সুদানে সুদিন ফিরবে কবে

আপডেট : ০১ মে ২০২৩, ০৬:৩১

১৮ লাখের বেশি আয়তনের দেশটিতে জনসংখ্যা মাত্র সাড়ে চার কোটি। তবে বেশি আয়তনের দেশ হিসেবে অল্প জনসংখ্যার দেশ হিসেবে এর খ্যাতি নেই। বরং সুদান পৃথিবীর সবচেয়ে অন্তর্দ্বন্দ্ববহুল দেশগুলোর একটি। এর উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর এলাকার অধিকাংশ মানুষ মুসলিম। দক্ষিণাঞ্চলের অনগ্রসর এলাকার অধিবাসীদের অধিকাংশই অমুসলিম। সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিভাজন ও মতবিরোধের কারণে সুদানে আধুনিক কালের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান লড়াইয়ে প্রায় ৫৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সুদানে মূলত দুই ব্যক্তির ক্ষমতার দ্বন্দ্বই প্রধান হয়ে উঠেছে। এই দ্বন্দ্ব এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও চলে গেছে। আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ ও শাসনব্যবস্থায় চীন-রাশিয়া বনাম পশ্চিমের নির্ণায়ক ভূমিকা গ্রহণের প্রতিযোগিতা। ইতিমধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ঘনিষ্ঠ ওয়াগনার গ্রুপের অনেকে এখানে অবস্থান করছেন বলে জানা যায়। যদিও গ্রুপ দাবি করেছে যে তারা সুদানে কোনো যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। চীন-রাশিয়া সামরিক একনায়কদের ক্ষমতা বহাল রাখতে চেয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা চায় একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সুদান শাসিত হোক, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র হয়ে এটি চীননির্ভর একটি দেশে পরিণত না হয়।

এই সংকটে আরো গভীরে রয়েছে দেশটিতে প্রভাব বিস্তারের লড়াই। বশিরের সময় আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধের কারণে বিনিয়োগের একমাত্র উৎস ছিল চীন। দেশটি নানা প্রকল্পে বিনিয়োগ করে একটি শক্তিমান অবস্থান তৈরি করেছে। রাশিয়ার ভাড়াটিয়া বাহিনী ওয়েগনার গ্রুপের সেনা রিক্রুটের অন্যতম উৎস ছিল মিলিশিয়া গ্রুপগুলো। এভাবে সুদানে তারা অবস্থানকে সুসংহত করে। এর সঙ্গে স্বর্ণখনি নিয়ন্ত্রণ, লোহিত সাগরে সামরিক ঘাঁটির পরিকল্পনা এবং ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ সেনার হাতে ধরে রাখার স্বাভাবিক মনোবৃত্তি এবং সৌদি, আমিরাত, মিশরের মতো আঞ্চলিক প্রভাবশালীদের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বিরোধিতা এক জটিল অবস্থা তৈরি করেছে সুদানে। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের চুক্তি বাস্তবায়ন এক্ষেত্রে ছিল সর্বোত্তম উপায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন, সৌদি আরব ও আমিরাতকে নিয়ে কোয়াড গঠন করেছে এই সমস্যা দেখার জন্য। তাদের দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের ফয়সালা করা কোনো সহজ কাজ নয়। এই উলটোমুখী স্বার্থের টানাপোড়েনে সুদানে যে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছে, তা সহজে থামবে বলে মনে হয় না।

  • সুদানের ভবিষ্যৎ কী

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি তিনটি ভবিষ্যতের কথা জানিয়েছে। প্রথমত, দ্রুত সামরিক বিজয়। যদি সামরিক বাহিনী বেসামরিক বাহিনী আরএসএফকে পরাজিত করতে পারে, তাহলে যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটবে। দ্বিতীয়ত, সেটা না হলে যুদ্ধ আরো দীর্ঘায়িত হবে। তৃতীয়ত, শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটানো সম্ভব বলে বিবিসি মনে করে। তাহরির ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট পলিসির অনাবাসিক ফেলো হামিদ খালাফ্ফা। তার মতে, শান্তিচুক্তির মাধ্যমে হয়তো যুদ্ধ বন্ধ সম্ভব হবে না। বরং তাদের উচিত সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া, তাদের দুই জনের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা দেওয়া। বিদেশে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা যেতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘের কূটনৈতিক চেষ্টায় বৃহস্পতিবার সেখানকার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।

  • পেছনের পটভূমি

সুদানে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে জেনারেলদের একটি কাউন্সিল দেশটি পরিচালনা করছে। কিন্তু পরে বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের মধ্যে তৈরি হয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। মূলত কাউন্সিলের শীর্ষ দুই সামরিক নেতাকে ঘিরেই এই বিরোধ। তঁরা হলেন জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো।

জেনারেল আল-বুরহান সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান এবং সে কারণে তিনিই দেশটির প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে দেশটির উপনেতা জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো কুখ্যাত আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফের কমান্ডার। তিনি হেমেডটি নামেই বেশি পরিচিত। অল্প কিছুদিন আগেও তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল। সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ২০১৯ সালে ক্ষমতা থেকে সরাতে তারা দুজন একসঙ্গে কাজ করেছেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু একপর্যায়ে ভবিষ্যতে দেশটি কীভাবে পরিচালিত হবে তা নিয়েই এ দুই নেতার মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। বিশেষ করে সুদানের ভবিষ্যৎ এবং দেশটির বেসামরিক শাসনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাবনা নিয়ে তারা ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করেন।

ফোনে বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে হেমেডটি বলেছেন যে তিনি আলোচনায় রাজি, কিন্তু শর্ত হলো যুদ্ধবিরতি মানতে হবে। ‘শত্রুতা বন্ধ করুন। এর পরেই আমরা আলোচনায় বসতে পারি।’ তিনি বলেন, জেনারেল বুরহানের সঙ্গে তার কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নেই। তবে তিনি দেশটির ক্ষমতাচ্যুত শাসক ওমর আল বশিরের অনুগতদের সরকার নিয়ে আসার অভিযোগ করে জেনারেল বুরহানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রায় তিন দশক ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৯ সালে প্রবল গণ-আন্দোলনের জের ধরে সেনাবাহিনী ও আরএসএফ তাকে যৌথভাবেই ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেছিল। বশিরের তিন দশকের রাজত্বকাল পরিচিত ছিল ইসলামপন্থি আদর্শ ও শরিয়া আইন কার্যকরের জন্য। হেমেডটি মনে করেন, দুঃখজনকভাবে বুরহান পরিচালিত হচ্ছে উগ্রবাদী ইসলামী নেতাদের দ্বারা। দুই ব্যক্তির দ্বন্দ্বে মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে দেশটিতে। লাখ লাখ মানুষ নিজের বাড়ি ছেলে পালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থের অভাবে অনেকে পালাতেও পারছেন না। এই সংকট কেটে কবে দেশটিতে সুদিন ফিরবে সেই অপেক্ষায় অনাহারে অর্ধাহারে কাটানো মানুষগুলো।

 

ইত্তেফাক/ইআ