গ্রেট অটোম্যান সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট ষোড়শ শতাব্দীতে বলিয়াছিলেন, ‘মহান আল্লাহ ভিন্নতা পছন্দ করেন। তাহা না হইলে এক রঙের ফুলই সৃষ্টি করিতেন; দেখা যাইত সকল জায়গায় একই রঙের পাখি, একই রঙের মানুষ; কিন্তু আমরা একেক জন একেক রকম। কারণ, বিচিত্রতাই সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য।’ সুতরাং আমাদের চারিদিকে ভিন্নতা থাকিবে—ইহাই স্বাভাবিক; কিন্তু ন্যায়নীতি ও দেশের উন্নয়নের প্রশ্নে অনিয়ম এবং অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়াটা নিজেদের পায়ে কুড়াল মারিবার মতো। মনে রাখিতে হইবে, একদিকে অন্যায়ের প্রশ্রয়, অন্যদিকে অনৈক্য—এই দুইটি বৈশিষ্ট্যই একটি জাতির উন্নত হইবার পথে সবচাইতে বড় বাধা। ‘অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে তব ঘৃণা তারে তৃণ সম দহে’—কথাটি বলিয়া গিয়াছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। মনে রাখিতে হইবে মহান আল্লাহতালা অন্যায়ের সহিত আপস করিতে নিষেধ করিয়াছেন। আল্লাহ বলিয়াছেন, নিজের ভাগ্য নিজেকেই গড়িতে হয় এবং তাহা পরিশ্রম করিয়া আদায় করিতে হয়। কোথাও অনিয়ম-দুর্নীতি হইলে তাহাদের বিরুদ্ধে সচেতন নাগরিকদের রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে, প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিতে হইবে। আমরা না জাগিলে অন্ধকার দূর হইবে না। এই জন্য কাজী নজরুল ইসলাম বলিয়াছেন—‘আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’
সুতরাং একজন নাগরিক হিসাবে আমাদেরও কর্তব্য রহিয়াছে অনিয়মকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়িয়া তোলা। এই জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকিতে হইবে। আর ঐক্যের অভাব ঘটিলে কী হইতে পারে—ইহা লইয়া অসংখ্য নীতিগল্প ও ধর্মীয় কাহিনি রহিয়াছে। এই ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত গল্পের পুনঃপাঠ করা যাক। গল্পটি সংখ্যাবিষয়ক। একবার স্কুলের ক্লাসে ‘সংখ্যা-৯’ ‘সংখ্যা-৮’কে থাপ্পড় মারিল। সংখ্যা-৮ বলিল—তুমি আমাকে থাপ্পড় মারিলে কেন? সংখ্যা-৯ বলিল—আমি বড়, তাই তোমাকে মারিতে পারি। তখন সংখ্যা-৮ জ্যেষ্ঠতার অধিকার লইয়া ‘সংখ্যা-৭’কে থাপ্পড় মারিল! ‘সংখ্যা-৭’ ঘুরিয়া ‘সংখ্যা-৬’কে মারিল! এইভাবে চলিতে চলিতে শেষ পর্যন্ত ‘সংখ্যা-২’ যখন ‘সংখ্যা-১’-কে থাপ্পড় মারিল ‘সংখ্যা-০’ (শূন্য) তখন ভাবিল—এইবার তো আমার পালা! আমার চাইতে ছোট কেহ নাই। সে নিরাপত্তার আশায় একটু দূরে গিয়া বসিল। ‘সংখ্যা-১’ তখন গিয়া ‘০’ (শূন্য)-এর বাম পাশে বসিয়া বলিল—আমি তোমাকে থাপ্পড় মারিব না। শূন্য হইলেও তোমাকে আমি সম্মান করি; কিন্তু ১ গিয়া ০-এর বাম পাশে বসিবার কারণে তাহারা দুইয়ে মিলিয়া হইয়া গেল ১০! অর্থাৎ সকলের চাইতে বড়।
এই নীতিগল্পটি বলিয়া দেয় ঐক্যবদ্ধ থাকিলে সকলকে ছাড়াইয়া যাওয়া যায়। সুতরাং আমাদের মধ্যে ঐক্য থাকিতে হইবে। আমরা যদি ‘এক’ থাকি, তাহা হইলে আমাদের ভাগ্য লইয়া কেহ ছিনিমিনি খেলিতে পারিবে না। মনে রাখিতে হইবে, উন্নয়নকাজের প্রশ্নে কোনো রাজনীতি করা উচিত নহে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পার হইলেও আমাদের এখনো অনেক কাজ বাকি রহিয়াছে। লুটপাট বন্ধ করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নকাজ কখনই সম্পন্ন করা যাইবে না। মহাবিশ্বের দিকে তাকাইয়া আমরা দেখিতে পাই, পুঞ্জীভূত মহাশক্তিই এই জগতের প্রতিটি স্তরে স্তরে। সুতরাং ঐক্যই হইল জগতের সবচাইতে বড় শক্তি। ইসলাম ধর্মেও পারস্পরিক ঐক্য, মৈত্রী ও সম্প্রীতিকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং মানবজাতির জন্য কল্যাণকর বলিয়া মনে করা হয়। ইসলামে মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের। এই ভ্রাতৃত্ব ও ঐক্য বজায় রাখিবার ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলা বলিয়াছেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই।’ (সুরা-৪৯ হুজরাত, আয়াত: ১০) ‘এই যে তোমাদের জাতি, এই তো একই জাতি আর আমি তোমাদের পালনকর্তা, অতএব তোমরা (ঐক্যবদ্ধভাবে) আমারই ইবাদত করো।’ (সুরা-৯ তওবা, আয়াত :৯২)।
সুতরাং দুর্নীতিবাজ-লুটেরা-অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যসাধন প্রয়োজন। যেই এলাকায় জনসাধারণ ঐক্যবদ্ধ রহিয়াছে, সেই এলাকার মানুষ কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের স্বাদ পাইতেছে। অতএব বিভাজন নহে, ঐক্যই উন্নয়নের সবচাইতে বড় সহায়ক।
