বেপরোয়া কথা ও নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি

আপডেট : ০৪ মে ২০২৩, ০৪:৪৬

অনেকেই আছেন, যারা ছুটির দিনের নিজেদের অনেক অনুল্লেখযোগ্য ও অপ্রয়োজনীয় গল্প বলে সোমবারের অফিসের আমেজ ও সময় নষ্ট করে সহকর্মীদের বিরক্ত করে ধৈর্যচ্যুতি ঘটান। তারাই পাড়া-প্রতিবেশীর আমন্ত্রণের তোয়াক্কা না করেই বাসায় হাজির হয়ে একই শোনা বারবার বলা গল্প ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলতে থাকেন। তারাই কলিগ হয়েও মিটিংয়ে আপনার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বেপরোয়া বকবক করতেই থাকবেন। বেশি কথা বলার অভ্যাস ত্যাগ করতে পারেননি এখনো।

সত্যিকার অর্থে আমরা অধিকাংশই একই গোত্রের, যার জন্য আমরা কেউই ব্যক্তিগতভাবে দায়ী নই। আমাদের সমাজব্যবস্থাই এ ধরনের বেশি কথা বলাকে শুধু অ্যাপ্রিশিয়েট ও এনকারেজই করেনি, পুরোপুরি বাস্তবে ডিমান্ডও করে, যেখানে জীবন বা কর্মের সাফল্য নির্ধারিত বা পরিমাপ হয়, আপনি আপনার পরিমণ্ডলে মনুষ্য সমাজে কতটুকু অ্যাটেনশন বা মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছেন, তা দিয়ে। আপনার কত মিলিয়ন টুইটার ও ফেসবুক ফলোয়ার আছে, আপনি কত প্রভাবশালী ইনস্টগ্রামার, আপনার পোস্ট ভিডিও ভাইরাল হওয়া, ইউটিউবে দর্শক প্লাবিত হওয়া, লক্ষ লক্ষ চ্যাটিং ও স্ট্রিমিং হওয়ার মধ্য দিয়ে সাফল্য নির্ধারিত হয়।

শুধু আমেরিকায়ই প্রতিদিন দুই মিলিয়নেরও বেশি পডকাস্ট প্রতিনিয়ত ৪৮ মিলিয়ন ইপিসোড তৈরি করছে। ৩ হাজারেরও বেশি টেড এক্স ইভেন্টস ২০ ওয়ানাবে মালকলম গ্লেডওয়েলস অংশগ্রহণ করে প্রতি বছর। শুধু আমেরিকাতেই প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ভার্চুয়াল মিটিংয়ের আয়োজন করা হয়। এর সবই কি অবশ্যকরণীয়? জরিপে প্রমাণিত হয়েছে যে এর অর্ধেকই সময়ের অপচয়। মানুষ শুধু শুধুই টুইটের জন্যই টুইট করে, কথা শুধু বলার জন্যই বলে।

কিন্তু বাস্তবে এখনো অনেক বিখ্যাত, সফল, ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী মানুষ আছেন, যারা ঠিক এর বিপরীতটি করেন। মানে, কথা বলেন কম। বেশি কথা বলা তো দূরে থাক, অতীব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মুখ খোলেন না। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের বদলে তারা মনুষ্যদৃষ্টি এড়িয়ে চলতে পছন্দ করেন। নীরবে নিঃশব্দে মানুষের, সমাজ ও পৃথিবীর কল্যাণে কাজ করে যান।

বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনও ছিলেন একদম কম কথা বলা অন্তর্মুখী মানুষ, যিনি প্রয়োজনেও কথা না বলে নীরবতাকে ভালোবেসে নির্জন নিস্তব্ধতাকে ব্রত বলে গ্রহণ করেছিলেন অন্তর থেকে। আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বেডার গিন্সবার্গ অত্যন্ত সতর্কতা নিয়ে তার শব্দচয়ন করতেন। প্রতিটি শব্দ উচ্চারণের মাঝে সময় নিতেন। হিয়ারিংয়ের মাঝে শুনানিতে দুই শব্দের মাঝখানে তুলনামূলক লম্বা ব্রেক নিয়ে দ্বিতীয় শব্দ উচ্চারণ করতেন। তা করতে গিয়ে তিনি তার স্টাফসহ মিসিসিপি এক, মিসিসিপি দুই নামক একটি অদ্ভুত নীতি ব্যবহার করতেন। তার কথার দুই শব্দের মাঝে তিনি ও তার স্টাফরাও উচ্চারণ করতেন এক মিসিসিপি, দুই মিসিসিপি এবং এর পরে পরবর্তী শব্দটি উচ্চারণ করতেন। যাতে কোনো ক্রমেই ভুল শব্দ ব্যবহার না হয়। আমরা প্রেসিডেন্ট, টেক কোম্পনির সিইও, বৈজ্ঞানিক বা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক না হলেও ব্যক্তিজীবনে একজন সফল মানুষ হয়ে পরিবার ও সমাজে অন্তত সাধ্যমতো একটা সুন্দর গঠনমূলক, মানুষকে প্রভাবিত করার মতো একটা ইমেজ তৈরি অবশ্যই করতে পারি। চাকরিতে প্রমোশন, সমাজের গুডবুকে নাম লেখাতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

আধুনিক জগতে কম কথা বলার জন্য বা নিজেকে শান্ত রাখার কাউন্সিলিং আছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সমাজবিদ, বৈজ্ঞানিক ও মনোবিজ্ঞানীসহ ডাক্তার, বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন মৌনতা বা নীরবতা ব্রেইন সেল তৈরি করতে সাহায্য করে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাইকোলজিস্ট তার আবিষ্কৃত ফরমুলা দিয়ে জেলের কয়েদির মুখ বন্ধ রাখার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন। তার মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া পুরোপুরি ত্যাগ করা, জুম কল মিটিং, যত সম্ভব কম ফোনালাপ করা বা কথা সংক্ষিপ্ত রাখা, উচ্চ স্বরে কথা না বলা, কম্পিউটার স্ক্রিনের পাশে কাগজে লিখে কথা বলা কম, শোনা কম, সংক্ষিপ্ত উত্তর ও কথা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করার নির্দেশনা লাগিয়ে রেখে উপকৃত হওয়ার চেষ্টা করা যায়। তবে অবশ্যই কথা বেশি বলার চেয়ে বেশি শোনা উপকারী। যতটুকু সম্ভব কথা কম বলার চেষ্টা করা। কথা বলা বা শব্দের অপচয় মানে টাকার অপব্যবহার করা হিসেবে বিবেচনা করা।

কথা বলায় বিরত থাকার ক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা, এক্ষেত্রে অন্যদের কথা বলতে দিয়ে নিজে শোনার চেষ্টা করা। নীরবতার চর্চা করা বা নীরব থাকার ক্ষমতা আয়ত্ত করা। কীভাবে শান্ত হয়ে শুনতে হয়, তার চর্চা বা অভ্যাস করা। অন্যের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে অন্যকে গুরুত্ব দেওয়া।

আমাদের অধিকাংশই শ্বাস নেওয়ার মতোই কোনো কিছু না ভেবেই কথা বলতেই থাকি নিজের অজান্তেই। কিন্তু কথা বলায় সতর্ক হলে বা বুঝেশুনে কথা বললে সহজেই চিন্তায় আসতে পারে কেন আমরা এভাবে বেপরোয়া কথা বলছি, যা মোটেই উচিত নয় বা স্বাস্থ্যের বা সুস্থতার জন্য অমঙ্গলকর। এভাবেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে ভালো ম্যাজিক্যাল ফলাফল পাওয়া যায়। ইমোশনাল, পিজিক্যাল ও মেন্টালি ভালো অনুভব করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ব্যক্তি, সংসার, সমাজজীবনের চালচিত্র পালটাতে শুরু করে নতুন পৃথিবীর বাসিন্দা মনে হতে পারে। পরিবারের সব সদস্যকেই মনে হতে শুরু করবে পজিটিভ।

লেখক : অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশি আমেরিকান

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন