এই বৈপরীত্যের জন্য শান্তিতে বসবাস করা কঠিন

আপডেট : ০৩ মে ২০২৩, ০১:৪১

উন্নয়নশীল বিশ্বে সুশাসন, আইনের শাসন ইত্যাদির কথা বলা হয় প্রায়শই। অনেক সময় ঢাকঢোল পিটাইয়া এই সকল কথা বলা হয় সমুচ্চ স্বরে; কিন্তু যাহারা এই সকল দেশে বসবাস করেন, তাহারা জানেন এইখানে এই বাস্তবতাটা কতটা নাজুক ও ভঙ্গুর। ইহাতে এই সকল দেশে শান্তিতে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব হইয়া পড়ে। সকলখানে এমন বৈপরীত্য দেখা যায় যে, যাহারা বিবেকবান ও হিতাহিত জ্ঞানসম্পন্ন, তাহাদের পক্ষে ইহা মানিয়া লওয়া হইয়া পড়ে কঠিন। এই সকল দেশে যখন জাতীয় নির্বাচন আসিয়া পড়ে, তখন জাতীয় জীবনের সর্বত্র দেখা দেয় অনিশ্চয়তা ও স্থবিরতা। নির্বাচন হইবে কি হইবে না—ইহা লইয়াই সন্দেহের দোলাচল তৈরি হয়। রাজনীতিতে বাড়িতে থাকে উত্তাপ, উত্তেজনা, সংঘাত ও সংঘর্ষ। এমনকি নির্বাচন কীসের ভিত্তিতে হইবে—এই প্রশ্নেরই মীমাংসা হয় না। স্বাধীনতা লাভের বহু বৎসর পরও এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়াটা সেই সকল দেশের দুর্বল রাজনৈতিক ও নির্বাচনি ব্যবস্থার যে বহিঃপ্রকাশ তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।

যে কোনো দেশ সংবিধানের আলোকেই চলিবে—ইহাই স্বাভাবিক। ইহা ছাড়া সংবিধান কোনো বাইবেল নহে যে, তাহা পরিবর্তন করা যাইবে না; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, অনেক সময় সরকার ও নির্বাচনি পদ্ধতি লইয়া জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয় না। এক পক্ষ নিজের মতো সংবিধান পরিবর্তন করিয়া তাহার পক্ষে অনড় থাকেন এবং অন্য পক্ষ সংবিধানের বাহিরে গিয়া নিরপেক্ষ সরকারের নামে এমন সরকারের অধীনে নির্বাচন ও সেই পদ্ধতি সংবিধানের আওতাভুক্ত করিবার দাবি করেন যাহাতে তাহাদের জয়লাভের সম্ভাবনা বাড়ে। ইহাতে কোন সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে—ইহা লইয়া তর্কবিতর্কেই নষ্ট হয় মূল্যবান সময় এবং দেশ বানরের তৈলাক্ত বাঁশে উঠিবার মতো কিছুটা অগ্রসর হইয়া আবার পিছাইয়া পড়ে। ইহাতে ব্যাহত হয় শান্তি ও স্থিতিশীলতা। বিস্ময়ের ব্যাপার হইল, যাহারা একসময় জাতীয় নির্বাচন আয়োজনে নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজনীয়তাকে হাতে তুড়ি দিয়া উড়াইয়া দিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন যে, পাগল ও শিশু ছাড়া আর কেহ নিরপেক্ষ নহে, তাহাদেরই এখন ইহার পক্ষে সাফাই গাইতে দেখা যাইতেছে। এমনকি এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাহারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিবেন না বলিয়া সাফ বলিয়া দিতেছেন। আবার যাহারা একসময় এই তত্ত্বাবধায়ক বা নিরপেক্ষ সরকারের জন্য জীবন বাজি রাখিয়া বৎসরের অধিকাংশ দিন হরতাল-অবরোধ ও জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে এই দাবি মানাইতে বাধ্য করিয়াছিলেন, তাহারা এখন এমন সরকার আর কখনো ফিরিয়া আসিবে না বলিয়া জোর গলায় বলিয়া যাইতেছেন। তাহা হইলে এখানে প্রশ্ন হইল, যাহারা পাগল ও শিশু ছাড়া আর কেহ নিরপেক্ষ নহে বলিয়াছিলেন, তাহারা কি এখন স্বীকার করিবেন না যে, তাহারা সেই সময় ভুল বলিয়াছিলেন? আবার যাহারা সেই সময় সেইরূপ সরকারের দাবিতে জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনের মাধ্যমে দেশ ও দশের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করিয়াছিলেন, তাহারা কি এখন সেই জনভোগান্তির জন্য দেশবাসীর নিকট ক্ষমা চাহিবেন না? ইহাতে কি তাহাদের কথা ও আচরণে বৈপরীত্য প্রকাশিত হয় না? তাহারা কি হুবহু একই নাটক মঞ্চস্থ করিতেছেন না? স্ক্রিপট একই, চরিত্র একই, শুধু যাহারা অভিনয় করিবেন, তাহারা তাহাদের পাঠ অদলবদল করিয়া ফেলিয়াছেন!

উন্নত দেশসমূহসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই নির্বাচিত সরকারের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়া থাকে; কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসমূহ শক্তিশালী ও পক্ষপাতমুক্ত না হওয়ায় সেইখানে প্রায়শ নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হইয়া উঠে না। বলা বাহুল্য, এই সকল কারণে এই সকল দেশ তৃতীয় বিশ্বের তকমা হইতে মুক্ত হইতে পারিতেছে না। কোনো দেশে যদি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর বা পালাবদল সম্ভব না হয়, তাহা হইলে সেই সকল দেশে যতই অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন হউক না কেন, তাহা একসময় তাসের ঘরের মতো যে কোনো সময় ভাঙিয়া পড়িতে পারে। এই সকল দেশে যখন জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হইবে, তখন কাহারো হস্তক্ষেপের প্রশ্নও উঠিবে না।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন