দীর্ঘ প্রচার-প্রচারণা শেষে আজ সোমবার বহুল প্রতীক্ষিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আজ ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নির্ধারণ করবেন কে হবেন পরবর্তী ৫ বছরের জন্য নগরপিতা। খুলনায় মেয়র পদে জয়ের সমীকরণে তালুকদার আব্দুল খালেক অনেক এগিয়ে। দ্বিতীয় স্থান নিয়ে ভোটের লড়াই হতে পারে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থীর সঙ্গে জাপার মেয়র প্রার্থীর। এদিকে নির্বাচন অবাধ, সু্ষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে করতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে ।
কেসিসির রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, কেসিসি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও ভয়হীন করতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তিনি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে এসে তাদের অধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানান। তিনি আরো বলেন, গতকাল বেলা ১১টায় কেন্দ্রে কেন্দ্রে ইভিএমসহ নির্বাচনি সরঞ্জাম পাঠানো হয়েছে। নির্বাচনে পুলিশ, র্যাব আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় সাড়ে ৮ হাজার সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। সব মিলিয়ে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এবার কেসিসি নির্বাচনে পাঁচ জন মেয়র প্রার্থী, ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ১৩৬ জন কাউন্সিলর প্রার্থী ও সংরক্ষিত ১০টি ওয়ার্ডে ৩৯ জন নারী কাউন্সিলর প্রার্থীসহ মোট ১৮০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে, কাউন্সিলর পদে সাধারণ ওয়ার্ডের দুজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
কেসিসির মেয়র প্রার্থীরা হলেন—আওয়ামী লীগের তালুকদার আব্দুল খালেক (নৌকা), জাতীয় পার্টির (জাপা) শফিকুল ইসলাম মধু (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল আউয়াল (হাতপাখা), জাকের পার্টির এস এম সাব্বির হোসেন (গোলাপ ফুল) ও স্বতন্ত্রপ্রার্থী এস এম শফিকুর রহমান (টেবিল ঘড়ি) প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন।
কেসিসির গত পাঁচটি নির্বাচনের তিনটিতেই জয়ী হয় বিএনপি। তবে এবার তারা নির্বাচন বর্জন করায় মেয়র পদের নির্বাচন ভোটারদের কাছে অনেকটাই আকর্ষণ হারায়। নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণাতেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল কম। ফলে মেয়র পদে জয়ের সমীকরণে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সদ্য সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক। তবে বিএনপির অনুপস্থিতিতে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী মাওলানা আব্দুল আউয়াল বিএনপি-জামায়াতের ভোট ব্যাংকে টার্গেট করে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছেন। তারা মনে করছেন, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে ঐ ভোট পেয়ে তাদেরও জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নগরবাসীর ধারণা আওয়ামী লীগ প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক মেয়র পদে বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও মূলত দ্বিতীয় স্থান নিয়ে ভোটের লড়াই হবে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধুর সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী মাওলানা আব্দুল আউয়ালের। সেক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থীর চেয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে কেসিসির মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৩৫ হাজার ৫২৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩৩ জন ও নারী ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৬ হাজার ৬৯৬ জন। ভোটাররা ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রের ১ হাজার ৭৩২টি কক্ষে ইভিএমে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
কেসিসি নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে খুলনা মহানগরীতে ১১ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। গত শনিবার সকাল থেকে বিজিবি সদস্যরা ভোটকেন্দ্রসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টহল দিচ্ছে। পাশাপাশি ৪ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩ হাজার ৮৪৮ জন আনসার সদস্য ও র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় সাড়ে ৮ হাজার সদস্যের সমন্বয়ে নিরাপত্তার চাদরে মুড়িয়ে ফেলা হয়েছে পুরো খুলনা মহানগরীকে।
- ভোটকেন্দ্রে যেতে ভোটারদের প্রতি খালেকের আহ্বান
আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, খুলনায় গাজীপুর সিটির চেয়ে সুষ্ঠু, অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত ভোট হবে। ভোটের হার ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ হতে পারে। তিনি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অপরদিকে নিজ দলের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্থানে বাধার অভিযোগ করেছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধু। তিনি ভোটের পরিবেশে সন্তোষ প্রকাশ করলেও সুষ্ঠু ও প্রভাবমুক্ত ভোট নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, জীবনের শেষ সময় খুলনার উন্নয়নে মানুষের পাশে থাকতে চাই। বিগত সময়ে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা ও পরিবেশবান্ধব নগর গড়তে চাই।
- ১৬১টি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ
কেসিসির ২৮৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১২৮টি কেন্দ্রকে সাধারণ ও ১৬১ কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করেছে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি)। সাধারণ কেন্দ্রের তুলনায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় সাড়ে ৮ হাজার পুলিশ ও আনসার সদস্য। দায়িত্ব পালন করছেন ৩১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। এছাড়া ১০ জন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতি তিনটি ওয়ার্ড মিলে একজন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। কেসিসি নির্বাচন উপলক্ষ্যে আজ সোমবার খুলনা মহানগরী এলাকায় ছুটি ঘোষণা করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
- বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কাউন্সিলর নির্বাচিত আওয়ামী লীগের দুই নেতা
কেসিসি নির্বাচনে দুই জন আওয়ামী লীগ নেতা কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তারা হলেন, নগরীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে এস এম খুরশিদ আহম্মেদ টোনা ও ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে জেড এ মাহমুদ ডন।
- বৈধ অস্ত্র বহন, প্রদর্শন ও চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা
নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে কেসিসি এলাকার মধ্যে ১০ জুন থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত বৈধ অস্ত্র বহন, প্রদর্শন ও চলাফেরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া মোটরসাইকেল ও যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। শনিবার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) কমিশনার মাসুদুর রহমান ভূঞা স্বাক্ষরিত পৃথক তিনটি গণবিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
