ফ্যাটি লিভারের লক্ষণগুলো প্রাথমিক অবস্থায় অপ্রকাশিত থাকে। ফলে রোগটির তীব্রতা বেড়ে গেলেই শুধু রোগী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। এবারের ন্যাস দিবসের থিম হলো ‘প্রাথমিক অবস্থায় ন্যাস শনাক্তকরণ এবং পরামর্শ প্রদানের পদক্ষেপ’। রোগটির কার্যকারণ ও নিরাময়ের বিষয়ে বোঝার জন্য গবেষণার দুটি উপাত্ত উপস্থাপন করছি :একদল মোটা ইঁদুর, আরেক দল পাতলা ইঁদুর। মোটা ইঁদুরের মল পাতলা ইঁদুরের শরীরে ঢোকানো হলো। ক্রমেই পাতলা ইঁদুরও মোটা হয়ে গেল। আবার দুই দল চর্বিওয়ালা মানুষের যকৃতে অণুবীক্ষণে একই রকম আলামত পাওয়া গেল। এক দল পর্যাপ্ত পরিমাণে মদ খেত, আরেক দল কোনো দিন মদ খায়নি। সবকিছুর পেছনে রয়েছে জিন, যা আমরা পরিবর্তন করতে পারি না। আবার একই জিন থাকা সত্ত্বেও এক বায়োলজিক্যাল বাবার দুই ছেলে—এক জন স্থূলকায়, অন্যটি শীর্ণকায়। পিস্তল থাকলেও গুলি বের হবে না, যতক্ষণ ট্রিগার না চাপি। ওপরের দুটি উপাত্তের ট্রিগার হলো অন্ত্রের অপকারী জীবাণুর কারসাজি। মদ না খেয়েও যকৃতে একই রকম আলামত থাকার কালপ্রিট হিসেবে পাওয়া গেল অন্ত্রের জীবাণু প্রিবোটোলা ও ইস্কোরিসিয়াকে, যারা খাদ্যকে ভেঙে মদ তৈরি করতে পারে এবং যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত করে। যকৃতে চর্বির সহযোগী স্টেকহোল্ডার হলো :শরীর স্থূলকায়, বহুমূত্র (টাইপ ২), রক্তে ক্ষতিকর চর্বির আধিক্য, রক্তচাপ বৃদ্ধি, ইনসুলিন রেসিটেন্স ইত্যাদি। ট্রিগার হলো রিফাইন্ড শর্করা, সম্পৃক্ত চর্বি, বেশি ট্রান্সফ্যাট-সমৃদ্ধ খাবার, খাবারে লবণের আধিক্য এবং শারীরিক কসরতের স্বল্পতা। প্রয়োজন ছাড়া এন্টিবায়োটিক ও প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর অন্ত্রের উপকারী জীবাণু ব্যাকটেরয়েডসকে মেরে ফেলছে এবং ক্ষতিকর জীবাণুর আধিক্যই (ফারমিকিউটর, প্রিবোটোলা, ইস্কিরিসিয়া) হয়তো অনেক বিপাকজনিত রোগের মূল কারণ। তাই তো ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক লিভার পণ্ডিতগণ যকৃতে চর্বিরোগ ন্যাস বা নন-এলকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজওর্ডারের না পরিবর্তন করে যৌক্তিক একটা নাম নির্দিষ্ট করেছেন, যা দিয়ে রোগের কার্যকারণ, রোগ নির্ণয় ও জটিলতা সম্পর্কে আঁচ করা যায়। নামটি হলো মেটাবেলিক অ্যাসোসিয়েটেড ফ্যটি লিভার ডিজিজ (বিপাক সম্পর্কিত যকৃতে চর্বি রোগ)। অর্থাৎ, মদ্যপান না করলেও সারা দুনিয়ার শতকরা ২৫ ভাগ (এশিয়ানরা প্রায় ৩০ ভাগ এবং শহরের মানুষ বেশি ভুগছেন) আঠারোর্ধ্ব বয়সি মানুষের যকৃতে চর্বি জমেছে (মদ্যপায়ীদের মতোই চর্বি জমা)। যাদের শতকরা ২৫ ভাগ সাত-আট বছর পর লিভার সিরোসিস, লিভার ক্যানসার, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও হৃদরোগের কারণে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। একই