আগুনে এত মৃত্যুর পরও কেন হুশ ফিরছে না!

আপডেট : ০৭ মে ২০২৩, ১২:২০

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নি দুর্ঘটনা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অধিকাংশই ঘটছে গ্যাস সংযোগের জায়গায়। গত বছর গ্যাস সরবরাহ লাইনে আগুন থেকে ৭৯৫টি অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরও গ্যাস লিকেজের কারণে বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আগুনে পুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ ভাগ বেড়েছে। রাজধানীবাসীর প্রশ্ন, আগুনে এত মৃত্যুর পরও কেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হুশ ফিরছে না? আর কত মানুষের জীবন গেলে হুশ ফিরবে। ঘন ঘন অগ্নিকান্ডের জন্য তদারকির অব্যবস্থাপনাকেই দায়ি করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের জায়গায় কোন সংস্কার হচ্ছে না। একবার লাইন দিয়ে আর কোন খবর নেওয়া হয় না। তিতাসের পাইপলাইন বিশ বছর মেয়াদের, সেটারও মেয়াদ দশ বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। ফলে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। কেউ মনিটরিং, দেখভাল করেন না। ডিস্ট্রিবিউশন লাইন মেরামতের কোনো খবর নেই। মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে এই গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে।  আবার যারা গ্যাসের লাইন ব্যবহার করছেন তাদের অধিকাংশই সচেতন নন।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, শুধুমাত্র ২০২২ সালে দেশে ২৪ হাজার ১০২টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশই ঘটেছে বৈদ্যুতিক গোলযোগ ও গ্যাসের কারণে। এরমধ্যে গ্যাস সরবরাহ লাইনে আগুন থেকে ঘটেছে ৭৯৫টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। চলতি বছরও গ্যাস লিকেজের কারণে বেশ কয়েকটি বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। গত ৭ মার্চ রাজধানীর গুলিস্তানের সিদ্দিকবাজারে সাততলা একটি ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন দেড় শতাধিক মানুষ। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা গ্যাস থেকে হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটি। গত ৫ মার্চ রাজধানীর ধানমন্ডির সায়েন্সল্যাব এলাকায় একটি ভবনে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ ৬ জন মারা যান, আহত হন অন্তত ৪০ জন। জমে থাকা গ্যাস থেকেই সায়েন্সল্যাব এলাকার ভবনটিতে বিস্ফোরণ ঘটে। গত ৪ মে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে স্টিল মিলে বিস্ফোরণে দগ্ধ ৭ জনের মধ্যে ৬ জনই মারা গেছেন। ২০২০ সালে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম তল্লা এলাকায় বাইতুস সালাত জামে মসজিদে ভয়াবহ বিস্ফোরণে শিশুসহ ৩৪ মুসল্লির মৃত্যু ঘটে। পরে তদন্তে জানা যায়, তিতাস সংযোগ লাইনের লিকেজে মসজিদের ভেতর গ্যাস জমে এবং হঠাৎ বিদ্যুতের স্পার্কে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামান্ত লাল সেন বলেন, অগ্নিদগ্ধ হয়ে যারা এই হাসপাতালে এসেছেন, তাদের অনেকে প্রায় কয়লায় পরিণত হয়েছেন। আমার ৪০ বছরের ডাক্তারি জীবনে কখনো এমন অবস্থা দেখিনি। শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসকরা অনেকটা আক্ষেপ করে বলেন, যাদের গাফিলতির কারণে মানুষ অগ্নিদগ্ধ হচ্ছেন, তারা যখন নিজেরা অগ্নিদগ্ধ হবেন তখন বুঝবেন, আগুনে পোড়ার কি জ্বালা। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীর নবাব কাটরায় রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত হন নারী ও শিশুসহ ১২৪ জন। নিমতলীর ৪৩ নম্বর বাড়িতে রাত ৯টায় ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর সরকার বার্ণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। অনেকে সেই সময় বলেছিল, এতো বড় বার্ণ ইনস্টিটিউটের কি প্রয়োজন।  কিন্তু এখন পোড়া রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে বার্ণ ইনস্টিটিউট। এই হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টসহ পোড়া রোগীদের চিকিৎসার সব ধরনের ব্যবস্থা আছে। পোড়া রোগীদের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। আর প্লাস্টিক সার্জারি তো আরো বেশি ব্যয়বহুল। কিন্তু দেশে রোগীরা সেই সেবা বিনামূল্যে পাচ্ছেন।  

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, ২০০০ সালের আইন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর তিনটি কাজ করতে পারে। এগুলো হলো কারখানা পরিদর্শন, নোটিশ দেওয়া, এনওসি সার্টিফিকেট দেওয়া। এগুলো দেখার জন্য কারখানা পরিদর্শন বিভাগ, বিস্ফোরক অধিদপ্তর ও সিটি কর্পোরেশন আছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কমিটি থাকতে হবে। তাহলে আগুন লাগা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও পুরোকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, যারা সার্ভিলেন্স ও মনিটরিংয়ের দায়িত্বে আছেন তারা সচেতন নন। তিনি বলেন, গরমের মৌসুমে আগুন লাগার ঝুঁকি থাকে। কারণ কানেকশন পয়েন্টগুলো গরম হয়ে যায়। তখন আগুন লাগে। আগুন লাগার আরেকটি কারণ হলো অবৈধ কানেকশন। সুযোগ সন্ধানীরা অবৈধভাবে সরাসরি মেইন লাইন থেকে অবৈধ সংযোগ নেয়। এজন্য তারা যে জিনিসপত্র ব্যবহার করা সেগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের। আর গ্রামাঞ্চলে গাছের ভিতর দিয়ে বাঁশ দিয়ে বিদ্যুতের লাইন দিয়েছে। জঙ্গলেও বিদ্যুতের ঝুঁকিপূর্ণ লাইন আছে। এগুলো তদারক করতে হবে। তদারক করে মিল-কারখানা এবং বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারীদের বার্ষিক সার্টিফিকেট দিতে হবে। প্রয়োজন হলে জরুরি ভিত্তিতে লাইন মেরামত করতে হবে। পুরো সিস্টেমকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। নইলে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

ইত্তেফাক/ইআ