সুপ্রাচীন কাল হইতেই বিশ্বব্যাপী ‘পর্যটন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছে। আজিকার দিনে পর্যটন নিছক আনন্দ-বিনোদনের উপলক্ষ্য নহে, বরং ইহা উন্নীত হইয়াছে শিল্পের পর্যায়ে। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে পর্যটন বর্তমানে অন্যতম অগ্রাধিকার খাত। এই খাতে আমাদেরও রহিয়াছে অমিয় সম্ভাবনা। বেশ খানিকটা অগ্রগতিও করিয়াছি আমরা এই শিল্পে। তথাপি রহিয়াছে কতিপয় উদ্বেগের কারণও। আমরা লক্ষ করিয়া আসিতেছি, এই শিল্প মাঝেমধ্যেই বিশেষ করিয়া নিরাপত্তাহীনতার কবলে পড়িয়া থাকে। যে কোনো স্থানের পর্যটন বিকাশের অন্যতম পূর্বশর্ত হইল কাঙ্ক্ষিত সেবা ও নিরাপত্তার বিধান। এই নিরাপত্তাহীনতায় পর্যটকের আস্থা ও বিশ্বাস যাহাতে নষ্ট না হয়, সেদিকে নজর দিতে হইবে।
স্মর্তব্য, ২০২১ সালের ২৫ আগস্ট হবিগঞ্জের টিক্কা হাওরে ঘুরিতে আসা স্বামীকে বাঁধিয়া রাখিয়া স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটিলে তাহা সমগ্র দেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়। রাজধানী ঢাকার রায়েরবাজারে বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ দেখিতে গিয়া জাপানের দুই নাগরিক ছিনতাইকারীর কবলে পড়িলে সেই ঘটনায়ও এই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এইভাবে দেশের পর্যটন স্পট বা বিনোদনকেন্দ্রগুলিতে বেড়াইতে আসিয়া ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, ছিনতাই, হয়রানি বা উত্ত্যক্তের শিকার হওয়ার মতো ঘটনাকে হালকা করিয়া দেখার কোনো সুযোগ নাই। ইহা আমাদের পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নের জন্য প্রতিবন্ধক। মূলত, যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থার অপ্রতুলতার সুযোগ লইয়া বেপরোয়া হইয়া উঠিতেছে অপরাধীরা। ট্যুরিস্ট পুলিশ প্রধান বলিতেছেন, সীমিত জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্টের অভাবে সব স্পট নিরাপত্তাগত সেবার আওতায় আনা যায় নাই। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ১ হাজার ৬৭৫টি পর্যটনকেন্দ্র রহিয়াছে, যাহার মধ্যে ৩২ জেলার ১০৪টি স্পটে পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করিতেছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা। অর্থাৎ, বাকি ১ হাজার ৫৭১টি স্পটেই নাই সুরক্ষাব্যবস্থা। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ দিনগুলিতে কয়েকটি স্পটে দায়িত্ব পালন করিলেও অন্য সময় স্পটগুলি থাকে অরক্ষিত। সেই সকল স্থানে বেড়াইতে গিয়া নানা অপ্রীতিকর ঘটনার মুখে পড়িয়া তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে পর্যটনবিমুখ হইয়া পড়িতেছে মানুষ। ট্যুরিস্ট পুলিশের সেবার মান লইয়াও প্রশ্ন উঠে বিভিন্ন সময়। বিশেষ করিয়া সকল স্পটে না হইলেও বিদেশি ও ভিন্ন জেলার মানুষ সচরাচর ভ্রমণ করেন—এমন ৪০০ স্পটে ট্যুরিস্ট পুলিশ নিয়োগের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। ট্যুরিস্ট পুলিশ বাহিনীতে জনবল বৃদ্ধির পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে হেলিকপ্টার রেসকিউ টিম, ডুবুরি দল, স্পিডবোট, নজরদারি ড্রোন ইত্যাদি সুবিধা সংযোজন করা দরকার। এই খাতের বিভিন্ন নেতিবাচক চিত্রের কারণে বিদেশি পর্যটকেরা বাংলাদেশে ভ্রমণের ব্যাপারে আগ্রহ হারাইতে পারেন। ইহাতে বৈদেশিক মুদ্রা হইতে বঞ্চিত হইবে দেশ।
আকর্ষণীয় পর্যটনের জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রাকৃতিক উপাদান রহিয়াছে বাংলাদেশে; কিন্তু পর্যটনের বিকাশে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তথা ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করিতে না পারিলে সুফল ঘরে তোলা যাইবে না। এই বিবেচনায় ‘নিরাপদ পর্যটন’ গড়িয়া তুলিতে সংশ্লিষ্ট সকলের আরো আন্তরিকভাবে কাজ করা প্রয়োজন। পর্যটকদের নিরাপত্তার পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলির সুরক্ষা নিশ্চিত করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখ্য, সভ্যতার বিকাশের পাশাপাশি পর্যটনের রূপ ও প্রকৃতিতে আসিয়াছে অভাবনীয় পরিবর্তন। বর্তমান সময়ে পর্যটন শুধু দেশভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই, বরং সমগ্র মানবগোষ্ঠীর জন্য ইহা হইয়া উঠিয়াছে একটি বিশ্বজনীন শখ ও নেশা। আজিকার বিশ্বে ইহা ব্যবসায়-বাণিজ্যের সহিত বহুমাত্রিকভাবে সংযুক্ত। অতএব, বাংলাদেশের পর্যটন খাতের ক্রমবর্ধমান সম্ভাবনার বিষয়কে মাথায় রাখিয়া ইহার নিরাপত্তাহীনতাসহ এই শিল্পের বিকাশের পথে যেই সকল প্রতিবন্ধকতা রহিয়াছে, তাহা দূরীকরণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে বলিয়া আমরা মনে করি।
