'মাঠে তৎপরতা দেখা না গেলেও জঙ্গিরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সক্রিয়'

আপডেট : ২০ জুন ২০২৩, ১৫:৪১

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জঙ্গিরা সক্রিয় ও তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের (এটিইউ) প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি এস এম রুহুল আমিন। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি গণমাধ্যম কর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করেছেন তিনি। সাংবাদিকদের সঙ্গে এক কর্মশালায় তিনি বলেন, অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের অনলাইন পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে জানা গেছে, জঙ্গিরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকবেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। জনসাধারণকে এসব ব্যাপারে সচেতন করতে হবে।

সোমবার (১৯ জুন) ঢাকায় পুলিশ স্টাফ কলেজের মাল্টিপারপাস হলরুমে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত অপরাধবিষয়ক প্রতিবেদকদের নিয়ে ‘উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ ও সহিংস চরমপন্থা প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক কর্মশালা আয়োজন করে পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)। এতে জঙ্গিবাদের অন্তর্নিহিত কারণ, উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড ঠেকাতে পুলিশ ও সাংবাদিকদের সুসম্পর্কের গুরুত্ব এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তাসহ নানা বিষয়ে বিশ্লেষণী আলোচনা উঠে এসেছে।

সকাল সাড়ে ১০টায় কর্মশালা শুরু হয়। এতে মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত আইজিপি এস এম রুহুল আমিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শবনম আযীম। এটিইউ-এর ডিআইজি (প্রশাসন) মফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পুলিশ স্টাফ কলেজের ভারপ্রাপ্ত রেক্টর ড. এ এফ এম মাসুম রব্বানী এবং এটিইউ-এর ডিআইজি (অপারেশন্স) মো. মনিরুজ্জামান।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকরা। ছবি: এটিইউ

এটিইউ প্রধান এস এম রুহুল আমিন বলেন, পুলিশ চায় পজিটিভ কাজগুলো গণমাধ্যমে উঠে আসুক। এতে করে জনসাধারণের কাছে পুলিশের ইমেজ ভালো হয়। সে কারণে সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। আর জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কাজে পুলিশ ও গণমাধ্যমের বিশেষ পার্থক্য নেই। আমরা প্রত্যেকেই যার যার জায়গায় থেকে সার্বিকভাবে সমাজের মঙ্গলের জন্য কাজ করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশে জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন ছিল। এখানে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি ও গবেষণাকাজের গুরুত্ব রয়েছে। ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পুলিশ ব্যুরো অব কাউন্টার টেরোরিজম গঠনের কথা হচ্ছিলো। পরে নানা জটিলতায় তা হয়নি। ২০১৬ সালে ডিএমপি'র তৎকালীন কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) শাখাটি গঠন করেন। কিন্তু এর কর্মপরিধি কেবল ঢাকা মেট্রো এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকায় ঢাকার বাইরে বিশেষধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম সম্ভব ছিল না। পরে ২০১৯ সালে এটিইউ গঠন করা হয়। প্রয়োজনের তুলনায় লোকবল কম হলেও আমরা শুরু থেকেই বহুমাত্রিক কার্যক্রমে জোর দিয়েছি। অভিযান ও তদন্তের পাশাপাশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে এটিইউ প্রধান বলেন, তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে তথ্যের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে জনস্বার্থ বিবেচনায় কোন তথ্য প্রকাশ করা উচিত, কোনটি উচিত নয়, সেটি মাথায় রাখতে হবে। তথ্য অধিকার আইনের শর্তগুলোও মাথায় রাখা প্রয়োজন। তথ্য পরিবেশন দুইভাবে হয়, একটা আমাদের পক্ষ থেকে আমরা ব্রিফিং করি, অন্যটা আপনারা সরেজমিনে সংগ্রহ করেন। তবে হলি আর্টিজান হামলার সময় টেলিভিশনে আমাদের মুভমেন্ট সরাসরি সম্প্রচার হওয়ায় জঙ্গিরা ভেতরে বসেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান জেনে গিয়েছিল। এমন ঘটনার ক্ষেত্রে বৃহৎ স্বার্থ বিবেচনায় আপনাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে। দেশপ্রেম ধারণ করে প্রত্যেকের জায়গা থেকে সংবেদনশীলতার সাথে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমে জঙ্গিদের কথা ছেপে তাদের সেনসেশনালাইজ করবেন না।