রোগীর উভয় কারণের জন্য যকৃতে চর্বি জমতে পারে—যদি মদ্যপায়ী হন। কারো মেটাবলিক কারণ প্রকট হয়, আবার কারো অ্যালকোহলিক কারণ প্রকট হয়। যকৃৎ কোষে প্রদাহের আলামত থাকলে লিভার বায়োপসি ও হিস্টোপ্যাথোলজির প্রয়োজন হয়, যা দিয়ে যকৃৎ রোগের তীব্রতা (প্রবাহ ও যকৃৎ শক্ত হওয়া) বোঝা যায়। প্রদাহ থাকলে ভিটামিন ‘ই’ কিছুটা কাজ করে (সিরোসিস হয়ে গেলে কোনো কাজ করে না) যকৃতে চর্বি কমানোর আসল চিকিৎসা হলো নিয়মিত ব্যায়াম (হাঁটা, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার, দৌড়ানো সপ্তাহে পাঁচ দিন, দৈনিক ৪৫-৬০ মিনিট) ও ওজন কমানো—যদি ওজন বেশি থাকে। ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখা অতীব জরুরি। ওজন বেশি থাকলে ছয় মাসে বর্তমান ওজনের শতকরা ১০ ভাগ পর্যন্ত ওজন কমানো যাবে, তবে প্রায় শতকরা ১০ ভাগ রোগীর এর অধিক ওজন কমানোর প্রয়োজন হয়। ব্যায়াম তখনই কার্যকর হবে, যখন হার্টরেট ঐ ব্যাক্তির সর্বোচ্চ হার্টরেটের শতকরা ৬০-৭০ ভাগ হয়। ব্যক্তির ওজন ২২০ থেকে বিয়োগ করলে যা হবে, তা হলো একজন মানুষের সর্বোচ্চ হার্টরেট। খাবারে শর্করা ও চর্বির পরিমাণ শতকরা ৩০ ভাগ কমাতে হবে। প্রোবায়েটিক কিছুটা কাজ করতে পারে। অন্ত্রের জীবাণু সম্ভারের সমতা ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। ওজন, ডায়াবেটিস, চর্বি, উচ্চরক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম চিকিত্সার আসল বিষয়। হয়তো ভবিষ্যতে মিনিমাল ইনভেসিব পদ্ধতিতে (ডিওডেনাল মিউকোসাল রিসারফেসিং) ওজন কমাতে এবং শর্করা নিয়ন্ত্রণে এন্ডোসকপিস্টরাও এগিয়ে আসবেন।
ফ্যাটি লিভারের রোগীরা কী কী খেতে পারবেন :শাকসবজি (সব ধরনের), মুরগির মাংস, লাল আটার রুটি, মাছ, ডিম (সপ্তাহে দুই-তিনটা ), সরবিহীন দুধ, ফল (সব ধরনের) কফি, গ্রিন টি, সূর্যমুখী তেল বা অলিভ অয়েল, সয়া প্রোটিন। ফ্যাটিলিভারের রোগীরা যা খেতে পারবেন না :মদ, তেলে ভাজা বা চর্বিযুক্ত খাবার—বার্গার, বিরিয়ানি, চিপস, লাল মাংস—গরু বা খাসির মাংস, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার, চকলেট, পেস্ট্রি, কেক, ময়দার রুটি, অপরিমিত ভাত, পাস্তা নুডলস, পনির, বোতলজাত কোমল পানীয়।
উপসংহারে বলব, যকৃতের চর্বি প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিরোধ না করতে পারলে কারো কারোর রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, সুস্থ জীবনধারা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং শরীরের শর্করা, চর্বি, উচ্চরক্তচাপ এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ ন্যাস প্রতিরোধের মূল বিষয়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিভাগ, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল
