এই বৎসর ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়িতে পারে বলিয়া কয়েক দিন পূর্বে সতর্কবার্তা জারি করিয়াছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। বিবিসির এক খবরে বলা হইয়াছে, বাংলাদেশে এই বৎসর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হইয়া হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ১ হাজার ছাড়াইয়া গিয়াছে। উদ্বেগের বিষয় হইল, ঢাকার বাহিরেও সমানতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়িতেছে। সাধারণত বর্ষাকালেই ডেঙ্গুবাহী এডিশ মশার বিস্তার হইয়া থাকে। ইহার সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয় জুলাই মাসের পর হইতে; কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন শুধু বর্ষাকালই নহে, গ্রীষ্মকালেও ইহার প্রাদুর্ভাব বাড়িতেছে। শনাক্তের সংখ্যা যেই হারে বাড়িতেছে, তাহাতে এখন হইতেই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠানগত এবং অবশ্যই সরকারিভাবে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করিতে হইবে। মশক নিধনে এখন হইতেই গ্রহণ করিতে হইবে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম।
কীটতত্ত্ববিদগণ বলিতেছেন, এই বৎসর এডিস মশার ঘনত্বটা একটু অধিক। প্রবাদে আছে, প্রতিকারের চাইতে প্রতিরোধই উত্তম। প্রতিরোধের আগাম প্রস্তুতি জরুরি। গত কয়েক বৎসর ধরিয়া ডেঙ্গু আমাদের ভুগাইতেছে। ২০১৯ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ছিল সবচাইতে ভয়াবহ। সেই বৎসর ১ লক্ষ ১ হাজার ৩৫৪ ব্যক্তি আক্রান্ত হয়। মারা যায় ১৭৯ জন। তবে সবচাইতে অধিক মারা যায় ২০২২ সালে, ২৮১ জন। ডেঙ্গুর মোট চারটি ভ্যারিয়েন্ট রহিয়াছে। ভিন্ন ভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট দ্বারা একাধিক বার আক্রান্ত হইলে তাহার ফল হইয়া থাকে মারাত্মক। এই জন্য এই সকল ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে মানুষকে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সতর্ক করিয়া তুলিতে হইবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রথম দাওয়াই হইল আমাদের চারিপার্শ্ব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। মশা যাহাতে বংশবিস্তার না করিতে পারে এই জন্য সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের উচিত ফগিংয়ের চাইতে লার্ভিসাইডের উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত টুল বিটিআইয়ের প্রয়োগ করা, জলাশয়-ড্রেনে গাপটি মাছ ছাড়া এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালসমূহে প্রস্তুতিমূলক সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
পৃথিবীতে কীটপতঙ্গের আক্রমণে প্রতি বৎসর যত মানুষ মারা যায়, তাহাদের মধ্যে মশাবাহিত রোগে মারা যায় সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষ। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২৩ প্রজাতির মশার সন্ধান পাওয়া গিয়াছে এবং এইখানে মশাবাহিত পাঁচটি রোগ হইল—ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জাপানিজ এনকেফালাইটিস। ইহার মধ্যে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া লইয়া সাম্প্রতিক কালে আমাদের মধ্যে দেখা দিয়াছে উৎকণ্ঠা। এডিস মশার দুইটি প্রজাতি এডিস ইজিপ্টি ও অ্যালবোপিকটাস ইহার জন্য দায়ী। ইহারা মূলত পাত্রে জমিয়া থাকা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। ইহাদের কামড়ে রক্তে প্ল্যাটিলেটের পরিমাণ কমিয়া গেলে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হইয়া পড়ে।
শুধু ডেঙ্গু নহে, এই সময় কিউলেক্সসহ যে কোনো মশাবাহিত রোগ হইতে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকিতে হইবে। বিশেষ করিয়া ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার জন্য দায়ী এডিশ মশা সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যার পূর্বে কামড়ায়। এই সময় ঘর বা অফিসের দরজা-জানালা বন্ধ রাখাই শ্রেয়। ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহারসহ বাড়ির ছাদে বা বারান্দার টবে, নির্মাণাধীন ভবনে, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিক কনটেইনার, ডাবের খোসা, ফ্রিজ বা এসি ইত্যাদি কোথাও যাহাতে তিন হইতে পাঁচ দিনের অধিক পানি জমিয়া না থাকে, তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে প্রত্যেক নাগরিককে। মশা হইতে আত্মরক্ষায় নানা ধরনের রিপেলেন্ট বা মশা তাড়ানোর পণ্য যেমন—ব্যাট, কয়েল, স্প্রে, ক্রিম ইত্যাদির প্রয়োগও করা যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মশা তাড়াইতে কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার না করিয়া প্রাকৃতিক উপায়ে তথা নিমের তৈল, কর্পূর, লেবু ও লবঙ্গের মিশেল, শুকনা চা-পাতার ধোঁয়া ইত্যাদি ব্যবহার করিলে তাহাতে মশা-মাছি যেমন পলায়ন করিবে, তেমনি শ্বাসতন্ত্রেরও কোনো ক্ষতি হইবে না। আর মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের জন্য কেবল বর্ষাকালে নহে সমগ্র বৎসর ধরিয়া বিশেষ কর্মসূচি রাখিতে হইবে।
