গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ভাঙন রোধে তিস্তা নদীর তীর রক্ষার প্রায় ৬ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ ভাগাভাগি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গত ৫ জুন এ ব্যাপারে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীকে লিখিত অভিযোগপত্র দিয়েছেন এলাকাবাসী। এলাকাবাসীর পক্ষে রেজাউল করিম, দুলাল মিয়া ও আমজাদ হোসেন এই চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে—কুড়িগ্রাম পাউবো, ঠিকাদার ও স্থানীয় জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতার মধ্যে ঐ প্রকল্পের কাজ ভাগাভাগি হয়েছে। এ কারণে যেনতেনভাবে কাজ করায় নদীর তীর রক্ষার জন্য ব্যবহূত বস্তা আসন্ন বন্যায় নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নদীর তীর রক্ষা প্রকল্পটি গাইবান্ধা জেলার মধ্যে হলেও এলাকাটি কুড়িগ্রাম-সংলগ্ন হওয়ায় তা বাস্তবায়ন করছে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড। এই কাজের দায়িত্ব পান রংপুরের ঠিকাদার হাসিবুল হাসান। ২০২২ সালের ২৪ মে এ কাজ শুরু হয়, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু এ পর্যন্ত মাত্র ৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
কুড়িগ্রাম পাউবো ও প্রকল্প এলাকায় টাঙানো বিলবোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর বর্ষায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কারেন্ট বাজার এলাকায় নদীভাঙন দেখা দেয়। হাজার হাজার ঘরবাড়ি-জমি নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এ অবস্থায় ভাঙন ঠেকাতে ৫ কোটি ৭৫ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ টাকা জরুরি বিশেষ বরাদ্দ দেয় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। এই টাকায় সুন্দরগঞ্জের হরিপুর ইউনিয়নের কারেন্ট বাজার এলাকা থেকে এক কিলোমিটার পর্যন্ত তিস্তা নদীর বাঁ তীর রক্ষার জন্য নদীর তীরে ২৫০ কেজি ওজনের ৭৫ হাজার জিও ব্যাগ এবং ৭৫ কেজি ওজনের ৮১ হাজার ৭৪৬টি স্যান্ড (বালু) সিমেন্ট গানি ব্যাগ স্থাপন করার কথা।
প্রতিমন্ত্রীকে দেওয়া অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, দরপত্র অনুযায়ী ