সৌদি আরবের জেদ্দায় আরব লীগের সম্মেলনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। শুক্রবারের (১৯ মে) বৈঠকের শুরুতে সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান আসাদকে আলিঙ্গন ও হ্যান্ডশেক করে শুভেচ্ছা জানান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আরব লীগের নেতারা বছরের পর বছর ধরে আসাদকে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু সম্প্রতি নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা শত্রুতার অবসান ঘটিয়ে আসাদকে তাদের মাঝে ফিরিয়ে এনেছে। আসাদ শিয়া ইরান ও রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সহায়তায় সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে তার শত্রুদের পরাজিত করেছেন।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তি আরব দেশগুলোতে এই নীতি পরিবর্তনের বিরোধিতা করেছে। সম্মেলনে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির উপস্থিতি এবং যুবরাজ মোহাম্মদের সঙ্গে ইউক্রেনের সংঘাতের মধ্যস্থতার জন্য রিয়াদের প্রস্তুতির সঙ্গে বিশ্ব মঞ্চে প্রভাব বিস্তারের জন্য সৌদি আরবের প্রচেষ্টা আরও তুলে ধরা হয়।
তেল সমৃদ্ধ সৌদি আরব, যা একসময় যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিল, গত বছর আরব বিশ্বে কূটনৈতিক নেতৃত্ব গ্রহণ করে। সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরানের সঙ্গে পুনরায় কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে।
সৌদি আরব সিরিয়াকে আরব লীগে ফিরিয়ে এনেছে এবং সুদানের সংঘাতের মধ্যস্থতা করছে। অনেক আরব দেশ এখন আশা করছে, আসাদ ইরান থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পদক্ষেপ নেবেন। সম্মেলনে আসাদ বলেন, 'আরববাদ হচ্ছে সিরিয়ার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত।'
কিন্তু জেদ্দায় তিনি কয়েক দশকের ঘনিষ্ঠ মিত্র তেহরান সম্পর্কে কিছুই বলেননি। বরং পরোক্ষভাবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সমালোচনা করেন তিনি। এরদোয়ান সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে আসছেন এবং সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে তুর্কি বাহিনী পাঠিয়েছেন।
আসাদ সুন্নি ইসলামী গোষ্ঠী মুসলিম ব্রাদারহুড দ্বারা প্রভাবিত "সম্প্রসারণবাদী উসমানীয় মনোভাবের বিপদ" সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। সিরিয়া ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্র মুসলিম ব্রাদারহুডকে শত্রু মনে করে।
সম্মেলনে যুবরাজ মোহাম্মদ বলেন, 'আমি আশা করছি, আরব লীগে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে সিরিয়ার সংকটের অবসান ঘটবে।' ২০১১ সালের শুরুর দিকে সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের ওপর নৃশংস অভিযান এবং সিরিয়ায় বিধ্বংসী যুদ্ধের পর আসাদ ও তার সরকারকে আরব লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়।
সিরিয়া যুদ্ধে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। মোহাম্মদ বলেন, 'সৌদি আরব আমাদের অঞ্চলকে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হতে দেবে না। সংঘাতের বেদনাদায়ক বছরের পৃষ্ঠাগুলো ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।'
আসাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পদক্ষেপে আপত্তি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, অবশ্যই, প্রথমে সিরিয়ার সংঘাতের একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রগতি হওয়া দরকার।]
এক সংবাদ সম্মেলনে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ বলেন, 'আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্রদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারি, তবে চলমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন উপায় প্রয়োজন এবং সংলাপ ছাড়া তা সম্ভব নয়। আমরা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে তাদের উদ্বেগের উত্সগুলো নিয়ে আলোচনা করব।'
পারস্য উপসাগরীয় সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র রয়টার্সকে বলেছেন, 'আমেরিকানরা হতাশ। আমরা, এই অঞ্চলে বসবাসরত লোকেরা, হাতে থাকা উপায়গুলো দিয়ে আমাদের সমস্যাগুলো যথাসাধ্য সমাধান করার চেষ্টা করছি।'
উপসাগরীয় এক বিশ্লেষক রয়টার্সকে বলেন, 'সিরিয়া ইরানের দখলদার রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আমরা কি চাই? সিরিয়া কম আরব ও আরও ইরানি হোক নাকি আরব কাঠামোয় ফিরে আসুক?'
আসাদের প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি আরব দেশগুলো চায় সিরিয়া থেকে সৃষ্ট মাদক ব্যবসা বন্ধে তিনি যেন পদক্ষেপ নেন। এসব মাদক সিরিয়ার অভ্যন্তরে উৎপাদিত হচ্ছে এবং সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করা হচ্ছে।
