খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক নুরুল ইসলাম গত সোমবার (৮ মে) মধ্যরাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকও ছিলেন। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে নুরুল ইসলাম জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) অর্থনীতি ও সামাজিক নীতি বিভাগের সহকারী মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং একাডেমিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি খাদ্য ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) ইমেরিটাস ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও আইন গঠনে অধ্যাপক নুরুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিকটতম পরামর্শদাতা। তার রচিত ‘বাংলাদেশ :মেকিং অব আ ন্যাশন’ গ্রন্থটিতে জানা যায়, অধ্যাপক নুরুল ইসলাম এক দেশ দুই অর্থনীতির কথা প্রথম তুলে ধরেন ১৯৫৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান প্ল্যানিং কমিশনের কাছে দেওয়া প্রতিবেদনে। অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে বলা হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনে ইতিহাসের অংশ। তার এই ভূমিকার কথা তিনি আন্তরিকভাবেই বর্ণনা করেছেন ২০১৭ সালে প্রকাশিত তার দুটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে—‘অ্যান অডিসি :দ্য জার্নি অব মাই লাইফ’ এবং ২০০৩ সালে প্রকাশিত ‘মেকিং অব আ নেশন বাংলাদেশ : অ্যান ইকোনমিস্টস টেল’ (ইউপিএল, ২০০৩)। এই দুই বইয়ে অধ্যাপক নুরুল ইসলাম কেবল তার কর্মজীবনের কথা বলেননি, তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পটভূমি তুলে ধরেছেন। তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের উপ-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে নুরুল ইসলাম, রেহমান সোবহান ও হাবিবুর রেহমান পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিলেন।
নুরুল ইসলাম চট্টগ্রাম কলেজ থেকে আইএ পাশ করেন। প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পরে তিনি ১৯৫৫ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি অর্জন করেন। প্রথমে তিনি ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস (পরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ)-এর পরিচালক এবং বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের প্রধান হিসেবে সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নফিল্ড ফাউন্ডেশনের সহযোগী ছিলেন।
তিনি নেদারল্যান্ডস স্কুল অব ইকোনমিকসের রকফেলার সহকর্মী হিসেবেও কাজ করেছেন এবং অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যান্টনি কলেজের সহযোগী ছিলেন। তিনি খাদ্য ও কৃষি সংস্থার অর্থনৈতিক ও সামাজিক নীতি বিভাগের (এফএও) সহকারী মহাপরিচালক ছিলেন।
তার অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল’ (১৯৭৮), ‘বাংলাদেশে উন্নয়ন পরিকল্পনা :রাজনৈতিক অর্থনীতিতে একটি গবেষণা (১৯৭৯), ‘উন্নয়নশীল দেশগুলিতে খাদ্যশস্যের দাম স্থিতিশীলকরণ :এশিয়াতে সমস্যা এবং অভিজ্ঞতা’ (১৯৯৬), ‘উন্নয়ন ইস্যুতে অন্বেষণ :নুরুল ইসলামের নির্বাচিত নিবন্ধসমূহ’ (২০০৩) প্রভৃতি। তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উন্নয়ন অর্থনীতিতে অবদানের জন্য তিনি ২০০৯ সালে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক পুরস্কার’ অর্জন করেন। এছাড়া অর্জন করেন বিডিআই লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড (২০১৩)।
অধাপক নুরুল ইসালম তার ‘বাংলাদেশ:জাতি গঠনকালে এক অর্থনীতিবিদের কিছু কথা’ গ্রন্থে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির ওপর আলোকপাত করেছেন। এই গ্রন্থে তিনি বিভিন্ন অর্থনৈতিক ইস্যুতে গৃহীত পাকিস্তান সরকারের নীতিমালার প্রশ্নে বাঙালিদের গড়ে তোলা প্রতিরোধ সংগ্রামের একটি গভীর বিশ্লেষণ করেছেন। আর এই অর্থনৈতিক ইস্যুই বাংলাদেশের জন্মের অন্যতম কারণ। তিনি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার শুরুর দিকে গৃহীত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী অর্থনৈতিক নীতিমালার ব্যাপারে বিশদ ব্যাখ্যা রাখেন। এই বইতে তিনি অর্থনৈতিক প্রশ্নে পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যকার বিশাল বিভেদের বিষয়ে এমন অনেক প্রসঙ্গের উল্লেখ করেছেন, যা আগে আর কেউ কোথাও উল্লেখ করেননি। তিনি শেখ মুজিবের দেওয়া ছয় দফা দাবির অনেক খুঁটিনাটি বিষয় এখানে আলোচনা করেছেন, যা সেকালে অনেকের কাছেই অজ্ঞাত ছিল। বাংলাদেশ সরকারের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের শুরুর সময়কার বেশ কিছু নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তিগুলো তুলে ধরেন তিনি। ঐ সব গৃহীত নীতির কোনো কোনোটির ক্ষেত্রে ব্যাখ্যা বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন রকম হতে পারে এবং এ বিষয়ে এখনো বিতর্ক বিদ্যমান। তা সত্ত্বেও অধ্যাপক ইসলামের উল্লেখিত ঘটনা এবং সেই সবের ব্যাখ্যা দীর্ঘদিনব্যাপী বিরাজমান তথ্যশূন্যতা হ্রাসে সহায়তা করে থাকে এই গ্রন্থ।
অধ্যাপক ইসলামের মোট গ্রন্থের সংখ্যা ২৯। বলা যায়, প্রতিটি বইই বাংলাদেশকে জানতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্পষ্টতই বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিলেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম। ১৯২৯ সালের ১ এপ্রিল জন্ম নেওয়া জনাব নুরুল ইসলাম অবশেষে গত সোমবার ৮৪ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন। তার আত্মার মাফফিরত কামনা করছি।
লেখক :সাংবাদিক
