জানিতে হইবে কোথায় অগ্রাধিকার দিতে হইবে

আপডেট : ১৬ মে ২০২৩, ০২:৪৬

মার্কিন টিভি সেলিব্রেটি এলিজাবেথ হ্যাসেলবেক একবার এক অনুষ্ঠানে বলিয়াছিলেন, ‘কাহারো জীবনই সর্বদা ভারসাম্যপূর্ণ হয় না। সেই জন্য আমাদের বাছিয়া লইতে হয় কোন বিষয়গুলি অগ্রাধিকার দিতে হইবে। ইহা একটি সচেতন সিদ্ধান্ত।’ এখন সিদ্ধান্ত লইবার ক্ষেত্রে এই সচেতনতা না থাকিলে লেজেগোবরে অবস্থা হইয়া যায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকান লেখক-পরিচালক স্কট ক্যান বলিয়াছেন, ‘আপনি যখন আপনার অগ্রাধিকারগুলি বুঝিতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করেন, তখন ভালো জিনিসগুলি ঘটিতে থাকে।’ ইহার বিপরীতে বলা যায়, আমরা যদি বুঝিতে না পারি কোনটা অগ্রাধিকার দিতে হইবে, তাহা হইলে একের পর এক খারাপ ঘটনা ঘটিবে। হাতে ১০০ টাকা রহিয়াছে, ঘরে চাউল-ডাউল-তৈল-চা-চিনি নাই। সুতরাং আমাকে অগ্রাধিকার দিতে হইবে, কোনটা সর্বাগ্রে ক্রয় করিতে হইবে। এখন আমি চা ভালোবাসি বলিয়া অর্ধেক টাকার চা আর বাকি টাকার চিনি কিনিয়া বাড়ি ফিরিলাম আর ভাবিলাম, ভাত নাই তো কী হইয়াছে, চা তো খাইতে পারিব—মোটা দাগে ইহা হইল সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং গরিবের ঘোড়া রোগের লক্ষণ।

তৃতীয় বিশ্বের তো বটেই, উন্নত বিশ্বকেও প্রায়োরিটি তথা অগ্রাধিকার বিবেচনায় কর্মপরিকল্পনা করিতে হয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিকেও বুঝিতে হইবে কোথায় অগ্রাধিকার দিতে হইবে—ঘরে ঘরে আলো, নাকি তাহার পরিবর্তে কলকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন পাওয়ার সাপ্লাই? কলকারখানায় উত্পাদনের বিষয়টি সরাসরি অর্থনীতির সহিত জড়িত, রুটি-রুজির সহিত জড়িত। সুতরাং কলকারখানায় পাওয়ার কিংবা গ্যাস সাপ্লাইয়ের সমস্যা দীর্ঘদিন জিয়াইয়া থাকিলে তাহার খারাপ অভিঘাত ক্রমশ সকল দিকেই ছড়াইয়া পড়িতে বাধ্য। উত্পাদনে সমস্যা হইলে উহার মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের ঘাটতি আসিবে। অর্থের ঘাটতি আসিলে সংশ্লিষ্ট খাত বা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতায় জটিলতা আসিবে। এবং অবশ্যই জটিলতা বাড়িবে ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধেও। পুরাটাই ভাইস-ভার্সা। এখন যাহারা অগ্রাধিকার বিবেচনা না করিয়া ঘরে ঘরে আলোর বন্যাকে গুরুত্ব দিয়া কলকারখানার পাওয়ার সাপ্লাইকে ব্যাহত করিয়াছেন, তাহারা কি ইহার দায় লইবেন? তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশই রহিয়াছে, যাহারা চাহিলেই ঘরে ঘরে আলোর বন্যা আনিতে পারিতেন; কিন্তু তাহা না করিয়া অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে কলকারখানার পাওয়ার সাপ্লাইকেই সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়াছে। আবার অনেক দেশ হাঁটিয়াছে উলটা পথে। যাহারা উলটা পথে হাঁটিতেছে তাহাদের অবস্থা হইল বাংলা প্রবাদের মতো—‘উপরে ফিটফাট ভিতরে সদরঘাট’।

সত্যিকার অর্থে একটি সমাজ ও রাষ্ট্র আগাইয়া যায় যথাযথ পরিকল্পনা ও উহার বাস্তবায়নের মাধ্যমে। ইহার ব্যত্যয় ঘটিলে, অর্থাৎ পরিকল্পনায় সঠিক দিশা না থাকিলে সমস্যার পাহাড় জমিতে থাকে। আমরা যে দ্রুতগতির এবং জটিল বিশ্বে বসবাস করি, সামগ্রিক সাফল্য পাইতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করিবার ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অগ্রাধিকার নির্ধারণ করিবার ক্ষমতা আমাদের সময়, শক্তি ও অর্থকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাইতে সহযোগিতা করে।

সঠিক অগ্রাধিকারের ক্ষমতা একটি দিকনির্দেশক তথা কম্পাসতুল্য। ইহা আমাদের পছন্দ এবং দায়িত্বের গোলকধাঁধায় পথ দেখায়। সঠিক অগ্রাধিকার না থাকিলে আমাদের মানসিক চাপ ও অস্থিরতা বাড়ে এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। অগ্রাধিকার আমাদের বিজ্ঞতার সহিত সম্পদ বরাদ্দ ও ব্যবহার করিবার ক্ষমতা দেয়। অগ্রাধিকার ইহাই নিশ্চিত করে যে আমরা সত্যিকারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির উপর ফোকাস করিতেছি এবং আমাদের প্রচেষ্টা হইতে সর্বাধিক পরিপূর্ণতা লাভ করিতেছি। এক কথায় বলা যায়, অগ্রাধিকারের গুরুত্ব বিবেচনা করিবার অর্থ হইল—ইহা একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং ফলপ্রসূ জীবন-সমাজ ও রাষ্ট্রের দিকে একটি শক্তিশালী পদক্ষেপকে নির্দেশ করিয়া থাকে। সুতরাং অগ্রাধিকার সঠিকভাবে বিবেচনা ব্যতীত আমাদের একটি পা ফেলিবারও অবকাশ নাই।

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন