সেপটিক ট্যাংকের বিষাক্ত গ্যাসে বাড়ছে শ্রমিকের মৃত্যু, দায় কার ?

আপডেট : ২৯ মে ২০২৩, ০৬:০৩

দেশে সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে না। যার কারণে সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। যে সব শ্রমিক মারা যাচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগই অপ্রশিক্ষিত, নানা ধরনের গ্যাস জমে তা যে প্রাণঘাতী হতে পারে, তা তাদের জানা নেই। অন্যদিকে দীর্ঘদিন সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার না করায় বিস্ফোরণের ঘটনারও খবর পাওয়া যাচ্ছে। শ্রমিক মৃত্যু ঠেকাতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা থাকলেও সেটির বাস্তবায়ন নেই, নেই তদারকিও। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক দিয়ে ট্যাংক পরিষ্কার করা বন্ধ করতে হবে। বাড়াতে হবে সচেতনতা। নীতিমালার প্রয়োগ করতে হবে। রাজধানীর পানি সরবারহ ও স্যুয়ারেজ লাইনের বিল গ্রহণ করে ঢাকা ওয়াসা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ২০১৭ সালে দেওয়া একটি নির্দেশনায় বলা হয়, সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কারে দুর্ঘটনারোধে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে সিটি করপোরেশন/ ওয়াসা ব্যবস্থা  নেবে। অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক দিয়ে ট্যাংক পরিষ্কার করা যাবে না। নির্দেশনাগুলো হলো—সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং ওয়াসাসমূহ সেপটিক ট্যাংকের পয়ঃপরিষ্কার ও ব্যবস্থাপনার জন্য উপযুক্ত শ্রমিক বাছাইপূর্বক তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রত্যেক শ্রমিককে একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রদান এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিকদের একটি তালিকা স্ব স্ব দপ্তর/আঞ্চলিক দপ্তরে জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য করে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করবে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ এবং ওয়াসাভুক্ত এলাকার কোনো ভবন মালিক/প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান/ওয়াসায় বর্ণিতভাবে তালিকাভুক্ত শ্রমিক ছাড়া অন্য কোনো শ্রমিককে সেপটিক ট্যাংকের পয়ঃপরিষ্কার বা ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত করতে পারবে না।

সেপটিক ট্যাংকের পয়ঃপরিষ্কারকরণ বা ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান/ওয়াসায় তালিকাভুক্ত নয়, এমন শ্রমিক নিয়োজিত করা হলে এবং দুর্ঘটনার ফলে সে শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত বা তার মৃত্যু হলে, সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক/প্রতিষ্ঠানকে দুর্ঘটনা/ক্ষতি/মৃত্যুর আইনগত ও আর্থিক দায়-দায়িত্ব বহন করতে হবে। সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করার জন্য তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের জন্য একটি ন্যূনতম মজুরি থাকবে যা সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান/ওয়াসা নির্ধারণ করবে। ভবন মালিক/প্রতিষ্ঠান অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সেপটিক ট্যাংক নির্মাণ বা ব্যবহার না করলে এবং বছরে ১ বার সেপটিক ট্যাংক তালিকাভুক্ত শ্রমিক দ্বারা পরিষ্কার না করলে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান/ওয়াসা তাদের দ্বারা নির্ধারিত হারে জরিমানা আদায় করতে পারবে।

গতকালও রাজধানীর উত্তরখানে সেপটিক ট্যাংকে নেমে বিষাক্ত গ্যাসে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এদের দু্জনেই ছিলেন অপ্রশিক্ষিত শ্রমিক। অন্যদিকে সম্প্রতি সিদ্দিক বাজারে ভবনে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ধারণা করা হচ্ছে, সেটিও দীর্ঘদিন সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার না করায় বিষাক্ত গ্যাসে এ বিস্ফোরণ ঘটে। প্রায়ই দেশের বিভিন্ন জায়গায় এমন ঘটনা ঘটছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ট্যাংকে ভয়াবহ বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আফতাব আলি শেখ বলেন,  যদি ট্যাংকের পানিতে পরিত্যাজ্য ময়লা বা জৈবপদার্থ যায় তাহলে সেখানে ক্ষতিকারক মিথেন, কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মোনোক্সাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সালফার গ্যাস তৈরি হতে পারে। এসব গ্যাস তৈরির ফলে সে জায়গায় অনেক বেশি প্রেশার তৈরি হয় এবং ঐ জায়গায় অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। অক্সিজেন না থাকায় ট্যাংকের ভিতরের গ্যাস গ্রহণ করলে তা মানুষের সহ্যসীমার বাইরে চলে যায়। যার কারণে সে মারাও যেতে পারে। এছাড়া গ্যাসগুলো যদি ট্যাংকে বেশিদিন ধরে থাকে তাহলে বিস্ফোরণ ঘটার সম্ভাবনাও থাকে।

ট্যাংকের ভিতরে ক্ষতিকারক গ্যাস নির্ণয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, ট্যাংকের ভিতরের ক্ষতিকারক গ্যাস নির্ণয়ের জন্য সেন্সর পাওয়া যায়। সেই সেন্সর ব্যবহার করে গ্যাস শনাক্ত করা যায়। এজন্য ট্যাংক পরিষ্কারের জন্য শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি ও প্রশিক্ষিত লোক ছাড়া এমন ট্যাংক পরিষ্কার করা যাবে না। প্রয়োজনে ম্যানুয়ালি এই ধরনের ট্যাংক পরিষ্কার বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।  এ বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার মুখপাত্র মোস্তফা তারেক ইত্তেফাককে বলেন, এ বিষয়ে কোনো নীতিমালা আছে কি না সেটি আসলে আমার জানা নেই। তবে আমরা প্রায়ই এ বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাই। বিলের পেছনেও লেখা থাকে নিয়মিত বাড়ির সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করুন।

ইত্তেফাক/ইআ