স্বাধীনতার অর্ধশতক পার হওয়ার পরও আমাদের বিভক্তি দূর হয় নাই। এই রাষ্ট্রের অন্তঃস্থ সমস্যা লইয়া গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করিলে যে কোনো চিন্তাশীল মানুষের মাথা ঘুরিবে। নির্বাচন যত ঘনাইয়া আসিতেছে, ততই চারিদিক হইতে স্বাধীনতাবিরোধীরা নানান দলে অনুপ্রবেশ করিয়া ষড়যন্ত্রের জাল বিছাইতেছে। তাহারা একেকটি জেলাকে অক্টোপাসের মতো এমনভাবে আঁকড়াইয়া ধরিয়াছে যে—তাহারা যাহা বলিতেছে সেই অনুযায়ী সকল কিছু হইতেছে। স্বাধীনতাশক্তিপক্ষের সুহৃদ, প্রথিতযশা সাংবাদিক কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী মনে করিতেন, বঙ্গবন্ধুও একই ভুল করিয়াছিলেন শত্রুমিত্র না চিনিয়া। এই ব্যাপারে মৃত্যুর পূর্বে তিনি বলিয়াছিলেন—বঙ্গবন্ধুর সময়ে তিনি লন্ডনে ছিলেন, ফিরিয়া আসিয়া দেখেন বঙ্গবন্ধুর যিনি মুখ্য সচিব হইয়াছেন, তিনি পাকিস্তান রাজাকার বাহিনীর স্কোয়াড লিডার ছিলেন। আরেক বার দেখেন কর্নেল ফারুককে বঙ্গবন্ধু তাহার পারসোনাল গার্ডদের প্রধান হিসাবে নির্বাচিত করিয়াছেন। সরদার আলীকে তিনি গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধানের দায়িত্ব দিয়াছেন—যিনি কি না পাকিস্তান গোয়েন্দা বাহিনীর পূর্ব পাকিস্তান অংশের প্রধান ছিলেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলিয়াছেন, আওয়ামী লীগে কত রাজাকার আছে। বিপদের সময় ইহারা ভয়ানকভাবে আসে। তাহারা এখন বঙ্গবন্ধুর নাম অধিক বলে। সুতরাং ইহা নূতন করিয়া বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, নির্বাচন যত সন্নিকটে আসিবে অনুপ্রবেশকারীরাও নানান খেলা খেলিবে এবং নির্বাচনকেও আরো জটিল ও কঠিন করিয়া তুলিবে।
আরেকটি সমস্যাসংকুল চিত্র হইল কিছু কিছু সরকারি কর্মকর্তার অবসরের পর রাজনীতির খাতায় নাম লেখানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা। ইহার জন্য তাহারা চাকুরিতে থাকা অবস্থাতেই ক্ষমতালব্ধ প্রভাবপ্রতিপত্তি দিয়া রাজনীতিতে নামিবার মাঠ প্রস্তুত করিতে মরিয়া হইয়া পড়েন। ইহার জন্য তাহারা হেন দুষ্কার্য নাই যাহা করেন না। অনেকে আবার এক্সটেনশন লইয়া তাহার মেয়াদও বৃদ্ধি করিতে মরিয়া থাকেন। অথচ কোনো কর্মকর্তা সময়মতো অবসরে না গিয়া এক্সটেনশনে গেলে নিচের দিকে দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকাইয়া যায়। ইহাতে স্বাভাবিকভাবেই হতাশ হইয়া পড়েন দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তারা। উন্নয়নশীল বিশ্বে কিছু কিছু উচ্চাভিলাষী আমলার এই ধরনের মানসিকতা অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ, আমলাদের কাজই হইল নিরপেক্ষ থাকা। কেন তাহারা জাতীয় এমনকি স্থানীয় পর্যায়ের দলীয় রাজনীতিতে জড়াইয়া পড়িবেন? সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে কর্মের মাধ্যমে সেতুবন্ধ সৃষ্টি করিয়া থাকে প্রজাতন্ত্রের বেতনভুক কর্মচারী আমলারা—যাহাদের বেতন-ভাতা গাড়ি-বাড়ির খরচ আসে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ হইতে। গভর্নমেন্ট সার্ভেন্ট কনট্রাক্ট রুলস রহিয়াছে, পাবলিক সার্ভিস কনট্রাক্ট রুলস রহিয়াছে, চাকুরিবিধি রহিয়াছে, সেই নিয়মে আমলাদের গোপন বৈঠক, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে যোগদান চলে না; কিন্তু কথায় আছে—“কাজির গরু কিতাবে আছে গোয়ালে নাই।” সেই জন্য উন্নয়নশীল বিশ্বে ইহার ব্যত্যয় দেখা যায়। ইতিপূর্বে সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এক অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিলেন, “রাজনীতি করার জন্য যে আমার পাছায় বাড়ি মেরেছে, সে এখন আমার সঙ্গে রাজনীতি করতে চায়।’ তিনি আরেক জায়গায় বলিয়াছেন, ‘আমি যদি হাসপাতালে গিয়ে বলি, আমাকে ডাক্তারি করার সুযোগ দেন অথবা ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে গিয়ে যদি বলি কমপক্ষে সুপারিনটেনডেন্ট ইঞ্জিনিয়ারের পদটি আমাকে দেন, তাহা হইলে কী অবস্থা হবে?... অথচ ডাক্তার বলেন কিংবা ইঞ্জিনিয়ার, এমনকি ভিসি সাহেব অবসর গ্রহণ করে সহজেই বলতে পারবেন, ‘আমি রাজনীতি করিব।’ যাহারা সরকারি চাকরি করেন, জজ সাহেব যারা আছেন ৬৭ বছর পর্যন্ত চাকরি করে গিয়ে বলবেন, ‘আমিও রাজনীতি করিব।’ ...সরকারি সচিব, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, ক্যাবিনেট সেক্রেটারি অবসরে গিয়েই বলেন, ‘আমিও রাজনীতি করিব।’ মনে হয় রাজনীতি করতে হলে কোনো নিয়মকানুন নাই, যোগ্যতা লাগে না। যার যখন ইচ্ছা এটি করতে পারেন।”
এই যে আমলারা জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতিতেও নাক গলাইতে চাহেন, ইহার অভিঘাত কি ভালো হইবে? যাহারা সমগ্র জীবন রাজনীতির মাঠ চষিয়া বেড়াইয়াছেন, প্রাণপাত করিয়াছেন—দেশ পরিচালনার যোগ্যতা কি সেই সকল সাধারণ রাজনীতিবিদের নাই? অন্যদিকে যেই ক্ষেত্র বা মাঠ যাহাদের জন্য নহে, তাহারা কি সেই মাঠে ভুঁইফোঁড়ের মতো হঠাত্ উদয় হইয়া রাজনীতিতে বিদ্যমান জটিলতা-হানাহানি-সংঘাত হজম করিতে পারিবেন? যাহার যেই কাজ, তাহার সেই কাজেই থাকা উচিত। নচেৎ বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা বৃদ্ধি পায়।
