তামাকমুক্ত সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করুন

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৩, ০৪:৫৬

বুধবার ৩১ মে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল :‘তামাকের বিজ্ঞাপন, প্রণোদনা ও পৃষ্ঠপোষকতা নিষিদ্ধ হোক’। বাংলাদেশ ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রণীত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)-এর প্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ এবং সবচেয়ে আগে অনুস্বাক্ষরকারী দেশগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশে ধূমপানজনিত প্রধান আটটি রোগে প্রতি বছর প্রায় ৫৭ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। দেশে প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয় ৪ লাখ মানুষ এবং ১ লাখ ৬০ হাজার জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করেন তামাকজনিত রোগে। প্রতি বছর যে ১২ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগের কারণে অনেক চিকিৎসা ব্যয় করেন। বাংলাদেশে তামাক সেবনের হার বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ কোনো না কোনো (ধোঁয়াযুক্ত কিংবা ধোঁয়াবিহীন) তামাক সেবন করেন। তামাক ব্যবহারকারিদের ৪৬ শতাংশ পুরুষ ও ২৫ শতাংশ নারী। একজন ধূমপায়ীর সিগারেটের জন্য প্রতি মাসের গড় ব্যয় প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা। এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ৬৬ শতাংশ ধূমপায়ীর ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা আছে। বাংলাদেশে ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত ধূমপায়ী টিবি রোগীদের ওপর এক গবেষণায় দেখা যায় যে, যারা নিয়মিত সাইকোলজিক্যাল থেরাপি নিয়েছেন, তাদের ধূমপান ছাড়ার ক্ষেত্রে বেশ সফলতা পেয়েছেন। সাইকোলজিক্যাল থেরাপি গ্রহণকারিদের এক-তৃতীয়াংশ ছয় মাসের মধ্যে ধূমপান ছেড়ে দিয়েছেন। যারা ছেড়ে দিয়েছিলেন, তাদের এক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, তারা আর সিগারেট ধরেননি। সাইকোলজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে ধূমপানের অভ্যাসের কারণ ও ট্রিগারগুলোকে বের করে সাইকোলজিক্যালি সমাধান করা হয়, তাই তামাক ছাড়া সহজ হয়। তামাক ছাড়া খুব কঠিন হলেও বেশকিছু পদ্ধতি আছে। তামাক ছাড়তে চাইলে নিজের পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করতে পারেন :

তামাক ছাড়ার পরিকল্পনা করুন :সব ধরনের তামাক ছাড়ার জন্য স্বচ্ছ পরিকল্পনা থাকা চাই। নিজেই প্রতিজ্ঞা করে একটি নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করুন। এই তারিখ থেকে পুরোপুরি তামাক ত্যাগ করুন। মনে রাখবেন, এই তারিখের পর এমন কোনো পার্টি বা আড্ডায় যাবেন না, যেখানে আবার তামাক নেওয়ার সুযোগ আছে।

নিজের ইচ্ছাশক্তি ঠিক করুন :তামাক ছাড়ার আগে লাভ ও ক্ষতি বিশ্লেষণ করে, কী কী কারণে আপনি তামাক ছাড়তে চান, তা ঠিক করে ফেলুন। এই কারণগুলো মোবাইলে লিখে নিজের ইচ্ছাশক্তি ঠিক করে রাখুন। যখনই তামাক নিতে ইচ্ছে করবে, মোবাইল খুলে এই কারণগুলো দেখতে পারেন।

ইতিবাচক থাকুন :অনেকেই বারংবার পরিকল্পনা করে ব্যর্থ হন আর তামাক ছাড়তে পারেন না। আপনার গত প্রচেষ্টার ব্যর্থতার কারণগুলো খুঁজে বের করে আবার যাতে কিছু না হয়, সেদিকে সাবধান থাকুন।

প্রিয়জন ও পরিবারের মানুষের সহায়তা নিন :ধূমপান ও তামাকজাতীয় দ্রব্য ছাড়তে প্রিয়জনদের সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জানা থাকলে তারা আপনাকে না করতে পারবেন। আপনার তামাকের নেশার টান উঠলেও তাদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারবেন।

