বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস

কেরাণীগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ১১ হাজার শিশু

আপডেট : ১২ জুন ২০২৩, ১৩:৩০

সোহাগের বয়স ১১ বছর। মাদারিপুর নয়াকান্দি থেকে তার মামার সঙ্গে এসে কেরাণীগঞ্জ তানাকা টাওয়ারে একটি পোশাক কারখানায় সহকারীর কাজ করে। এক বছর আগে সে কাজ শুরু হয়। সুতা কাটা, কাপড়ের বোঝা বহন (সিঁড়ি ভেঙে ৬ তলার উপর থেকে নিচে নামানো), মেশিন চালাতে সহযোগিতা করে সে। কাপড় কাটা আর সেলাইও শিখছে। নিউ রিফাত গার্মেন্টসের এক জন সেলাই কর্মী ১৩ বছরের ইয়াসিন। বৈদ্যুতিক সেলাই মেশিন দিয়ে সে নিয়মিত কাপড় সেলাই করে। মাঝে মধ্যে হাতে সুইয়ের গুতা লেগে রক্ত ঝরে। শুরুর দিকে বেশি এমন হলেও এখন একটু কমে আসছে বলে জানায়। এখন তার বেশি হচ্ছে সর্দি-কাশি। কারখানায় কাপড়, ধূলাবালির স্তূপ আর অসহ্য গরমে ঘেমেই তার বেশি ঠান্ডা লাগে বলে জানায় ইয়াসিন।

কেরাণীগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে আলো-বাতাস প্রবেশহীন কারখানাগুলোতে নানা রকম স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে ১১ হাজারের অধিক শিশু। ৮/১০ বছর থেকে ১৪ বছর বয়সের মধ্যে শিশুর সংখ্যাই বেশি বলে জানান-সংশ্লিষ্টরা। এমন অবস্থায় 'জাস্টিস ফর অল, ইন্ড চাইল্ড লেবার' প্রতিপাদ্য করে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস।

২০২৫ সালে মধ্যে সব প্রকার ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম বন্ধের লক্ষ্য নির্ধরণ করেছে সরকার। সেই অনুযায়ী এই অঞ্চলের শিশুশ্রম নিরসনের ২০২২ ও ২০২৩ দুই বছরের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। চলতি বছর ডিসেম্বরে এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে- সমস্যা সমাধানে তেমন অগ্রগতি নেই। ছয় মাস বাকি থাকলেও কেরাণীগঞ্জে শিশুশ্রম নিরসনের কোন লক্ষণ নেই।

কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিচালক এ কে এম সালাউদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। তবে ডিসেম্বরের মধ্যে শিশুশ্রম বন্ধ হবে না। আমরা মটিভেশনের কাজ করছি। একদিকে বন্ধ হলে আবার তারা অন্যদিকে শিশুদের নিযুক্ত করে। গত ছয়মাসে মালিকদের বিরুদ্ধে ৪০টির মত মামলা হয়েছে। তিনি বলেন, এখানে শিশুশ্রম নিরসন করতে হলে শিশুদের স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। তাদের পড়াশুনার ব্যবস্থা করাসহ তাদের বাবা-মায়ের আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। আমরা এমন প্রস্তাব উপরের মহলে দিয়েছি।

প্রায় বিনা পারিশ্রমিকে কত শত শিশুশ্রম

মো. মেরাজ। বয়স ১৩ বছর। বাবা মারা গেলে ৫ম শ্রেণীতে পড়া ছেড়ে বরিশাল থেকে ঢাকায় আসে। প্রথমে সাগরেতের কাজ করতো। তখন তাকে শুধু খাওয়া আর রাতে থাকার সুবিধা দেওয়া হতো। সপ্তাহে শুক্রবারে তাকে ১০০ টাকা দেওয়া হতো। দুই বছরের মধ্যে সে কাপড় কাটা, সেলাই শিখে একজন কর্মী হয়ে ওঠে। কর্মী হিসেবে সে প্রতিটি কাপাড় সেলাই বা কাটা অনুসারে ৩ টাকা করে আয় করছে। সপ্তাহে এই শ্রমিকদের কারো তিন হাজার কারো ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হয়। তবে পুরো টাকা তারা পায় না। অর্ধেক টাকা তাদের দেওয়া হয়। অর্ধেক টাকা রোজার ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় হাতে পায়। মাদারীপুর বহুমুখী বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণীর ছাত্র ১৭ বছরের ইয়াসিন। এক বছর আগে সে চলে আসে। বাবা মারা যাওয়ার পর তাকে কাজে আসতে হয়। ফ্যান থাকলেও প্রচন্ড গরমে কোনো কাজে আসে না। কারখানার শ্রমিকদের শরীর থেকে ঘাম ঝরতে থাকে সব সময়। কাজ শেষ হলে একপাশে কাপদ রেখে এখানেই ঘুমিয়ে পড়ে তারা। গোসলখানা আর টয়লেট এতটাই নোংরা যে সেখানে নাকে কাপড় না দিয়ে এক মিনিটও দাঁড়ানো সম্ভব না। প্রতি তলায় টয়লেট আছে তবে দিনেও অন্ধকার। মনির নামে এক শিশু শ্রমিক জানায়, ভাজ করা প্যাকেট করা সবই করে তার মত শিশুরা। তার মুজরি সপ্তাহে এক হাজার টাকা। তার বাবা একজনকে বিয়ে করে চলে যায়, মা অন্যত্র থাকে। তাই তার কাউকে টাকা পাঠাতে হয় না। এক হাজার টাকার ৭০০ টাকা সে ভাত ওয়ালিকে দেয়, ৩শ টাকা তার কাছে থাকে।

