কয়েক দিন থেকেই পঙ্কজদার (পঙ্কজ ভট্টাচার্য) জন্য মনটা খারাপ হয়ে ছিল। তার শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। যেদিন হাসপাতালে নেওয়া হলো, সেদিন থেকেই মনটা কেন যেন কু গাইছিল। ২৪ এপ্রিল রাত ১২-২০ মিনিটে আমার মতো আরো অসংখ্যজনকে কাঁদিয়ে পঙ্কজদা চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। তার বয়স হয়েছিল। বিশেষ করে তিন বছর আগে স্ত্রী রাখী দাশ পুরকায়স্তের মৃত্যুর পর পঙ্কজদা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। ৮৪ বছরে কারো জীবনাবসান হলে তাকে অকালে চলে যাওয়া বলে না। তবু পঙ্কজদার এই চলে যাওয়া মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। পঙ্কজদা রাজনীতিবিদ ছিলেন, ছিলেন দেশব্রতী, মানবপ্রেমী। তার অনেক অনুসারী ছিল। তিনি নিজেও ছিলেন অনেকের নির্ভরতার স্থান, অভিভাবকের মতো। সমাজটা বদলাতে চেয়েছিলেন, চেয়েছিলেন বৈষম্যহীন একটি মানবিক সমাজ। লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে কিন্তু তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি শেষ দিন পর্যন্ত।
আমার কাছে তিনি সত্যি ছিলেন বড় ভাইয়ের মতো, আমার স্বামী প্রয়াত অজয় রায়ের সঙ্গে ছিল যেন তার আত্মার আত্মীয়তা। অজয় রায় মারা যান ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর। তিনি যখন হাসপাতালে, তখন মুখে কথা বলতে না পারলেও কাগজে লিখেও পঙ্কজদার সঙ্গে কথা বলতেন। পঙ্কজদাকে তিনি তখন ঢাকার বাইরে যেতে মানা করেছিলেন, হয়তো তখন অজয় রায় অন্তরাত্মার ডাক শুনেছিলেন। তাই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও পারিবারিক সুহৃদ পঙ্কজ ভট্টাচার্যকে ঢাকা ছাড়তে বারণ করেছিলেন, শেষ সময়েও কাছে পাওয়ার আশায়। পঙ্কজদা তার শুভাকাঙ্ক্ষী অজয় রায়ের কথা রেখেছিলেন, শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের পরও শেষকৃত্যের জন্য যখন কিশোরগঞ্জের নিজ এলাকায় অজয় রায়কে নিয়ে যাওয়া হয়, তখনো আমাদের সঙ্গী হয়েছিলেন পঙ্কজ ভট্টাচার্য।
পঙ্কজদা শুধু ভালো, সৎ, দরদি রাজনৈতিক নেতা ছিলেন, তা-ই নয়। তিনি আরো অনেক কিছুতেই ভালো ছিলেন। ভালো লিখতেন, কণ্ঠস্বর ছিল ভালো, আবৃত্তি করলেও সুখ্যাতি পেতেন নিঃসন্দেহে। রান্না করতে পারতেন, পাকা রাঁধুনির মতো। তিনি সব সময় দুঃখকষ্ট আড়াল করে হাসিখুশি থাকতেন। কথাবার্তায় থাকত রসিকতা।
পঙ্কজদার বাবা ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ। পঙ্কজদা তার স্মৃতিকথা ‘আমার সেই সব দিন’ বইয়ে নিজের পিতা সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আমার বাবার নাম প্রফুল্ল ভট্টাচার্য। তিনি ছিলেন এমএসসি বিটি। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ এমএসসিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। তার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। পিতার আদেশে প্রফুল্ল ভট্টাচার্য তার প্রিয় শিক্ষক প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের পায়ের কাছে স্বর্ণপদকটি রেখে আশীর্বাদ কামনা করেন। প্রফুল্লচন্দ্র তখন জিগ্যেস করেছিলেন, ‘তুমি কী হতে চাও?’ উত্তরে বাবা বলেছিলেন, বন্ধুরা বলছে আমাকে আইসিএস দেওয়ার জন্য। প্রফুল্লচন্দ্র নিজের পায়ের খড়ম তুলে তিরস্কারের ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ব্রিটিশের পা-চাটা গোলাম হওয়ার জন্য তো আমি তোমাকে শিক্ষা দিইনি। শিক্ষকতা করে তুমি হাজার হাজার ছাত্রকে শিক্ষিত দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোলো। এজন্য তুমি বিটি পরীক্ষা দাও। বাবা তার কথা শুনে শিক্ষকের কষ্টের জীবনই বেছে নিলেন। বাবার প্রিয় ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের ডিপিআই ফেরদৌস খান, পরবর্তীকালে নোবেলজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনূস, পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল ইসলাম (প্রবেশিকা পরীক্ষায় যিনি প্রথম হয়েছিলেন), সাবেক রাষ্ট্রদূত আতাউর রহমান কায়সার প্রমুখ।’
