চিত্রনায়ক ফারুকের মৃতদেহ যখন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় তখন জায়েদ খান একটি সেলফি পোস্ট করেন নিজের ফেসবুকে। যেখানে ফারুকের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে চিত্রনায়ক জায়েদ খান ও জয় চৌধুরীকে দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরেই নানা মহলে আলোচিত হয়, শিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদন থাকাকালীন থেকে শুরু করে নানা নেতৃত্বে চিত্রনায়ক ফারুকের সাপোর্ট, আদর ভালোবাসা পেয়ে এসেছেন। তাই বিমানবন্দর থেকেই প্রিয় মানুষটির সঙ্গে যুক্ত হন জায়েদ খান। তবে এবার জীবিত ফারুক নয়, তিনি পাশে পেলেন নিথর দেহের ফারুককে! ঢাকা শহরে ফারুক ফিরলেন, তবে শেষ বিদায় নিতে এলেন। সিঙ্গাপুরে এই নায়কের প্রথম জানানা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী এফডিসিতে দ্বিতীয় জানাজা, চ্যানেল আই প্রাঙ্গণ ও গুলশান আজাদ মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য ফারুকের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। প্রতিটি স্থানেই ঢাকা শহরে অবস্থানরত শিল্পী, নির্মাতা-কলাকুশলী, বিশেষ করে যারা চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন তারা ছুটে আসেন শেষবার দেখতে, শ্রদ্ধা জানাতে তাদের প্রিয় ফারুক ভাইকে।
চিত্রনায়ক শাকিব খানও তার নতুন ছবির লুক নিয়েই চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে সরাসরি চলে আসেন ফারুকের জানাজায়। তার চোখ-মুখে দেখা যায় শোকের ছায়া। এ সময় শাকিব খান-মিশা সওদাগর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পাশাপাশি অন্যান্য শিল্পী-কলাকুশলীদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায় তাকে। বিষণ্ন মনে শাকিব বলেন, ‘ফারুক ভাই যতদিন সুস্থ ছিলেন, সবসময় ওনার স্নেহে আমাকে আগলে রেখেছিলেন। বলতেন, আমার চলচ্চিত্রের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। তিনি যতদিন সুস্থ ছিলেন, সিনেমার জন্য কাজ করে গেছেন। একটা কথা প্রায়ই বলেন, এরা সবাই আমার প্রাণের মানুষ। অনেক বড় মনের মানুষ ছিলেন। শুধু একজন কিংবদন্তী অভিনেতাই নন, একজন সফল মানুষ ছিলেন ফারুক ভাই। ফারুক ভাইকে হারিয়ে শুধু আমি না, গোটা সিনেমা অঙ্গন একজন অভিভাবককে হারালো।’ অভিনেতা মিশা সওদাগর বলেন, ‘চিত্রনায়ক বা মহানায়ক অনেকেই আসেন আবার চলেও যান। তবে আমাদের ফারুক ভাই নিজের মতো করেই সবার সঙ্গে চলতেন। সেটা স্পটবয় থেকে শুরু করে শিল্পী-নির্মাতা যে-ই হোক। তার মতো বড় মনের মানুষ আর কখনও আমাদের পাশে থাকবে না, ভাবতেই পারছি না। আল্লাহ ওনাকে ভেহেস্ত নসীব করুন।’
চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘বাংলা চলচ্চিত্রের মিয়াভাইকে যেকোনো সংকট, আনন্দ-উত্সবে পাশে পেয়েছি। নিজের যত ব্যস্ততাই থাকুক তিনি চলে আসতেন। কিন্তু এবার এফডিসিতে এলেন নিথর দেহে। তাকে এভাবে এত দ্রুত হারিয়ে ফেলবো কল্পনা করতেই বুকটা কেঁপে উঠছে। মৃত্যু সবারই নির্ধারিত, তবে কারও কারও মৃত্যু বুকে ক্ষত তৈরি করে যায়।’ এছাড়াও সবাইকে বিমর্ষ দেখা যায়। কারণ চিত্রনায়ক ফারুকের সঙ্গে প্রায় সবারই একটা আত্মিক সম্পর্ক ছিল। যা মূলত পেশাগত জীবনের বাইরের পরিবারের সদস্যদের মতো। তাই হয়তো বারবার চোখ মুছতে দেখা যায় চিত্রনায়ক ইমনকে। তিনি বলেন, ‘ফারুক ভাই আমার যেকোনো বিষয়ে বড় ভাইয়ের মতো অর্ডার দিয়ে কথা বলতেন। আমি সবসবময়ই তার সেই আদেশ মেনে চলার চেষ্টা করতাম। ফারুক ভাইয়ের একটা ফোন পেলে সেই দিনটাই ভালো হয়ে যেত। তার বাসা বা এফডিসিতে তার সঙ্গে একাধিকবার আড্ডা দিয়েছি। তিনি পিঠে হাত চাপড়ে আদর করে সবসময় কথা বলতেন। সেই মানুষটি আর নেই! এটা মনকে বোঝাতেই পারছি না। এর আগে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নায়ক পুত্র রওশন হোসেন পাঠান শরত্ সবার কাছে অনুরোধ করেন, বাবার কাছে কোনো দাবি না রাখার জন্য। শরত্ বলেন, ‘আমার বাবা চলে গেলেন। আপনারা আমার বাবা প্রতি কোনো দাবি রাখবেন না। তার জন্য দোয়া রাখবেন।’ এ সময় জায়েদ খান বলেন, ‘ফারুক ভাই বাংলা সিনেমার উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। যেকোনো বিপদাপদে আমরা সব সময় কাছে পেয়েছি তাকে। তার মৃত্যুতে অভিভাবক হারালাম আমরা। আর এ শূন্যতা কখনও পূরণ হওয়ার নয়।’ এছাড়াও এফডিসিতে প্রিয় ফারুকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন শোকাহত অভিনেত্রী সুজাতা, অঞ্জনা, অরুণা বিশ্বাসসহ অনেকেই।
উল্লেখ্য, গত সোমবার সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফারুক। গতকাল সন্ধ্যায় গাজীপুরের কালিগঞ্জে নেওয়া হয় ফারুকের মরদেহ। সেখানে দখিন সোম টিওরী জামে মসজিদে জানাজা শেষে পাঠান বাড়ি পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয় এই অভিনেতাকে।
