আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে নতুন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের (বিএনএম) নিবন্ধন নিয়ে নানামুখী তৎপরতা শুরু হয়েছে। নিবন্ধন নিশ্চিত হলে ৩০০ সংসদীয় আসনের প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে দলটি। বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুর রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি ইতিমধ্যে পরিচ্ছন্ন প্রার্থী খোঁজা শুরু করেছে। দলটির ৩১ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির আট জনই সাবেক সেনা কর্মকর্তা। শিগগিরই দলটি ইসির নিবন্ধন পেতে যাচ্ছে বলে গুঞ্জন উঠেছে।
এ বিষয়ে বিএনএমের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, সব শর্ত মেনে আমরা নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছি। আশা করছি নিবন্ধন পাব। আমরা নতুন দল। সারা দেশে প্রার্থী খুঁজছি। যেহেতু আমি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করতাম সেহেতু বিএনপির যে কেউ চাইলে আমাদের দলে যোগদান করতে পারেন।
সাধারণত জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনীতি নিয়ে নানান ধরনের তৎপরতা দেখা যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় নির্বাচনের আগেও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফ নামের নিবন্ধিত একটি দল নিয়ে তৎপরতা চলে। একপর্যায়ে দলটির প্রধানকে ঢাকা-১৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য বানানো হয়। বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের পরিবর্তে গমের শীষ প্রতীক দাবি করেছিল দলটি। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন প্রতীক দেওয়া হয় তাদের।
নতুন দলটির নিবন্ধনের বিষয়ে ইসির একাধিক কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, বিএনএমের নিবন্ধন নিয়ে ইসিতে ব্যাপক তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়েছে। দলটির নিবন্ধন শর্তপূরণের জন্য ইসির কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করার জন্য নানামুখী চাপ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বিএনএমকে সহযোগিতার জন্য ইসি সচিবালয় থেকে মৌখিক নির্দেশনাও আছে।
দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, দলটির নিবন্ধন পাওয়ার পর বর্তমান কমিটিতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা বেশি। চেয়ারম্যান এবং মহাসচিব হিসেবে বিএনপির সাবেক দুই মন্ত্রীকে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। এছাড়া কমিটিতে বিএনপিতে কোণঠাসা ও দলছুটদের রাখা হবে। কোনো কারণে বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করলে দলটির ব্যানারে বিএনপির বড় একটি অংশকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানো হবে। তবে সবকিছুই পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরিকল্পনা করা হয়েছে। দলটির প্রাথমিক প্রতীক ধরা হয়েছে নোঙ্গর।
নতুন দলের নিবন্ধনে গণবিজ্ঞপ্তি জারির পর ৯৩টি দল আবেদন করে। চূড়ান্ত বাছাইয়ে বিএনএমসহ ১২টি দল টিকে আছে।
নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য বেশ কিছু শর্ত মানতে হয়। নিবন্ধনের শর্ত অনুযায়ী নতুন দল হিসেবে নিবন্ধিত হতে হলে একটি সক্রিয় কেন্দ্রীয় কার্যালয়, দেশের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক (২১) জেলায় কার্যকর কমিটি এবং সদস্য হিসেবে অন্তত ১০০টি উপজেলা/মহানগর থানায় প্রত্যেকটিতে কমপক্ষে ২০০ ভোটারের সমর্থন সংবলিত দলিল থাকার শর্ত পূরণ করতে হবে।
ইসি সূত্র জানা গেছে, ১২টি দলের উপরোক্ত শর্ত যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করে ইসি। জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাদের বিএনএমের ব্যাপারে শর্ত শিথিল করে ইতিবাচক প্রতিবেদনের জন্য বলা হয়। অনেক জেলায় কমিটি না থাকলেও তাৎক্ষণিক কমিটি করার ব্যাপারেও ইসির কর্মকর্তাদের কাজ করতে হয়। উপজেলায় ২০০ ভোটারের সমর্থন সংবলিত দলিল প্রস্তুত করার জন্যও ইসির কর্মকর্তাদের চাপ দেওয়া হয়।
বিএনএম আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আব্দুর রহমান বর্তমানে প্রাইম ইউনির্ভাসিটির ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান ও ডিন। তিনি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরগুনা-১ আসনের বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। সপ্তম সংসদ নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তিনি হেরে যান। ২০২১ সালে বিএনএম গঠনের আগে তিনি বেতাগী থানা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। ২০০৬ সালে বিএনপি রাজনীতি ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, আমাদের রাজনৈতিক দর্শন হলো জাতীয়তাবাদ।
৩১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিতে আট সামরিক কর্মকর্তা:বিএনএমের কমিটিতে অধিকাংশই সামরিক কর্মকর্তা ও আইনজীবী। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক হলেন মেজর জেনারেল এহতেশাম-উল হক (অব.), অবসরপ্রাপ্ত মেজর ও ব্যারিস্টার এম. সারোয়ার হোসেন, ড. ইকবাল হাসান মাহমুদ, ড. মো. শাহজাহান, ড. মো. সামসুল আলম, অ্যাডভোকেট এ বি এম রফিকুল হক তালুকদার, এ কে এম মতিউর রহমান। এদিকে সদস্যসচিব হলেন মেজর মু. হানিফ (অব.)। সদস্য হিসেবে রয়েছেন মো. নুরুজ্জামান, মো. মিজানুর রহমান (বাকু) মেজর মো. ইমরান (অব.) লে. কর্নেল মো. আলমগীর হোসাইন (অব.) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, অ্যাডভোকেট এম এন মোস্তফা নূর, মেজর এ কে এম সাঈদুর রহমান (অব.) আবুল কাশেম, অ্যাডভোকেট সাহেদ আলী জিন্নাহ, অ্যাডভোকেট এ কে এম মিজানুর রহমান, ড. আজমল হোসেন বাচ্চু, অ্যাডভোকেট মো. হুমায়ুন কবির (মঞ্জু), ব্যারিস্টার ইমাম হোসেন তারেক, অ্যাডভোকেট আনোয়ারা শিখা, ব্যারিস্টার দিদার-ই-ইলাহী, ব্যারিস্টার রফিকুল আমীন, তালুকদার মনিরুজ্জামান মনির, মেজর মিজানুর রহমান (অব.), মেজর শিবলী মোহাম্মদ সাদেক (অব.), মেজর মো. তৌহিদুর রহমান চাকলাদার (অব.), এ এফ ওবায়দুল্লাহ মামুন, মো. সাইফুর রহমান।
নতুন দলের নিবন্ধনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর বলেন, আইন ও বিধিতে যা কিছু দেওয়া আছে সে শর্ত যারা শতভাগ পূরণ করতে পারবে, তারা নিবন্ধন পাবে। জুনের মধ্যে নিবন্ধন চূড়ান্ত করা হবে।