প্যানেল আলোচনায় বক্তব্য দেন প্রথমআলোর টিপু সুলতান, সমকালের শাহাদত হোসেন পরশ এবং ডেইলি স্টারের জামিল খান। ছবি: এটিইউ

অতিরিক্ত আইজিপির বক্তব্যের আগে কর্মশালার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শবনম আযীম। তিনি বলেন, জঙ্গিরা আসলে মিডিয়া অ্যাটেনশন চায়। ২০১৫ সালে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল, যেমন ব্লগার হত্যা, বিদেশি নাগরিক হত্যা, ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর হামলা, ইত্যাদি। গণমাধ্যমে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে সংবাদপত্রের সঙ্গে জঙ্গিবাদের মিথজীবী সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ২০১৬ সালে সেই সম্পর্ক প্যারাসিটিজম সিমবিওসিসে (অন্যের ওপর নির্ভরশীল পরজীবী) পরিণত হয়। এরপর ২০১৮ সালের 'লোন উলফ' এবং ২০১৯ সালে পুলিশকে আক্রমণ করার মাধ্যমে জঙ্গিরা গণমাধ্যমকে সুকৌশলে ব্যবহার করেছে।

শবনম আযীম আরও বলেন, গণমাধ্যমকর্মীদের খেয়াল রাখতে হবে, তাদের প্রতিবেদনের মাধ্যমে যেন জঙ্গিদের সেনসেশনালাইজ না করা হয়। এজন্য সংবাদপত্রের সম্পাদক-প্রকাশকদের ভূমিকা আছে। জঙ্গিবাদ বা অপরাধসংশ্লিষ্ট বিটের সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ করতে হবে। উগ্রবাদ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের জন্য পৃথক শব্দকোষ এবং সংজ্ঞায়ন প্রস্তুত করা প্রয়োজন। এধরনের সংবাদের জন্য প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা। কারণ একটা সংবাদের ভাষা নানাভাবে জনমনে প্রভাব ফেলে।

মূল প্রবন্ধে শবনম আযীম বলেন, সহিংসতা প্রতিরোধে মনোবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা সম্বলিত অনুষ্ঠান প্রচার করা প্রয়োজন। একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকেই জঙ্গিবাদ বিরোধী কার্যক্রমে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে হবে। পুরো বিষয়টি একটা সামগ্রিক প্রক্রিয়া। এখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার সুযোগ আছে।

এটিইউ-এর ডিআইজি (অপারেশন্স) মনিরুজ্জামান বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জনগণকে পাশে নিয়েই পুলিশ কাজ করছে। জঙ্গিবাদ এতে একটা বড় বাঁধা। তবে সরকার এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। উগ্রবাদকে প্রতিহত করতে গণমাধ্যমই আমাদের সঙ্গে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। আপনাদের মাধ্যমে আমাদের কার্যক্রমের প্রচার হওয়া দরকার। আমাদের পুলিশের ভেতরে অনেক হিরো আছেন, যারা নিজের জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন। নিজেকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েও সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করছেন। সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে তাদের কথা যদি কিছুটা হলেও উঠে আসে, তবে পুলিশ সম্পর্কে মানুষের আস্থা আরও বাড়বে।

কর্মশালা শেষে দলগত কাজ উপস্থাপন। ছবি: এটিইউ

অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটের মিডিয়া অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস উইংয়ের পুলিশ সুপার আসলাম খান কর্মশালার তত্ত্বাবধানে ছিলেন। সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ওয়াহিদা পারভীন পুরো আয়োজন সঞ্চালনা করেন। আলোচনা সভার পর প্যানেল ডিসকাশন সেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে আলোচনা করেন প্রথম আলোর হেড অব রিপোর্টিং টিপু সুলতান, সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি শাহাদত হোসেন পরশ এবং ডেইলি স্টারের সিনিয়র রিপোর্টার জামিল খান।

কর্মশালার শেষভাগে ছিল দলগত কাজ। অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকরা ৬টি দলে বিভক্ত হয়ে জঙ্গিবাদ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা সংক্রান্ত পৃথক ৬টি বিষয়ে তাদের উপস্থাপনা তুলে ধরেন।

ইত্তেফাক/এসজেড/এসটিএম