নিম্ন আদালতে নির্বাচন চ্যালেঞ্জের নজির নেই

আপডেট : ১১ জুন ২০২৩, ০৭:৩২

বিভিন্ন নির্বাচন নিয়ে সংবিধান বা আইন যথাযথ অনুসরণ ছাড়াই আদেশ প্রদানের ঘটনা ঘটছে নিম্ন আদালতে। এতে করে নির্বাচন আয়োজনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের যুক্তিসঙ্গত নোটিশ বা শুনানির সুযোগ ছাড়াই নির্বাচনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া পৌরসভা নির্বাচন নিয়ে এমন আদেশ এসেছে নিম্ন আদালত থেকে। নির্বাচন কমিশনের কোনো ধরনের শুনানির সুযোগ না দিয়ে একটি ওয়ার্ডের ভোটার তালিকার ওপর আদেশ দেন সহকারী জজ আদালত। যদিও নির্বাচন কমিশন থেকে সেই আদেশের ওপর চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছে ইসির সংশ্লিষ্টরা। তারা ইত্তেফাককে বলছেন, নির্বাচন কমিশনের ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির নেই। এ বিষয়ে ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম ইত্তেফাককে বলেন, আইনানুযায়ী নিম্ন আদালত নির্বাচন নিয়ে কোনো আদেশ দেওয়ার নজির নেই। তবে সংক্ষুব্ধরা ইচ্ছে করলে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।

ইসির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, এর আগে ১৯৯৮ সালে একবার এই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। তখন নির্বাচন কমিশন আইনে প্রদত্ত ক্ষমতার ধারাসমূহ উল্লেখ করে প্রতিটি জেলা জজকে পত্র দিয়ে নির্বাচনের ওপর কোনো বিধিনিষেধ আরোপ না করার কথা উল্লেখ করেছিল। এর পরে কখনোই নিম্ন আদালত কোনো নির্বাচনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি।

গত ৩১ মে সকালে ভাণ্ডারিয়াসহ ৮টি পৌরসভার নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করে ইসি। ঐ দিনেই ভাণ্ডারিয়া পৌরসভার একটি ওয়ার্ডের ভোটার তালিকার ওপর স্থিতিবস্থা আরোপ করে পিরোজপুরের সহকারী জজ আদালত। সেই আদেশে বলা হয়, ৩নং বিবাদী পক্ষ ওকালতনামা যোগে হাজির হন এবং জবাব ও আপত্তি দাখিলের জন্য সময় প্রার্থনা করেন। মামলা বিবাদী করা হয় তিন জনকে। তারা হলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি), পিরোজপুর জেলা নির্বাচন অফিসার এবং ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসার। তবে নির্বাচন কমিশন থেকে বিবাদী পক্ষের কেউই উপস্থিত ছিলেন না বলে জানানো হয়েছে।  তবে ৩ নম্বর বিবাদী ভাণ্ডারিয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসারের দায়িত্বরত মঠবাড়িয়া উপজেলা নির্বাচন অফিসার নাজমুল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি কোনো ওকালতনামা নিয়ে আদালতে হাজির হইনি। আমার কোনো বক্তব্যও নেওয়া হয়নি।’

এ বিষয়ে ২ নম্বর বিবাদী জেলা নির্বাচন অফিসার জিয়াউর রহমান খলিফা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে কেউই আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। আমাদের কোনো বক্তব্যও নেওয়া হয়নি। ’

