সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কিংবা অন্যান্য সামাজিক প্ল্যাটফরমগুলোয় সমাজ সমর্থন অযোগ্য ভিডিও তৈরির মাধ্যমে বাড়ছে ভাইরাল হওয়ার তোড়জোড়। সামাজিক মাধ্যমে খুলে বসা পেইজ চ্যানেলের বহুলপ্রচারের আশায় দিন কাটছে বহু নামধারী মানবসেবীর। আবার কেউ-বা ভাইরাল হওয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মানবসেবার নামে করছেন মানব-অপমান। এটিকে একপ্রকার লোকদেখানো মানবকল্যাণ বলা চলে। সামান্য পরিমাণ অর্থ দান করে ভাইরাল হওয়ার আকাঙ্ক্ষা দিনকে দিন মারাত্মক হয়ে উঠছে। দেখে মনে হয়, যেন ভাইরাল হওয়ার নেশায় বিদ্ধ দেশ, সমাজ ও জাতি। ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজ ছাড়িয়ে দেশীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাল ভাইরাস। যেটি কিনা প্রশ্ন তুলছে আমাদের নৈতিকতা ও বিবেকবোধ নিয়ে। অবস্থা এমন, কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ? সেটিও বলা বড় দায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারের সময় এমন অনেক নামধারী মানবসেবকদের ভিডিও কনটেন্ট দেখেছি আমরা। ব্যক্তিগতভাবে বলতে গেলে এগুলো ভিউ ব্যবসায় ছাড়া কিছুই নয়। বর্তমান পরিস্থিতি দেখে একটি বিষয় না বললেই নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এই ধরনের ভিডিওতে মনিটাইজেশন বন্ধ করে দিলে খুঁজে পাওয়া যাবে না এসব মানবসেবক নামধারী মানব-অপমানকারীদের। এই যে, রাজধানী শহর ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দেখা মেলে অসংখ্য পথশিশুর, যাদের অধিকাংশই ফুল পানি-আইসক্রিম কিংবা বাদামবিক্রেতা। সারা দিন প্রচণ্ড গরমে বহু কষ্টে বিক্রি করে সর্বোচ্চ ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার পণ্য। কোনো কোনো সময় এর চেয়েও কম। আবার এদের মধ্যে অনেকেরই নেই পরিবার-পরিজন কিংবা পরিচিত আত্মীয়স্বজন। কারণ ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছে রাস্তায়। আবার এই সংখ্যার কিছু পথশিশুর বাবা-মা বেঁচে থাকলেও তারা দিনমজুর ও খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষ। অথচ ভাগ্যের করুণ নির্মমতার দরুন এসব পথশিশুরও পড়তে হয় মানবসেবক নামধারী ভিউ ব্যবসায়ীদের খপ্পরে। ভিউ ব্যবসায়ীদের দেওয়া ২০০ টাকা, ৫০০ টাকা সাময়িকভাবে তাদের উপকারে এলেও প্রকৃত উপকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। তার কারণ হলো, স্বল্প পরিমাণ অর্থ দিয়ে তাদের বক্তব্য, আবেগ-অনুভূতি, দুঃখ ও বেদনাবিধুর কথাবার্তা ভিডিও আকারে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খোলা বিভিন্ন পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে। এতে করে ভিডিওপ্রতি ঐসব ভাইরাল উন্মাদরা আয় করছে ১০ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা। ভাইরাস সংস্কৃতির বিকাশে অতিরঞ্জনমূলক কনটেন্টের হার বেড়ে গেছে। মানুষ বিভিন্ন তথ্যের ব্যাপারে বিভ্রান্তিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। বিশিষ্ট লেখক ও শিক্ষাবিদ আবুল ফজল ১৯৭২ সালের দিকে লেখেন ‘মানব-কল্যাণ’ নামক একটি প্রবন্ধ। সেই প্রবন্ধে তিনি লেখেন, ‘একমুষ্টি ভিক্ষা দেওয়াকেও আমরা মানবকল্যাণ মনে করে থাকি। মনুষ্যত্ববোধ আর মানব-মর্যাদাকে এতে যে ক্ষুণ্ণ করা হয়, তা সাধারণত উপলব্ধি করা হয় না।’
বর্তমানে এই প্রবন্ধটি একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্য। এটি পড়ে বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে আর বলার অপেক্ষা থাকে না—ভাইরালপ্রীতির শিকার হয়ে কতটুকু মানব-অপমান সংঘটিত হচ্ছে বাংলাদেশে। মূলত কী শিখছি আমরা এগুলো থেকে? আমাদের শিক্ষণীয়ই-বা কী? কোথায় পাব এসব প্রশ্নের উত্তর! তা-ও এখন ভাবনার বিষয়।
প্রকৃতপক্ষে এমন অবস্থা আমাদের বাংলাদেশের সংস্কৃতির মধ্যে যেমন পড়ে না, ঠিক তেমনই এমনটি ধর্ম-জাতি-রাষ্ট্রও সরাসরি সমর্থন করে না। সামাজিক প্ল্যাটফরমে মানবসেবার নামে এসব মানব-অপমান ও মানব-প্রতারণা এখনই বন্ধ না করা হলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের কঠিন মূল্য দিতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, প্রিন্সিপাল কাজী ফারুকী কলেজ, লক্ষ্মীপুর
