বেড়েই চলছে প্লাস্টিক দূষণ। যা মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ বাড়াচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের জলাভূমি, কৃষিভূমিসহ সাগরের সম্পদ হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় প্লাস্টিক পণ্যের জনপ্রিয়তাও বেশি। শুধু খাবারের প্যাকেট বা পানির বোতলই নয়, বর্তমানে আধুনিক জীবনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে প্লাস্টিকের একবার ব্যবহৃত পণ্যসামগ্রী। যেমন—প্লেট, গ্লাস, চামচ, চায়ের কাপ। এছাড়া টুথব্রাশ, টেবিল-চেয়ারসহ বিবিধ পণ্যসামগ্রী তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিক দিয়ে। আর প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়লেও এটি রিসাইকেল ও রি-ইউজের পরিমাণ না বাড়ায় এসব প্লাস্টিকের অধিকাংশই সরাসরি চলে যাচ্ছে পরিবেশে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত ৫০ বছরে পুরো বিশ্বে মাথাপিছু এক টনের বেশি প্লাস্টিকের বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হয়েছে। যার ৯০ শতাংশের বেশি পৃথিবীর পরিবেশকে নানাভাবে বিপন্ন করে তুলেছে। এসব ক্ষতিকর পচনরোধী বর্জ্য পরিবেশে ৪০০ থেকে ১ হাজার বছর পর্যন্ত থাকতে পারে এবং তা মাইক্রো, ন্যানো প্লাস্টিকের কণাসহ নানা ক্ষতিকর পদার্থ নিঃসারণ করে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যে ভয়ংকর ক্ষতিকর প্রভাব ডেকে আনছে। তারা বলছেন, প্লাস্টিক-পলিথিন একটি অপচনশীল পদার্থ। দীর্ঘদিন প্রকৃতিতে অবিকৃত অবস্থায় থেকে মাটিতে সূর্যের আলো, পানি এবং অন্যান্য উপাদান প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে, মাটির উর্বরতা শক্তি হ্রাস করে, উপকারী ব্যাকটেরিয়া বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে। গবেষণায় দেখা যায়, পরিত্যক্ত পলিথিন ব্যাগ জলাশয়ের অতিরিক্ত দূষণকারী কীটনাশক ও শিল্পবর্জ্য শোষণ করে এবং তা জলাশয়ের প্রাণে বড় মাত্রায় ছড়িয়ে দেয়। তখন ক্ষতিকর পদার্থ খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে। পলিথিন প্রজনন সিস্টেম ব্যাহত করে, বন্ধ্যত্ব, ক্যানসারের সৃষ্টি করে। পলিথিনে মোড়ানো গরম খাবার গ্রহণ করলে ক্যানসার ও চর্মরোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে। ওভেনপ্রুফ প্লাস্টিক কনটেইনারে খাবার গরম করলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে খাবারে ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, সিসা মিশে যায়। ফলে মারাত্মক রোগের সংক্রমণ ঘটতে পারে। পলিথিন থেকে সৃষ্ট ব্যাকটেরিয়া ত্বকের বিভিন্ন রোগের জন্ম দেয়। এ ব্যাকটেরিয়া থেকে ডায়রিয়া ও আমাশয় ছড়াতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে—ঢাকা শহরে একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে পাঁচটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসেবে শুধু ঢাকা শহরে প্রতিদিন আড়াই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। এগুলো দ্বারা ড্রেন, নালা-নর্দমা, খাল, ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়াও দেশে প্রতিদিন ৩৫ লাখের বেশি টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। এসব ব্যাগ পলিথিনের হলেও কাপড়ের ব্যাগ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন—পবার সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ব্যাপকহারে ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর নিষিদ্ধ পলিথিন ও প্লাস্টিক। অন্যদিকে কাপড়ের মতো দেখতে এক ধরনের রঙিন পলিথিন টিস্যু (যা চায়না টিস্যু নামে পরিচিত) ব্যাগে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। পরিবেশবান্ধব পাটজাত দ্রব্য, কাগজের ব্যাগ ও ঠোঙা, কাপড়ের ব্যাগ ইত্যাদি বিকল্প থাকা সত্ত্বেও আইন অমান্য করে নিষিদ্ধ পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, মজুত, পরিবহন, বিপণন, বাজারজাত ও ব্যবহার করা হচ্ছে।
মো. আবদুস সোবহান বলেন, রাজধানীসহ সারা দেশে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরির প্রায় ১ হাজার ২০০ কারখানা রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। পুরান ঢাকার অলিগলিতে রয়েছে প্রায় ৩০০ কারখানা। কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, কাওরান বাজার, তেজগাঁও, টঙ্গীতে ছোট-বড় বেশকিছু কারখানা রয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শতাধিক কারখানা। ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রামসহ জেলা শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে শত শত পলিথিন কারখানা। ‘জরুরি রপ্তানি কাজে নিয়োজিত’ লেখা যানবাহনে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন।
আইনে যা আছে :বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (২০০২ সালের ৯ নম্বর আইন দ্বারা সংশোধিত) এর ৬ক ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার সব বা যে কোনো প্রকার পলিথিন শপিং ব্যাগ বা এরূপ সামগ্রীর উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুত, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে। তবু পলিথিনের ব্যবহার বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেই। ২০০২ সালে পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, ব্যবহার, বিপণন ও বাজারজাতকরণের ওপর জারিকৃত নিষেধাজ্ঞা দেশের জনগণ সানন্দে গ্রহণ করে এবং তা বাস্তবায়নের ফলে পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিষ্ক্রিয়তায় বর্তমানে আইনটি সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধের চেয়ে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ করা বেশি জরুরি। প্লাস্টিক দিয়ে চিকিৎসার যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে গৃহস্থালি নানা পণ্য তৈরি হচ্ছে যা ১০ থেকে ২০ বছর ধরে ব্যবহার করা যায়। এগুলো সমস্যা না, সমস্যা যে জিনিসগুলো আমরা ঘণ্টাখানিক ব্যবহার করে পরিবেশে ছেড়ে দিচ্ছি। এটিকে দুষ্প্রাপ্য করতে হবে। প্লাস্টিকের বিকল্প খোঁজার আগে আমাদের মনে রাখতে হবে, প্লাস্টিক নিজেই বিকল্প হিসেবে এসেছিল। কাচের জিনিসের বিকল্প হিসেবে এসেছিল প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের মতো সহজলভ্য করে পরিবেশবান্ধব কোনো জিনিস আনলে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমে যাবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে পলিথিন/প্লাস্টিক ব্যাগ এবং সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করার জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রণীত ‘মাল্টিসেক্টোরাল অ্যাকশন প্ল্যান ফর সাসটেইনেবল প্লাস্টিক ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ’-এ ২০৩০ সাল নাগাদ ৫০ শতাংশ ভার্জিন ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার হ্রাস করা, ২০২৬ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশ সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধ করা, ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য পুনঃচক্রায়ন নিশ্চিত করা, ২০৩০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন হ্রাস করার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পরিবেশবান্ধব ৩ (রিডিউস, রিইউস, রিসাইকেল) নীতি নেওয়া হয়েছে।

