জাতির প্রতি দেওয়া এক ভাষণে জানান যে ৮২ নম্বর এয়ারবোর্ন ডিভিশনকে তিনি সৌদি আরবে পাঠাচ্ছেন।

সেটাই ছিল ‘অপারেশন ডেসার্ট স্টর্ম’-এর শুরু। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরে এই যুদ্ধেই বিদেশের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সবথেকে বড় অপারেশন।

সাদ্দাম হোসেনের শিশুসুলভ চিন্তাভাবনা দেখে জেনারেলরা আশ্চর্য হয়ে যেতেন

আরাফাত আর মিতেরাঁ সমর্থন করেন সাদ্দাম হোসেনকে

এদিকে সাদ্দাম হোসেন তার চাচাতো ভাই আল হাসান আল মাজিদকে কুয়েতের গভর্নর হিসাবে নিযুক্ত করেন। এই মি. মাজিদই ১৯৮৮ সালে হালাব্জায় গ্যাস দিয়ে কয়েক হাজার কুর্দিকে হত্যা করেছিলেন।

মাত্র এক দুজন রাষ্ট্রনেতা সাদ্দাম হোসেনের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন।

এদের মধ্যে ছিলেন ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসের আরাফাতও। বিশ্লেষকরা মি. আরাফাতের এই সিদ্ধান্তে কিছুটা আশ্চর্য হয়েছিলেন কারণ একটা সময়ে মি. আরাফাতের শক্তিক্ষয় করার জন্য সাদ্দাম হোসেন পুরো শক্তি লাগিয়েছিলেন।

সেপ্টেম্বর মাসে সাদ্দাম হোসেন আরও একটি মহল থেকে সমর্থন পেয়ে গেলেন। ফরাসী প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে বললেন যে কুয়েতের জমির ওপরে ইরাক যে দাবী জানাচ্ছে, তার কয়েকটি ফ্রান্স ন্যায্য বলে মনে করে।

এর কিছুদিন আগেই কুয়েতে কর্মরত ৩২৭ জন ফরাসী শ্রমিককে মুক্তি দিয়ে ফ্রান্সের সহানুভূতি আদায় করে নেয় ইরাক।

ওই শ্রমিকদের ঠিক সেইদিন ছেড়ে দেওয়া হয়, যেদিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশ সচিব জেমস বেকার ইরাকের বিরুদ্ধে রণকৌশল স্থির করতে প্যারিস গিয়েছিলেন।

ব্রিটিশ পণবন্দীদের সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের সাক্ষাৎ

যুক্তরাষ্ট্রের পরেই ইরাকের কুয়েত দখলের সবথেকে বড় বিরোধিতা করেছিল যুক্তরাজ্য। এর মধ্যেই সাদ্দাম হোসেন সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি ব্রিটিশ পণবন্দীদের সঙ্গে দেখা করবেন।

কন কফলিন লিখছেন, ‘‘সাদ্দাম হোসেন তাদের সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন ইরাকে ওই পণবন্দীদের উপস্থিতি আসলে শান্তির জন্যই প্রয়োজন। তার মত ছিল যতদিন ওই পণবন্দীরা ইরাকে থাকবেন, ততদিন মিত্রশক্তি বোমাবর্ষণ করবে না।

‘‘পণবন্দীদের সঙ্গে সাদ্দাম হোসেনের সাক্ষাত গোটা বিশ্বে টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। সাত বছর বয়সী এক ব্রিটিশ শিশু স্টুওয়ার্ট লকউডকে সাদ্দাম হোসেন জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে সে সেদিন দুধ পেয়েছে কী না,” লিখেছেন কন কফলিন।

শিশুটির মুখে চোখে তখন যে আতঙ্ক দেখা গিয়েছিল, সেটাই বাকি পণবন্দীদের অবস্থার জানান দিচ্ছিল।

এদিকে সাদ্দাম হোসেনকে বোঝানোর জন্য প্রাক্তন হেভিওয়েট বক্সার মুহম্মদ আলি, জার্মানির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী উইলি ব্রান্ট এবং যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বাগদাদে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের আবেদনেও সাদ্দাম হোসেন কোনও সাড়া দেন নি।