নানা রকম স্বাস্থ্য ঝুঁকি

এখানে শ্রমিকদের তিনটি সংঘঠন সক্রিয়। তার একটি গার্মেন্টস শ্রমিক কল্যাণ ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক বেল্লাল জানান, ছোট বেলা থেকে সে এখানে কাজ করছেন। কোমরে ব্যথা, সর্দি-কাশি, চুলকানি এখানকার শ্রমিকদের লেগেই থাকে। অনেকের হার্টেও সমস্যা হয়। ছোট বয়সে সে যখন কাজ করতে শুরু করে তখন তার হাতে কয়েক দফা সুঁই ফুটে। সে তার আঙ্গুলটি দেখিয়ে বলে আমার মতো এমন সুয়ের খোঁচা সব শিশু শ্রমেকেরই আছে।

ছেলেরা নেশাগ্রস্ত, মেয়েরা যৌন হয়রানির শিকার

মাদারিপুর শিবচর থেকে কাজ করতে আসে মীম (ছদ্মনাম) নামে এক কিশোরী। মীম দেখতে শুনতে বেশ ভালো। যখন সে প্রথম কাজ শুরু করে তখন মালিক সুপারভাইজার সবাই ঠাট্টা করে অন্যদের সাথে মিমকে নিজের স্ত্রী বলে পরিচয় করিয়ে দিত। এখানেই একজনের সাথে মিমের প্রেমের সম্পর্ক হয়। একসময় মীম গর্ভবতী হয়। কিন্তু মহাজন আজাহার মিমকে বিয়ে করতে চায় না। তিনটি শ্রমিক সংগঠন মিলে নানা আন্দোলন করে মিমকে আজাহারের সাথে বিয়ে দেয়। সংসার টেকে না বেশি দিন। বাচ্চাসহ মীমের আবার বিয়ে হয়।

এখানে কাজ করা একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী আসমা খাতুন (ছদ্ম নাম) জানান, ১১ বছর বয়সে সে এখানে আসে। তাকে মহাজন একটি থ্রিপিস কিনে দেয়। আবার বাইরেও বেড়াতে নিয়ে যায়। একজন দরিদ্র মেয়ে কাজের প্রয়োজন। তার পক্ষে এসব উপেক্ষা করা সম্ভব না।

২০২০ সালের সেপ্টম্বরে শিল্পাঞ্চলের মেয়েদের নিয়ে বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের গবেষণায় অংশ নেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞ মঞ্জুন নাহার। তিনি বলেন, এখানে খারাপ গালাগালি মেয়েদের বুকে, পিঠে হাত দেওয়া খুব সাধারণ বিষয়। মেয়েরা এতে কিছু মনে করেন। তাদের ভাষায় ছেলেরা এগুলো করেই। মেয়েদের মাসিককালীন তারা সবচেয়ে বেশি লাঞ্ছনার শিকার হয়। তারা সময় মতো টয়লেটে যেতে পারে না। কাপড়ে দাগ লেগে গেলে বকাঝকা শুনতে হয়। মেয়েদের একাধিক বিয়ের বিষয় বলেন, বাল্য বিয়ে কমন বিষয়। টাকাটা স্বামী নিয়ে নেয়। কিন্তু স্ত্রীকে সম্মান করে না। গামের্ন্টসের মেয়েরা খারাপ এমন কথা শুনতে হয়। বেলাল বলেন ১১-১২ বছরের ছেলেদের হাতে যখন টাকা আসতে শুরু করে, পাশপাশি কাজের ক্লান্তি, বিশ্রাম নেই তখন তারা নেশাগ্রস্থ হয়। এখানে ছেরেরা গাজা হরহামেসাই সেবন করে। হিরোইন, ইয়াবা সবার সামনে বিক্রি হয়।

গবেষোণা যা বলে

২০২২ সালে ৫ হাজার কারখানা ৩১৪টি টাওয়ারে করা বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় দেখা যায়- এখানে ১০ হাজার ২৫৬ জন ১৪ বছরের নিচে শিশু কাজ করে। এর মধ্যে ৯ হাজার ২২১ জন ছেলে ও এক হাজার ৩৫ জন মেয়ে। আগানগর ও শুবাড্ডা ২টি ইউনিয়নে কারকানাগুলো। ৫ থেকে ৮/১০ তলা ভবনে কখনো এক রুম নিয়েও করখানা চলে। বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এ কে এম আশরাফ উদ্দিন বলেন, কোনরকম বেতন কাঠামো ও কর্ম ঘন্টা ও ছুটি ছাড়া তারা কাজ করে। এই এলাকার শিশুশ্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্তি করা হয়। কাজ করলে মজুরি না করলে নাই। এভাবে তারা কাজ শুরু করে। দুই বছর পর কর্মী হিসেবে উপযুক্ত হয়। গবেষণায় দেখা যায়- বৈদ্যুতিক যন্ত্রে দুর্ঘটনায় শিকার হওয়াসহ কোমড়ে ব্যথা সর্দি কাশি ও চর্মরোগ ও ফুসফুসে প্রদাহ জনিত সমস্যায় ভোগে তারা।

ইত্তেফাক/ইআ