হলফনামার তথ্য

রাজশাহীতে লিটনের সম্পদ ও আয় বেড়েছে কয়েক গুণ

আপডেট : ৩০ মে ২০২৩, ০২:১৪

রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সম্পদ আওয়ামী লীগের এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটনের। গত দেড় দশকে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েছেন  তিনি। আয় কম হলেও বেশি নগদ টাকা আছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা মুরশিদ আলম ফারুকীর। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জাকের পার্টির প্রার্থী লতিফ আনোয়ার দুজনই মাস্টার্স করেছেন। আওয়ামী লীগ প্রার্থী লিটন ইংরেজিতে বিএ (অনার্স) ও এলএলবি করেছেন। এছাড়া জাতীয় পার্টির প্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপন স্বাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া মেয়র প্রার্থীদের হলফনামা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের হলফনামায় দেখা যায়, তার বার্ষিক আয় ও সম্পদ দুটোই কয়েকগুণ বেড়েছে। পেশায় আইনজীবী লিটনের পেশাগত খাতে কোনো আয় না থাকলেও চার বছরে মত্স্য চাষে আয় বেড়েছে ১২ গুণ। ২০১৮ সালের নির্বাচনের সময় তার স্ত্রী, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-ভাপতি শাহীন আকতার রেণীর কোনো আয় না থাকলেও বর্তমানে তিনি ব্যবসা থেকে বার্ষিক ৩ কোটি ১০ লাখ টাকা আয় করেন। ফলে তারও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে।

হলফনামায় দেখা যায়, লিটনের হাতে নগদ আছে মাত্র ৭ লাখ ২ হাজার ২৩৭ টাকা। জাতীয় পার্টির সাইফুল ইসলাম স্বপনের হাতে নগদ টাকা আছে ৩ লাখ। জাকের পার্টির অ্যাডভোকেট লতিফ আনোয়ারের নগদ টাকা আছে ১ লাখ। মাওলানা মুরশিদ আলম ফারুকীর হাতে নগদ টাকা আছে ১২ লাখ।

খায়রুজ্জামান লিটনের এবারের হলফনামায় তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৯৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে কৃষি খাতে ২ লাখ ৩০ হাজার, বাড়িভাড়া ও অন্যান্য খাতে ৩৭ লাখ ৭০ হাজার, মত্স্য চাষ থেকে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা ও সম্মানি ভাতা ১৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। ২০১৮ সালের হলফনামায় মত্স্য খাতে আয় দেখানো হয়েছিল ২০ লাখ টাকা। এ হিসাবে মৎস্য খাতে তার আয় বেড়েছে ১২ গুণের বেশি। গত নির্বাচনের সময় তার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছিল ৭৮ লাখ ৩২ হাজার ২০৮ টাকা। এই হিসেবে তার আয় বেড়েছে তিন গুণের বেশি।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের বর্তমানে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৪ কোটি ১৭ লাখ ৬২ হাজার ৮৯৯ টাকার। বিগত মেয়াদে এই সম্পদের পরিমাণ ছিল ১ কোটি ৭৫ লাখ ৬৭ হাজার ২৭০ টাকার। বিগত মেয়াদের তুলনায় এই সম্পদ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এর মধ্যে এবার নগদ টাকা রয়েছে ৭ লাখ ২ হাজার ২৩৭ টাকা। গতবার ছিল ৩০ হাজার। এবার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রয়েছে ২ কোটি ৮৪ লাখ ৯১ হাজার ৮০০ টাকা। গতবার ছিল ১ কোটি ৩৮ লাখ ৫৩ হাজার ৪০৮ টাকা। এবার শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ রয়েছে ৪০ লাখ ৮৫ হাজার টাকার। গতবার এই খাতে কোনো বিনিয়োগ ছিল না। এবার জিপ ও কারের মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৬ লাখ ৩০ হাজার টাকার। গতবার ছিল ৩৬ লাখ ৩০ হাজার টাকার। স্বর্ণালংকার ৫৩ হাজার ৮৬২ টাকা। গতবার একই ছিল। বৈদ্যুতিকসামগ্রী এবার ২৫ লাখ, আসবাবপত্র ৭ লাখ এবং একটি শর্টগান ও পিস্তল মিলে ৬ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে।

