চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সময়ে অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতিসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের সব ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উন্নত দেশে তরুণ-তরুণীরা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ক্যারিয়ার এবং উদ্যোক্তা হওয়ার দিকে ঝুঁকছে। অথচ বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম হাতেগোনা কয়েকটি চাকরির পেছনে ছোটার কারণে নিজেরা হতাশ হচ্ছেন এবং দেশে জ্যামিতিক হারে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে।
বলতে দ্বিধা নেই, সরকারি চাকরির প্রতি আমাদের অত্যধিক আগ্রহ এক প্রকার সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। অথচ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের উচিত স্মার্ট ক্যারিয়ারের প্রতি জোর দেওয়া। স্মার্ট ক্যারিয়ার কেমন হবে, সেটার কোনো সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নেই। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নিজের প্রতিভা কাজে লাগিয়ে ভিন্নতা, সৃজনশীলতা ও সততার মাধ্যমে সম্পন্ন যে কোনো উপার্জন মাধ্যমই স্মার্ট ক্যারিয়ার। স্মার্ট ক্যারিয়ারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন প্রজন্মের প্রতিভার যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বেকারত্ব নির্মূল করা এবং দেশের অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব জোয়ার আনা। যেমন—অনেক তরুণ হাঁসমুরগি কিংবা গরুর খামার করে কোটিপতি হয়েছেন। আবার অনেক তরুণী ফ্রিল্যান্সিং করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। সমস্যা হচ্ছে, যখন কিছু উদ্যমী তরুণ স্রোতে গা না ভাসিয়ে চাকরির পরিবর্তে নতুন কিছু করার চেষ্টা করে, আমাদের সমাজ তখন হতাশার জল ছিটিয়ে তাদের এগিয়ে চলার পথকে রুদ্ধ করে দেয়। আর এজন্যই হয়তো আমাদের দেশে বিল গেটস, জ্যাক মা কিংবা ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তির জন্ম হয় না।
এখানে আরো দুটি কঠিন বাস্তবতা রয়েছে। প্রথমত, বেশির ভাগ তরুণ অর্থসংকটের কারণে প্রতিভা ও ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্মার্ট ক্যারিয়ারের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায় না। দ্বিতীয়ত, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার সঙ্গে ক্যারিয়ারের প্রস্তুতি অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় সদ্যস্নাতক শেষ করা শিক্ষার্থীরা হতাশায় ভেঙে পড়েন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা এখনো আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। সেজন্য বেশির ভাগ শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে গিয়ে হোঁচট খান। কেননা, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা আন্তর্জাতিক মানের না হলেও মালটি ন্যাশনাল কোম্পানি এবং করপোরেট সেক্টরে জব করতে আমাদের ঠিকই আন্তর্জাতিক মানের হতে হয়।
সবচেয়ে ভালো হয় যদি সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যৌথভাবে স্নাতক পর্যায়েই আমাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলে। এজন্য একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে কম্পিউটার স্কিল, কমিউনিকেশন হ্যাকস, টিম ওয়ার্ক, লিডারশিপ, ইউনিক আইডিয়া জেনারেট, প্রবলেম সলভিং অ্যান্ড ইন্সট্যান্ট ডিসিশন মেকিং এবং ফিল্ড ওয়ার্কসহ ক্যারিয়ারভিত্তিক বাস্তবিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বহুমুখী উদ্যোগ নিতে হবে। এক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে ইন্টারন্যাশনাল সেমিনারের আয়োজন করাটাও খুব প্রয়োজন, যেখানে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সফল ব্যক্তিবর্গ অংশগ্রহণ করবেন। তাছাড়া তরুণ প্রজন্মকে উদ্যোক্তা হতে অনুপ্রাণিত করতে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও তাদের অর্থনৈতিক সহায়তা করতে হবে। এটা সত্য যে, আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশে বিশাল এই তরুণ সমাজকে এভাবে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত করে তোলা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জস্বরূপ। তবে সরকার, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যদি এই চ্যালেঞ্জ সফল করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চমক দেখাবে নিঃসন্দেহে। তরুণ সমাজ জনসম্পদে রূপান্তরিত হলে স্মার্ট বাংলাদেশের চারটি ভিত্তি অর্থাৎ স্মার্ট অর্থনীতি, স্মার্ট নাগরিক, স্মার্ট সরকার ও স্মার্ট সমাজ খুব সহজেই প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
