পাসপোর্ট পেতে পুলিশ ভেরিফিকেশন ও হয়রানি

আপডেট : ০৮ মে ২০২৩, ০৩:০১

একটা সময় ছিল যখন পাসপোর্ট প্রদান করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা যাচাইয়ের জন্য পুলিশের অনুসন্ধান প্রয়োজন হতো। যাতে কোনো অপরাধী ব্যক্তি কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তি দেশ ত্যাগ করতে না পারে। তখনকার সময়ে চেকিংয়ের জন্য বিমানবন্দরগুলোতে আধুনিক সরঞ্জামও ছিল না। পাসপোর্ট হাতে পেয়ে গেলে এরপর বিদেশ যেতে আর কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হতো না। তাই পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের স্বার্থে পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এখন ডিজিটালের পিরিয়ড অতিক্রম করে স্মার্ট বাংলাদেশের পথে হাঁটছে প্রিয় স্বদেশ। ডিজিটাল তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ বিস্তার হয়েছে সর্বত্র। অপরাধীকে শনাক্ত করা কয়েক মিনিটের ব্যাপার মাত্র। এখন চাইলেই কোনো আসামি বা অভিযুক্ত ব্যক্তি পাসপোর্ট থাকা সত্ত্বেও বন্দর অতিক্রম করতে পারে না। নানা রকম চেকিংয়ের পর বিদেশ যাত্রার পথ অতিক্রম করতে হয়। দেশের পুলিশের সিকিউরিটি টিম এখন অনেক স্মার্ট। এক ক্লিকেই যে কোনো নাগরিকের সব তথ্য স্ক্রিনে ভেসে ওঠে। কারো নামে মামলা-মোকদ্দমা আছে কি না, তা জানা এখন আর দুষ্প্রাপ্য বা গোপন কোনো বিষয় নয়। তাছাড়াও ভোটার আইডি কার্ড আগের মতো এনালগ নেই। বেশির ভাগ নাগরিককে স্মার্ট কার্ডের আওতায় আনা হয়েছে। অর্থাৎ একজন নাগরিকের সব তথ্য সরকারের কাছে গচ্ছিত আছে। চাইলেই মুহূর্তের মধ্যে তা বের করা সম্ভব।

পাসপোর্ট পাওয়া প্রত্যেকের নাগরিক অধিকার। পাসপোর্ট করা থেকে শুরু করে এয়ারপোর্ট অতিক্রম করা অবধি ব্যক্তিকে যাচাই করার জন্য এত প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও পুলিশ ভেরিফিকেশনের আরেকটি অতিরিক্ত অপশন চালু রাখা এই ডিজিটাল সময়ে নিতান্তই অপ্রয়োজনীয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশ ভেরিফিকেশনের ধাপ পার হওয়ার জন্য পাসপোর্ট হাতে পেতে দেরি হয়। অথচ উন্নত বিশ্বে ২৪ ঘণ্টায় পাসপোর্ট সরবরাহ করার মতো নজিরও আছে। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উন্নত বিশ্বের দিকে এগোচ্ছে। তাই তথ্যপ্রযুক্তির সমৃদ্ধির এই সময়ে পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন দীর্ঘ প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে শর্টকাট ভেরিফিকেশনের ব্যবস্থা করা হোক। কারো ব্যাপারে কোনো অভিযোগ থাকলে তা পাসপোর্ট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ প্রযুক্তির সহায়তায় অল্প সময়ে যাচাই করা সম্ভব। অভিযোগ পাওয়া গেলে পাসপোর্ট প্রদানে বিরত থাকা যেতে পারে। যার স্মার্ট কার্ড আছে, তিনি পুলিশ ভেরিফিকেশন ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য।

সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে অভিযান চালানো হলেও দালালের দৌরাত্ম্য ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। অভিযানের পর কিছুদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে দালাল চক্র। হয়রানি ঠেকাতে দালালদের দ্বারস্থ হয় সাধারণ মানুষ। ২২ জানুয়ারি ২০২০ সালে ১১৯তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ই-পাসপোর্ট সিস্টেম চালু করার পর থেকে দালালের কর্মযজ্ঞ কিছুটা শিথিল হয়েছে। কারণ এখন পাসপোর্ট প্রত্যাশীরা ঘরে বসেই আবেদন সম্পন্ন করতে পারছেন। তবে ফিংগার প্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ এবং ছবি তোলার জন্য যেতে হয় পাসপোর্ট অফিসে। আর এতেই সুযোগ পায় দালাল চক্র। সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তি এড়াতে দালালের কাছে ভিড় জমান অনেকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পেলেও কাগজপত্র ঠিক নেই বলে তাড়িয়ে দেওয়া হয় অনেককে। শুধু দালালের কোড নম্বর থাকলেই ভেতরে প্রবেশের সুযোগ মেলে। কিছুটা ব্যতিক্রম থাকলেও বেশির ভাগ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের চিত্র এমনই।

আমরা এখন স্মার্ট বাংলাদেশের কথা বলছি, সবার হাতে হাতেই এখন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক প্রযুক্তি রয়েছে কিংবা উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন পর্যায়ে আইটি সেন্টার রয়েছে এবং স্টুডিও রয়েছে। ফলে ফিংগার প্রিন্ট ও ছবি তোলার প্রক্রিয়াও ঘরে বসে করা সম্ভব। ই-পাসপোর্টের অ্যাপ্লিকেশনের মতো ছবি তোলা ও ফিংগার প্রিন্ট প্রদানের কাজটিও পাসপোর্ট অফিসে না এসে ঘরে বসে সারতে পারলে দালালযজ্ঞের অবসান হবে। স্বস্তি ফিরবে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

 

ইত্তেফাক/ইআ