হলফনামার তথ্য মতে, স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে এবার কৃষিজমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৪ দশমিক ৬৩ একর। গতবার ছিল ১ দশমিক ৬৩ একর। আবাসিক বাড়ির পরিমাণ একই রয়েছে। এবার মৎস্য খামার দেখানো হয়েছে ৭০ লাখ ১২ হাজার ১৯০ টাকা মূল্যের। গতবার এই খাত ছিল না। শুধু এই খাতে ২০ লাখ টাকার আয় দেখানো ছিল। এবার এই খাতে আয় দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। গত মেয়াদে হলফনামায় লিটনের কোনো ঋণ ছিল না। এবার পূবালী ব্যাংক লি. রাজশাহী শাখায় গাড়ি ক্রয় বাবদ ২০ লাখ ৭৯ হাজার ৩৭ টাকা ঋণ দেখানো হয়েছে।

হলফনামায় আরো দেখা যায়, গতবার লিটনের স্ত্রী শাহীন আকতারের কোনো ব্যবসা ছিল না। এবার তার ব্যবসা থেকে ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ও মৎস্য চাষ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা আয় দেখানো হয়েছে। ২০১৮ সালে তার কোনো স্থাবর সম্পদ ছিল না। তবে এখন কৃষিজমি আছে ১ দশমিক ৭৭ একর, মাছের খামার হয়েছে ৭৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকার। উপশহরে একটি পুরোনো দোতলা বাড়ি রয়েছে শাহীন আকতারের নামে।

২০১৮ সালের হলফনামায় অস্থাবর সম্পদের মধ্যে শাহীন আকতারের উপহার হিসেবে পাওয়া ৫০ ভরি স্বর্ণালংকার ছিল। এছাড়া ৯২ লাখ ৩ হাজার টাকা মূল্যের অন্য সম্পদ ছিল। এর মধ্যে নগদ ২০ হাজার টাকা, ব্যাংকে ৫৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা এবং ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার স্থায়ী আমানত ছিল। পাঁচ বছরে তার স্বর্ণ বাড়েনি। স্বর্ণ বাদে অন্য অস্থাবর সম্পদের মূল্য বেড়ে ২ কোটি ৮৪ হাজার টাকা হয়েছে। এর মধ্যে নগদ ১৮ লাখ ৪৭ হাজার ১৩০ টাকা, ব্যাংকে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৭৬ হাজার ৮৭০ টাকা, ১০ লাখ টাকার শেয়ার, ৯ লাখ টাকার স্থায়ী আমানত, আড়াই লাখ টাকার ইলেকট্রনিকস সামগ্রী এবং ২ লাখ ১০ হাজার টাকার আসবাবপত্র রয়েছে।

নিজের সম্পদ বৃদ্ধির বিষয়ে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘৪০ বছর ধরে রাজনীতি করছি এটুকু তো থাকবেই। দেশের বাইরে এক ছটাক কিছু নেই। আমি বৈধভাবেই যেসব সম্পদ অর্জন করেছি, তাই দেখানো হয়েছে। আর আমার স্ত্রীও ব্যবসা করেন। তিনি ভারত থেকে পাথর আমদানির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার মাছের ব্যবসাও রয়েছে। তিনিও ট্যাক্স দেন। কাজেই আমাদের অবৈধ কোনো সম্পদ বা টাকা নেই।’

এদিকে জাতীয় পার্টির মেয়রপ্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপনের পেশা ব্যবসা। সিজন্যাল পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করেন তিনি। তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জমা আছে ৫০ হাজার টাকা। নিজের আছে ১০ ভরি স্বর্ণ। কৃষিজমি আছে সাড়ে চার বিঘা আর অকৃষি জমির পরিমাণ ১২ শতক। স্ত্রী ও পরিবারের অন্য কারো নামে কোনো সম্পদ নেই।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়রপ্রার্থী মুরশিদ আলমের পেশা ধর্মীয় আলোচক ও টিউশনি। তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। তবে মুরশিদের হাতে নগদ আছে ১২ লাখ টাকা। নিজের আছে ১০ ভরি স্বর্ণ ও একটি মোটরসাইকেল। এছাড়া তেমন কোনো সম্পদ নেই।

জাকের পার্টির মেয়রপ্রার্থী লতিফ আনোয়ার এলএলএম পাশ। পেশায় আইনজীবী। তার পেশা থেকে বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা। ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্র আছে ৫০ হাজার টাকার। এছাড়া অন্য কোনো ধরনের সম্পদ নেই লতিফের।

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে ৪ আগস্টের নির্বাচনে প্রথম রাজশাহীর মেয়র নির্বাচিত হন এএইচএম খায়রুজ্জামান। এরপর ২০১৩ সালের ১৫ জুনের নির্বাচনে মহানগর যুবদলের তত্কালীন সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেনের কাছে হেরে যান। তবে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাইয়ের নির্বাচনে তিনি আবারও মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম প্রেসিডিয়ামের সদস্য ।

ইত্তেফাক/ইআ