এর আগে গত ২৩ মে সহকারী জজ আদালতে (ভাণ্ডারিয়া) অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রার্থনা করেন। ৩০ দিনের মধ্যে ১ নম্বর বিবাদীকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সহকারী জজ (ভাণ্ডারিয়া) ছুটিতে গেলে পুনরায় মামলা আসে সিনিয়র সহকারী জজ সুব্রত মল্লিকের আদালতে। তিনি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ভোটার তালিকার ওপর স্থিতিবস্থা দেন। এখানেই প্রশ্ন উঠেছে সেই আদেশে পিরোজপুরের সিনিয়র সহকারী জজ (সুব্রত মল্লিক) কীভাবে উল্লেখ করলেন যে, বিবাদী উপস্থিত ছিলেন। তাছাড়া আদালতে উপস্থিত থাকার জন্য নির্বাচন কমিশন থেকেও কোনো অনুমতি নেই। সহকারী জজ আদালতের এক্তিয়ার নিয়ে নির্বাচন কমিশন থেকে জেলা জজ ও সহকারী জজের সঙ্গে কথা বলে আইনি বিধানগুলো উল্লেখ করেন। যদিও পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশন পিরোজপুরের সহকারী জজ আদালতের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করেন। এখনো সেই সহকারী জজ মামলার আদেশ দেননি। আগামী ১২ জুন আদেশ দেবেন বলে জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার খায়রুল আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর কোনোভাবেই নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা ঠিক নয়। এমনকি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্তর উদ্দেশ্যে যেসব মামলা করা হয় সেগুলোতেই আদালতের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তিনি বলেন, ভোটার তালিকা নিয়ে যারা মামলা করেন তারা কেন এতদিন ঘুমিয়ে ছিলেন? নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর নির্বাচন বন্ধে কেন তারা তত্পর হলেন। এতেই বোঝা যায়, এ ধরনের মামলা করার পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তাই এ ধরনের মামলায় আদালতের হস্তক্ষেপ করা ঠিক নয়। নিম্ন আদালতে নির্বাচনি মামলা করার কোনো সুযোগ নেই।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অবসরপ্রাপ্ত একজন জেলা জজ ইত্তেফাককে বলেন, ভোটার তালিকা বা ওয়ার্ড কোন ইউনিয়ন বা পৌরসভার সঙ্গে থাকবে সেটা সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। এটা নিয়ে কোনো নাগরিক বা ভোটারের সংক্ষুব্ধ হওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের মামলা সহকারী জজ আদালতের গ্রহণ করা ঠিক হয়নি। এছাড়া আদেশ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পৌর নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে একটি মহল সবসময়ই সচেষ্ট। ঠুনকো অজুহাত তুলে নির্বাচনের ঘোষিত তপশিল চ্যালেঞ্জ করে তারা নানা ধরনের মামলা করে থাকেন। এসব মামলা দায়েরের পেছনে একটাই উদ্দেশ্য থাকে, যাতে নির্বাচন কমিশন তপশিল অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজন করতে না পারে। আর এসব মামলায় যদি বাদী পক্ষ আদালত থেকে কোনো ধরনের স্থগিতাদেশ পেয়ে যান তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠান আর করা সম্ভব হয় না কমিশনের পক্ষে। ফলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে সেখানে অনির্বাচিত লোক কর্তৃত্ব পান।

আইনে সুরক্ষা আছে ইসির : স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) নির্বাচন বিধিমালা, ২০১০ এতে স্পষ্ট বলা আছে, নির্বাচন কমিশনের গৃহীত কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা রুজু করা যাবে না।  বিধিমালা ৯৩-তে সরল বিশ্বাসে কৃত কাজকর্ম রক্ষণ সংক্রান্ত উপধারা (১) এ বলা আছে, ‘ কমিশন বা কোন রিটার্নিং অফিসার বা প্রিজাইডিং অফিসার বা পোলিং অফিসার কর্তৃক বা তদকর্তৃত্বাধীনে সরল বিশ্বাসে কৃতকর্ম, গৃহীত কোন ব্যবস্থা, অথবা প্রদত্ত কোন সিদ্ধান্তের বৈধতার বিষয়ে কোন আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাইবে না।’ উপধারা (২)এতে বলা আছে, ‘সরকার, কমিশন বা উহার কোন কর্মকর্তা বা অন্য কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরল বিশ্বাসে কৃত কোন কার্যের জন্য কোন দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা রুজু বা অন্য কোন আইনগত কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।’

