আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এর মধ্যেই একজোট হয়ে ভোটে লড়ার ব্যাপারে আলোচনা শুরু করেছে বিজেপিবিরোধী দলগুলো। বিরোধী জোট গঠনে বিভিন্ন রাজ্যভিত্তিক দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার। এই উদ্যোগকে সমর্থন করছে কংগ্রেস দলও।
বিজেপি গত লোকসভা নির্বাচনে গড়ে ৩৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, অর্থাৎ বিজেপিবিরোধী দলগুলোই সিংহভাগ ভোট পেয়েছিল। তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ঐ ফলাফলের পরে কিছু রাজ্যে বিজেপির ভোট বেড়েছে। বর্তমান অবস্থায় কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে বিজেপিকে হারানো অসম্ভবই বলা চলে। এই বাস্তবতা বুঝেই বিরোধীদলগুলো আগেভাগে জোট গঠনে উদ্যোগী হয়েছে।
বিরোধী দলগুলোর জোট গড়ার প্রচেষ্টা প্রথম শুরু হয় এপ্রিলের গোড়ার দিকে যখন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের সঙ্গে দেখা করেন। ঐ বৈঠকের শেষে খাড়গে বলেছিলেন, এটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। গত সপ্তাহে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে বৈঠক করেন নীতিশ কুমার। এর আগে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্তালিনের সঙ্গে কথা হয়েছে মমতা ব্যানার্জির। আবার উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদবও দেখা করে গেছেন মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে।
নীতিশ কুমারের সঙ্গে বৈঠকের পরে মমতা ব্যানার্জি সংবাদ সম্মেলনে জানান, জয়প্রকাশ নারায়ণের আন্দোলনের মতো বিজেপিকে সরানোর উদ্যোগ শুরু হোক বিহারের মাটি থেকেই। তার কথায় প্রথমে আমাদের এই বার্তাটা দিতে হবে যে, আমরা সবাই একসঙ্গে আছি। আমাদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। ঐ বৈঠক নিয়ে নীতিশ কুমারের মন্তব্য ছিল যে, আলোচনা খুবই ইতিবাচক হয়েছে। মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে বৈঠকের পরে নীতিশ কুমার দেখা করেন উত্তরপ্রদেশের অখিলেশ যাদবের সঙ্গেও। সেই বৈঠকের পরে অখিলেশ যাদব মন্তব্য করেন, বিজেপিকে হটিয়ে দেশ বাঁচাতে হবে। এই অভিযানে তিনি যে নীতিশ কুমারের সঙ্গেই আছেন।
কলামিস্ট ও বিশ্লেষক শিখা মুখার্জি বিবিসিকে বলেন, যেসব উদ্যোগ বা বৈঠকগুলোর কথা আমরা জানতে পারছি সংবাদমাধ্যমে তার বাইরে নিয়মিতই আলোচনা, যোগাযোগ থাকছে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে। আবার বিজেপিবিরোধী দলগুলো যেসব রাজ্যে সরকার চালায়, তাদের মধ্যেও সরকার পরিচালনা নিয়েও নানা স্তরে আলোচনা চলছে আগে থেকেই। সেই প্রক্রিয়াগুলোকেই কী করে একটা ফোকাসে, অর্থাৎ বিজেপি বিরোধিতার জায়গাটাকে মূল লক্ষ্য করে তোলা যায়, সেটা নিয়েই এখন আলোচনা চলছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিজেপিবিরোধী জোট গড়া কি সম্ভব হবে? গত কয়েকটি নির্বাচনের আগেও দেখা গেছে বিজেপিবিরোধী দলগুলো একজোট হওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনো না কোনো ভাবে তা ব্যর্থ হয়েছিল। ব্যর্থতার মূল কারণ হয়ে ওঠে বিরোধী জোটের নেতৃত্ব দেওয়া নিয়েই। এছাড়াও যে রাজ্যে যে আঞ্চলিক দল শক্তিশালী, তারাই সেখানে নিজেদের জন্য বেশি আসনে লড়তে চায়, তাই অন্য জোটসঙ্গীদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির আলোচনাও ভেস্তে যায়। আবার কিছু রাজ্যে বিজেপিবিরোধী দলগুলো আবার একে অপরের প্রবল বিরোধী।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, কংগ্রেস সব সময়ই এ ধরনের জোটে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে এসেছে, আবার তৃণমূল কংগ্রেসের মতো আঞ্চলিক দলগুলোও ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রজত রায় বলেন, এবার যে উদ্যোগটা নেওয়া হয়েছে, সেখানে কংগ্রেস নিজেদের ভূমিকাটা খুব বড় করে দেখাচ্ছে না।
মমতা ব্যানার্জির একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল বিরোধী জোটের নেতৃত্বে আসার। আবার তিনি কংগ্রেসকেও নেতৃত্বে আসতে দিতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে, তৃণমূল কংগ্রেস সেই জায়গাটা থেকে সরে এসেছে। মমতা ব্যানার্জি বুঝতে পেরেছেন যে, কংগ্রেসহীন বিরোধী জোট করা প্রায় অসম্ভব। আবার নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপির আক্রমণাত্মক রাজনীতির কারণে বিভিন্ন দুর্নীতিতে দলের শীর্ষনেতাদের জড়িয়ে যাওয়ায় মমতা ব্যানার্জি কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছেন। রজত রায়ের মতে, এটা বিজেপি বিরোধিতার ক্ষেত্রে ব্যানার্জির নিজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
শুধু যে মমতা ব্যানার্জির অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন এই বিজেপিবিরোধী জোট তা নয়। বিহারের সিনিয়র সাংবাদিক নচিকেতা নারায়ণ বিবিসিকে বলেন, প্রতিটা বিরোধী দলের কাছেই একটা অস্তিত্বের সংকট দেখা দিয়েছে। সবাই অনুভব করছে বিজেপি তাদের জন্য একটা বিপদ। তাই বিরোধী দলগুলো নিজেদের বাঁচাতেই এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে।
বিজেপিও বিরোধী জোট গঠনের প্রচেষ্টার নেতৃত্ব নিয়েই কটাক্ষ করছে। দলের তথ্যপ্রযুক্তি সেলের প্রধান অমিত মালভীয়া টুইট করেছেন যে, বিরোধীরা সবাই তো একে অন্যের সঙ্গে বৈঠক করছেন, কিন্তু এদের নেতা কে?
লোকসভা ভোটের আগে চলতি মাসেই কর্ণাটকে বিধানসভা নির্বাচন হবে, আর বছরের শেষ দিকে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, তেলেঙ্গানার মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে ভোট আছে। শিখা মুখার্জির মতে, লোকসভা নির্বাচনে যাওয়ার আগে এই রাজ্য বিধানসভার ভোটগুলোতেও বিজেপিবিরোধী জোট কতটা দানা বাঁধতে পারে, সেটাও যাচাই করে নেওয়ার একটা সুযোগ রয়েছে।