এই পিতার সন্তান পঙ্কজ ভট্টাচার্য দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বেছে নিয়েছিলেন দেশকর্মী হওয়ার পথ। অন্যায়, বৈষম্য, অনিয়মের বিরোধিতা করা ছিল তার আজীবনের সাধনা। ছাত্রজীবনেই তাকে কারাগারে যেতে হয়েছে। কারাগারে ১৯ দিন তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকট-সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
অজয় রায়ের পিতার মৃত্যু পর তিনি বারাণসী থেকে কিশোরগঞ্জ ফিরে এসেছিলেন। এমনকি দেশ ভাগের পরও আত্মীয়স্বজন সবাই দেশত্যাগ করলেও অজয় রায় থেকে গেলেন দেশের টানে, দেশকে ভালোবেসে। পঙ্কজদাও কিন্তু তা-ই করেছেন। তার বাবা-মা, ভাইবোনেরা গত শতকের ষাটের দশকে দেশ ছাড়তে বাধ্য হলেও পঙ্কজদা থেকে যান দেশেই। বাবা-মা দেশ ছাড়ার সময় পঙ্কজ ভট্টাচার্য জেলে ছিলেন। স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘এক মাস পর জেলার সাহেব আমাকে জানালেন দুই-তিন দিনের মধ্যে আমাকে কুমিল্লা জেলে বদলি করা হবে। আরো বললেন, আমি চাইলে আমার পরিবারবর্গের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পেতে পারি। যথারীতি আমি রাজি হলাম। পরদিন বাবা মা-বোনদের নিয়ে দেখা করতে এলেন। স্বদেশের মাটিতে সেটাই ছিল তাদের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। যত না কথাবার্তা, তার চেয়ে বেশি কান্নাকাটির মধ্যে মাকে সাক্ষী রেখে বাবা আমাকে লক্ষ করে বললেন, ‘তুই যদি আমাদের দায়িত্ব নিস, তাহলে আরো বছর দুয়েক এই অসহনীয় অবস্থার মধ্যে কাটাতে চেষ্টা করব।’ জবাবে বাবা-মা-বোনদের দিকে না তাকিয়ে মাথা নিচু করে বলেছিলাম, ‘তোমাদের তো আরো চারটি ছেলে আছে, পঞ্চম ছেলেটিকে দেশের জন্য উৎসর্গ করে দাও। অন্য ভাইদের বলো তোমাদের দেখতে। আমাকে আশীর্বাদ করো।’
দেশকে ভালোবেসে, দেশের মানুষকে ভালোবেসে পঙ্কজদা দেশান্তরী হননি। ক্ষমতার রাজনীতি তিনি করেননি। বড় দলে গিয়ে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবও তিনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু মানুষের জন্য সংগ্রাম থেকে তিনি পিছু হটেননি। যখন যেখানে মানুষের অধিকার হরণের চেষ্টা হয়েছে, যেখানেই মানুষের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে, সেখানেই পঙ্কজদা ছুটে গেছেন। পঙ্কজদার জন্ম হয়েছিল ২২ শ্রাবণ। তার জন্মের সামান্য কয় বছর পরই ২২ শ্রাবণ মৃত্যুবরণ করেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আবার কী আশ্চর্য, বৈশাখ মাসে পঙ্কজদা বিদায় নিলেন। পঙ্কজদার মরদেহ শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হলে বিপুল জনসমাগম হয়েছিল। শাহবাগের ফুলের দোকানগুলোতে ফুলের ঘাটতি আমি নিজেই তোড়া কিনতে গিয়ে দেখেছি। পঙ্কজদা মাছের মুড়িঘণ্ট খেতে পছন্দ করতেন। কখনো মুড়িঘণ্ট রান্না করলে পঙ্কজদার কথা মনে পড়বে। একে একে স্বজন-প্রিয়জনদের বিদায় দিয়ে ভারাক্রান্ত মনে ভাবছি—‘আমি শুধু রইনু বাকি...’। পঙ্কজদার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’
লেখক : বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ অজয় রায়ের সহধর্মিণী