ভোটার তালিকা নিয়েও চ্যালেঞ্জ নয় : ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯ (২০০৯ সানের ৬নং আইন) এ আদালতের এক্তিয়ারের বিষয়ে ১৭ নং ধারায় বলা আছে, ‘কোন আদালত এই আইনের অধীন প্রণীত ভোটার তালিকার বৈধতা বা তদধীন কমিশন বা রেজিস্ট্র্রেশন অফিসার কর্তৃক বা তাহাদের কর্তৃত্বাধীনে গৃহীত কোন কার্যধারা বা ব্যবস্থার বৈধতা বা যথার্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন করিতে পারিবে না।’ ভোটার তালিকার বৈধতার বিষয়ে আইনের ১৪ ধারায় উল্লেখ আছে, ‘ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কোন ব্যক্তির ভুল বর্ণনা বা উক্তরুপে অন্তর্ভুক্ত হইবার অধিকারী নহে এমন কোন ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্তির কারণে কোন ভোটার তালিকা অবৈধ হইবে না।’

সংবিধানে যা আছে : সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৫ এর (গ) উপ-ধারায় বলা আছে, ‘কোন আদালত, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা ইইয়াছে এইরুপ কোন নির্বাচনের বিষয়ে, নির্বাচন কমিশনকে যুক্তিসংগত নোটিশ ও শুনানির সুযোগ প্রদান না করিয়া, অন্তর্বর্তী বা অন্য কোনরুপ কোন আদেশ বা নির্দেশ প্রদান করিবেন না’।

সম্প্রতি একটি পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়। ঐ রিট পিটিশনে দাবি করা হয় যে, খসড়া যে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে সেখানে মৃত ভোটারের নাম রয়েছে। অতএব এই ভোটার তালিকা সংশোধন করা হোক। রিটে বিবাদী করা হয় প্রধান নির্বাচন কমিশনার, স্থানীয় সরকার সচিবসহ সাত ব্যক্তিকে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষের কৌঁসুলি তৌহিদুল ইসলাম আদালতে যুক্তি দিয়ে বলেন, নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর ভোটার তালিকা সংশোধনের সুযোগ নেই। আর যে যুক্তিতে রিট আবেদন নিয়ে আসা হয়েছে তাতে তপশিলের ওপর কোনো স্থগিতাদেশ পেতে পারেন না রিটকারী। তবে রিটকারী পক্ষের কৌঁসুলি দাঁড়ালে হাইকোর্ট বলেন, ‘আপনাদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা। নির্বাচন যাতে বাধাগ্রস্ত হয় সে ধরনের কোনো আদেশ দেওয়া হবে না।’

সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট এম কে রহমান ইত্তেফাককে বলেন, ‘একজন মামলা করতেই পারেন। কিন্তু সেই মামলা কতটা গ্রহণযোগ্য সেটা শুনানিতেই নির্ধারিত হয়ে থাকে। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা হলে তাকে বাধাগ্রস্ত করতে নানা চেষ্টা থাকে আদালতে মামলা করে। কারণ আমাদের সামনে উদাহরণ রয়েছে এ ধরনের রিট মামলা করে ১০/১৫ বছর অনেক স্থানীয় সরকারের নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখা হয়েছিল। এ ধরনের মামলা করার পেছনে মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে সরকারি সুযোগসুবিধা ভোগ করার।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, রিট মামলা করে নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখতে আগে অনেক মামলা হতো। কিন্তু এখন উচ্চ আদালতে এ ধরনের মামলা করলেও তাতে রিটকারীরা খুব একটা সফলকাম হন না। কারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে যাতে কেউ সুবিধাভোগী না হয় সেদিকে উচ্চ আদালতকে কঠোর ভূমিকা দেখতে পাওয়া যায়। ঢাকা ল’রিপোর্টস-এর সম্পাদক ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘সহকারী জজ আদালতে সীমানা নির্ধারণ বা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে কোনো ধরনের মামলা করার সুযোগ নেই। যদিও এ ধরনের মামলা হচ্ছে এবং অনেক বিচারক আদেশ দিচ্ছেন। আমি মনে করি এ ধরনের মামলা গ্রহণ করে আদালতের আদেশ প্রদান বেআইনি। ’

 

ইত্তেফাক/ইআ