কুয়েতে নতুন পরিচয়পত্র দেওয়া হলো

আক্রমণ শুরু হতেই কুয়েতের এক তৃতীয়াংশ মানুষ, প্রায় তিন লক্ষ বাসিন্দা পালিয়ে গিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্র কতদিন লড়াই চালাবে তা নিয়ে সন্দেহ ছিল।

১৯৯০ সালের ২২ ডিসেম্বর ইকনমিস্ট পত্রিকা লিখেছিল, ‘‘সাদ্দাম হোসেনের গোয়েন্দারা বিরোধীদের নিয়ে এসে খালি করে দেওয়া রাজপ্রাসাদের ঘরগুলোতে অত্যাচার চালায়। অনেক রাস্তার নাম বদল করে দেওয়া হয়েছে। নাগরিকদের নতুন পরিচয়পত্র দেওয়া হচ্ছে আর গাড়ির জন্য নতুন লাইসেন্স প্লেট নিতে বলা হয়েছে।

‘‘বাগদাদ আর কুয়েতের মধ্যে সময়ের যে ফারাক ছিল, সেটাও তুলে দেওয়া হয়েছে। এক নির্দেশ জারি করে কুয়েতের বাসিন্দাদের দাড়ি রাখতে নিষেধ করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা যারা ভঙ্গ করছেন, তাদের দাড়ি উপড়িয়ে নেওয়া হচ্ছে,” জানিয়েছিল ইকনমিস্ট।

এক ইরাকী জেনারেল ওয়াফিক আল সমুরাই সেই সময়ে সাদ্দাম হোসেনের দেওয়া নির্দেশগুলো নিয়ে বলেছিলেন, ‘‘সাদ্দাম হোসেন আমাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্যদের আটক করে তাদের ইরাকী ট্যাঙ্কের কাছাকাছি দাঁড় করিয়ে রাখতে, যাতে আমরা তাদের মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে পারি।

‘‘তার একটা ভুল ধারণা ছিল যে এইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হাজার হাজার সৈন্যকে আমরা মানব ঢাল হিসাবে ব্যবহার করতে পারব। তার এই শিশুসুলভ চিন্তাভাবনা দেখে আমি এবং অন্যান্য জেনারেলরা আশ্চর্য হয়ে যেতাম,” বলেছিলেন ইরাকের জেনারেল সমুরাই।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ইরাকের ওপরে বোমাবর্ষন শুরুর আগে

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ লড়াই লড়বে কী না তা নিয়ে সন্দেহ

‘আটলান্টিক’ পত্রিকাকে ২০০২ সালের মে মাসে দেওয়া এক সাক্ষাটকারে সমুরাই বলেছিলেন, ‘‘যখন আমি সাদ্দাম হোসেনকে বলার চেষ্টা করেছিলাম যে আমরা ধ্বংসের পথে এগোচ্ছি, তখন তিনি পাল্টা জানতে চান যে ওটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ না কি ওটাই বাস্তবতা।’’

‘‘আমি বলেছিলাম আমার সামনে যা তথ্য আছে, সেগুলোও ওপর ভিত্তি করেই এই মতামত দিচ্ছি। তিনি বলেন, এখন তুমি আমার মতামত শোনো। এই লড়াইতে ইরান হস্তক্ষেপ করবে না। আমাদের বাহিনী কতটা লড়াই করতে পারবে, তা তোমার ধারণার বাইরে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার জন্য তারা বাঙ্কার বানিয়ে ফেলতে সক্ষম।

‘‘তারা দীর্ঘদিন ধরে লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে, অনেক লোক মরবে। আমরা তো এই ক্ষয়ক্ষতি সামলে নেব, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেটা সামলানোর পরিস্থিতিতে থাকবে না। নিজেদের সেনাবাহিনীতে প্রচুর মৃত্যু হলে তারা সেটা মেনে নিতে পারবে না, এমনটাই মত ছিল সাদ্দাম হোসেনের,” বলেছিলেন জেনারেল সমুরাই।