অফিস ও বাসাবাড়ি পরিষ্কার করুন :অফিস ও বাসাবাড়ি পরিষ্কার থাকলে মনের চাপ কমে যাবে। এসব জায়গায় ফ্রেশনার ব্যবহার করে সুগন্ধ ছড়িয়ে দিন। অফিস ও বাড়িতে একটা ভালো গন্ধ থাকবে, তখন ধূমপান করতে ইচ্ছে করবে না।

লজেন্স ও চুইংগাম চিবান :লজেন্স ও চুইংগাম তামাকের নেশার টানে খুব ভালো কাজ করে। যখনই তামাকের নেশার টান উঠবে, তখনই তামাকের পরিবর্তে লজেন্স ও চুইংগাম নিলে ভালো বোধ করবেন। এই সময়ে পকেটে লজেন্স ও চুইংগাম রাখুন।

পারিবারিক সম্পর্ক ঠিক করুন :পরিবারের সম্পর্কগুলো ঠিক না থাকলে মানসিক চাপ বেড়ে যায়। পরিবারের সম্পর্কগুলো খারাপ থাকলে তাদের প্রতি যত্ন বাড়িয়ে দিন, খোলামনে সবার সঙ্গে কথা বলে সম্পর্ক ঠিক করে ফেলুন। প্রয়োজনে প্রফেশনাল সহায়তা নিয়ে পারিবারিক সম্পর্কগুলো নিয়ে কাজ করুন।

না বলতে শিখুন :আপনি তামাক নেওয়া ছেড়ে দিলেও আশপাশের মানুষ আপনাকে তামাক খেতে বা সিগারেট শেয়ার করার অনুরোধ করবেন এসব পরিস্থিতিতে আপনি না বলতে শিখলে সহজেই অভিযোজন করে নিজেকে তামাকমুক্ত রাখতে পারবেন।

মাইন্ডফুলনেন্স প্রাকটিস করুন :মাইন্ডফুলনেন্স প্রাকটিস করে বর্তমানে থাকতে পারলে অনেক মানসিক চাপ কমে যাবে। নিয়মিত মাইন্ডফুলনেন্স প্রাকটিস করতে পারলে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারা যায়। নিয়মিত প্রাকটিসে ঘুমের পরিমাণ ও গুণমান বাড়াতে সহায়তা করে, মানসিক চাপ কমিয়ে শারীরিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে, বিষণ্নতা, হতাশা এবং শারীরিক বিভিন্ন ব্যথা কমে যায়। এসব ব্যক্তির সহনশীলতা ও ধৈর্য বেড়ে যায়। ফলে তামাক ছাড়তে সহায়ক হয়।

মানসিক চাপ ব্যবস্থাপনা করুন :তীব্র মানসিক চাপ ধূমপানের তাগিদ তৈরি করে। সাইকোলজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে এই মানসিক চাপগুলোকে অনুসন্ধান করে, সাইকোলজিক্যাল থেরাপির মাধ্যমে বিকল্প মোকাবিলার পদ্ধতিগুলি বিকশিত করতে পারলে ধূমপানের ইচ্ছে কমে যায়।

কগনিটিভ বিহেবিয়ার থেরাপি নিন :অনেকগুলো গবেষণায় কগনিটিভ বিহেবিয়ার থেরাপি (সিবিটি) তামাক বন্ধে সবচেয়ে বেশি সহায়ক বলে প্রমাণিত হয়েছে। সিবিটির চিকিৎসা তামাক ছাড়ার ইচ্ছা বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে। তবে ধূমপান ছাড়ার ক্ষেত্রে কিছুদিন হাসপাতালে ভর্তি থেকে নিয়মিত কগনিটিভ বিহেবিয়ার থেরাপি নিলে খুব ভালো ফল পাওয়া যায়। বাংলাদেশে মেন্টাল হেলথ প্রফেশনালগণ কগনিটিভ থেরাপি প্রদান করেন।

লেখক : ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন