গত ২০১৩ সালে মতিঝিলে বহুল আলোচিত পুলিশ কনস্টেবল বাদল মিয়া হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামি রিপন নাথ ঘোষকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। বৃহস্পতিবার টাঙ্গাইলের মির্জাপুর এলাকা থেকে রিপন নাথ ঘোষকে গ্রেফতার করে র্যাব-১০ এর একটি দল। এসময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় মাদকসহ বিভিন্ন নামে নিবন্ধনকৃত ৯টি মোবাইল সিম।
গতকাল শুক্রবার কাওরান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের লিগ্যাল আ্যন্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকা থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্নসহ অজ্ঞাত এক যুবককে উদ্ধার করে। পরবর্তীকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরবর্তীকালে জানা যায়, মৃত ব্যক্তি বাংলাদেশ পুলিশের একজন সদস্য এবং তার নাম কনস্টেবল বাদল মিয়া।
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় হত্যা মামলা করে। এ মামলার তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ৫ এপ্রিল গ্রেফতার করা রিপনকে প্রধান অভিযুক্ত করে মোট পাঁচ জনের বিরুদ্ধে তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বিচারিক কার্যক্রম শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত পুলিশ কনস্টেবল বাদল মিয়াকে হত্যার অভিযোগে রিপন নাথ ঘোষসহ মোট পাঁচ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ প্রদান করেন।
রিপনকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ২০১২ সালের ৯ নভেম্বর মতিঝিলের এজিবি কলোনি এলাকায় একটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় রিপনের অন্যতম সহযোগী তার খালাতো ভাই গোপাল চন্দ্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে গ্রেফতার হয়। এর কিছুদিন পর একটি মাদকবিরোধী অভিযানে রিপন নাথ ও তার একজন সহযোগী মাদকসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হাতে গ্রেফতার হয়, যেখানে কনস্টেবল বাদল অভিযানিক দলের সদস্য ছিলেন। দুই মাস কারাভোগ করে জামিনে বের হয়ে আসে রিপন। পরবর্তীকালে তারা জানতে পারে, মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া কনস্টেবল বাদল মতিঝিল এলাকায় বসবাস করছেন। বিভিন্ন সময়ে গ্রেফতারের পেছনে পুলিশ সদস্য বাদলের হাত রয়েছে বলে আসামিরা সন্দেহ করে। নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা পরিচালনার জন্য রিপন তার সহযোগীদের নিয়ে কনস্টেবল বাদলকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
রিপন বিভিন্ন সময়ে রেন্ট-এ-কারের প্রাইভেটকার চালানোর সুবাদে তার বিভিন্ন রেন্ট-এ-কারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কনস্টেবল বাদলকে হত্যার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে রিপন ২০১৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে রেন্ট-এ-কার থেকে একটি প্রাইভেটকার ভাড়া নিয়ে নিজে গাড়ি চালিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া অন্য সদস্যদের নিয়ে কনস্টেবল বাদলের কর্মস্থল শাহবাগ গোলচত্বর এলাকায় যায়।
রিপনের সহযোগী বিশ্বজিৎ ও কনস্টেবল বাদল একই এলাকায় বসবাস করায় ও পূর্ব পরিচিত হওয়ায় কনস্টেবল বাদলকে কৌশলে ডেকে আনার জন্য বিশ্বজিৎকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী বিশ্বজিৎ কনস্টেবল বাদলকে ডেকে এনে কৌশলে প্রাইভেটকারে উঠায়। তারা কনস্টেবল বাদলকে নিয়ে প্রাইভেটকারে করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরতে থাকে এবং তার উপর শারীরিক নির্যাতন চালায়।
র্যাবের মুখপাত্র বলেন, একপর্যায়ে তারা রাজধানীর মতিঝিল কালভার্ট সংলগ্ন নির্জন এলাকায় এসে রিপন নাথ ও তার অন্যান্য সহযোগীরা গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে কনস্টেবল বাদলকে হত্যা করে। পরবর্তীকালে গুম করার উদ্দেশ্যে রাজধানীর মতিঝিল টিঅ্যান্ডটি কলোনি এলাকায় প্রাইভেটকার থেকে কনস্টেবল বাদলের লাশ ফেলে দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে তারা পালিয়ে যায়। রিপন মতিঝিল এলাকার চিহ্নিত মাদক কারবারি এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ছিল। সে কনস্টেবল বাদল হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলে এ মামলার বিচারকার্য চলমান থাকা অবস্থায় জামিনে বের হয়ে টাঙ্গাইলে আত্মগোপনে চলে যায়। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় সে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার এড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করত এবং কিছুদিন পর পর বাসা পরিবর্তন করত।
আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় সে দিনের বেলা টাঙ্গাইল-রংপুর রুটে বিভিন্ন বাসে হেলপারের কাজ করত। এছাড়া সে ঐ এলাকায় বাসের হেলপারির আড়ালে রাতের বেলা মাদক কারবার চালাতে থাকে।