বিমান হামলায় ইরাক বিধ্বস্ত

প্রেসিডেন্ট বুশ ১৯৯১ সালের ১৬ জানুয়ারি ইরাকের ওপরে বিমান হামলা চালানোর নির্দেশ দেন। পুরো ইরাক জুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হল। মাত্র চার সপ্তাহের মধ্যে ইরাকের চারটে পারমানবিক গবেষণাগার সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হল।

ইরাকের সব সামরিক আর অর্থনৈতিক স্তম্ভগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হতে লাগল। রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র আর তেলের খনিগুলোর ওপরে বোমা বর্ষণ চলল।

ইরাকী বিমানবাহিনীর মনোবলেও বড় সড় ধাক্কা লাগল যখন তাদের একশোরও বেশি যুদ্ধ বিমান উড়ে গিয়ে ইরানে আশ্রয় নিল। এরকমও খবর পাওয়া যাচ্ছিল যে সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিমানবাহিনীর ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পরেই যুদ্ধ বিমান নিয়ে ইরানে আশ্রয় নেয় সৈনিকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার মোকাবিলা করতে না পারার জন্য সাদ্দাম হোসেন বিমানবাহিনীর অফিসারদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছিলেন, সেজন্যই বিদ্রোহ হয়।

৫৮ হাজার ইরাকী সেনা যুদ্ধবন্দী

৫৮ হাজার ইরাকী সেনা যুদ্ধবন্দী

যুদ্ধের মধ্যেই সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভের দূত হিসাবে বাগদাদে যান ইয়েভগেনি প্রাইমাকভ। সাদ্দাম হোসেনের ওজন প্রায় ১৫ কেজি কমে গেছে দেখে তিনি বেশ চমকে গিয়েছিলেন।

১৮ ফেব্রুয়ারি ইরাকের বিদেশ মন্ত্রী তারিক আজিজ মস্কো গিয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন যে প্রস্তাব দিয়েছিল কুয়েত থেকে বিনাশর্তে ইরাককে সরে আসতে হবে, সেটা মেনে নেন মি. আজিজ।

কিন্তু ততদিনে বিশ্বনেতারা সাদ্দাম হোসেনকে এতটাই অবিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে শুধুমাত্র আশ্বাসে কাজ হবে বলে তারা মনে করছিলেন না।

এদিকে ইরাকের ওপরে স্থলপথে আক্রমণ হতে পারে, এই আশঙ্কা করে কুয়েতের সব তৈলখনিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন সাদ্দাম হোসেন।

শেষমেশ প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ সেনা কমান্ডার জেনারেল নর্ম্যান শোয়ার্জকফকে আদেশ দেন যদি ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ইরাকী সেনা যদি কুয়েত না ছাড়ে তাহলে শক্তি প্রয়োগ করে তাদের সরিয়ে দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরাক পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছিল। ছয় সপ্তাহ ধরে লাগাতার বিমান হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে ইরাকের সৈন্যরা লড়াই করার পরিস্থিতিতেই ছিল না।

পাল্টা হামলায় দ্বিতীয় দিনের শেষে ২০ হাজার ইরাকী সৈন্য বন্দী হয় আর ৩৭০টি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করা হয়। অবশেষে সাদ্দাম হোসেন তার বাহিনীকে নির্দেশ দেন যে ১৯৯০ সালের পয়লা অগাস্ট তারা যে জায়গায় অবস্থান করছিল, সেখানেই যেন ফিরে আসে।

২৬ ফেব্রুয়ারিতে কুয়েতে একজনও ইরাকী সৈন্য ছিল না। হয় তাদের যুদ্ধবন্দী হিসাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, অথবা ইরাকে ফিরে গিয়েছিল। ইরাকী যুদ্ধবন্দীদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে পৌঁছে গিয়েছিল ৫৮ হাজারে আর প্রায় দেড় লাখ ইরাকী সেনা হয় আহত বা নিহত হয়েছিলেন।

ইরাকী সেনা অফিসারেরা একটা মাত্র অনুরোধ করেছিলেন, যে তাদের যেন হেলিকপ্টারে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, কারণ সব রাস্তা আর সেতু ধ্বংস হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল শোয়ার্জকফ ইরাকী অফিসারদের সেই অনুরোধ মেনে নিয়েছিলেন।

ইত্তেফাক/এফএস