নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে অপরাধের উৎস যাইতে হইবে

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৩, ০৯:২৫

হাইকোর্টের আগাম জামিনের পরেও আসামি গ্রেফতার, নির্যাতন ও কারাগারে পাঠানোসংক্রান্ত একটি খবর গতকাল ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হইয়াছে। ‘শরীয়তপুরের বিচারক ও দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে তলব’ শিরোনামের এই সংবাদটি আমাদের বিস্মিত ও ব্যথিত করিয়াছে। তাহার কারণ হইল, রক্ষক যদি ভক্ষক হয় তাহা হইলে মানুষ যাইবে কোথায়? সংবাদে বলা হইয়াছে, ২১ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের মামলায় সাত আসামিকে ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়াছিল হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের দেওয়া সেই আদেশের তোয়াক্কা না করিয়া পরদিনই আগাম জামিন পাওয়া দুই আসামিকে গ্রেফতার এবং তাহাদের এক স্বজনের নিকট ৭২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করিয়া পাঁচটি চেক লইয়াছেন পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানার ওসি এবং একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। পরে গ্রেফতারকৃত আসামিদের হাজির করা হয় আদালতে। কিন্তু শরীয়তপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আগাম জামিনের বিষয়টি আমলে না লইয়া আসামিদের কারাগারে পাঠান। হাইকোর্টের আদেশ লঙ্ঘনের এহেন ঘটনা সত্যিই বিস্ময়াহত করিবে যে কোনো সচেতন মানুষকে। এই ঘটনায় শরীয়তপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে আগামী ১৬ জুলাই সশরীরে আদালতে হাজির হইয়া তাহাদের এহেন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হইয়াছে। এই সংক্রান্ত আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলামের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত মঙ্গলবার এই আদেশ দিয়াছেন। এই ঘটনায় জড়িত পুলিশের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হইয়াছে—তাহার ব্যাখ্যা দিতেও পুলিশের আইজি ও শরীয়তপুরের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়াছে হাইকোর্ট। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সারওয়ার হোসেন বাপ্পী বলিয়াছেন, একজন ওসিকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হইয়াছে। আদালত তাহা শুনিয়া বলিয়াছে যে, ইহা তো ওসির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নহে, যেন প্রমোশন।

সুতরাং উপরিউক্ত ঘটনাটি একটি নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত লজ্জার। উচ্চ আদালত এই ব্যাপারে তীক্ষ্ন নজর রাখিয়াছে বলিয়াছে বিপুল অঙ্কের উৎকোচ দাবিতে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা ধরা পড়িয়াছেন। কিন্তু প্রশ্ন হইল, একজন পুলিশ কর্মকর্তা কোন সাহসে এবং কোন মানসিকতায় এহেন চাঁদাবাজি করিবার দুঃসাহস দেখাইতে পারেন? সমস্যা হইল, আমাদের সমাজে দুর্নীতিবাজ অপরাধী কিংবা চোরের ভাবমূর্তি খুব বেশি কদর্য নহে। চোরের হাতে টাকা ও ক্ষমতা থাকিলে তাহার প্রতাপ ও প্রভাব বাড়ে। এই কারণে আমাদের সমাজে যাহারা সত্, বলা হইয়া থাকে, তাহারা সুযোগের অভাবে সৎ। অর্থাৎ চুরি করিবার সুযোগ পায় নাই বলিয়া সাধুগিরি দেখাইতেছে। কী ভয়াবহ আমাদের এই সমাজের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি! কিন্তু কেন এমন হইল? এখন একটি শিশু বাংলাদেশে জন্মাইবার পরই ঘরে-বাহিরে দেখিতে পায় চুরি আর দুর্নীতির শত শত ঘটনা। যেই শিশু বা কিশোর দেখিতেছে যে তাহার পিতা অনিয়ম-দুর্নীতি করিয়া অর্থের পাহাড় তৈরি করিতেছে, তাহার মধ্যে কী করিয়া নীতিবোধ তৈরি হইবে? অথচ আমাদের আদর্শলিপি কিংবা ধর্মগ্রন্থসমূহে সত্ পথে চলিবার এবং চুরি না করিবার অসংখ্য নীতিবাক্য রহিয়াছে। কোনো ব্যক্তি যদি হারাম কোনো বস্তুকে হারাম মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তবে তাহার কবিরা গুনাহ হইবে। আবার যদি হারাম বস্তুকে হালাল মনে করিয়া গ্রহণ করেন, তবে পরিণতি হইবে আরো ভয়াবহ। আখিরাতে সরাসরি জাহান্নাম।

অনেকেই মনে করেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে এই ধরনের অপরাধ করিবার উদাহরণ হিমশৈলের চূড়া মাত্র, গভীরে রহিয়াছে আরো অনেক। চোর ধর্মের কাহিনি না-ই শুনিতে পারে, তাহার হারাইবার কিছু নাই, কিন্তু পুলিশ কেন এত ভয়ানক অধর্মের বা অনিয়মের কাজ করিবে? কোথা হইতে এই পুলিশ কর্মকর্তা এত বড় দুঃসাহস অর্জন করিয়াছেন? একটি নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সেই উেস যাইতে হইবে, যাহাতে রক্ষক কখনো ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইতে না পারে। আমাদের এই ক্ষেত্রে সৎ ও সত্যনিষ্ঠ হইতেই হইবে। মহান দার্শনিক সক্রেটিস বলিয়া গিয়াছেন—‘সত্যপ্রীতি বিজ্ঞতার লক্ষণ’। যাহারা এই বিজ্ঞতা অর্জনের পরিবর্তে সাময়িক লাভের জন্য লোভ-অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হন, তাহারা নিঃসন্দেহে নির্বোধের স্বর্গে বাস করেন।

 

 

 

ইত্তেফাক/ইআ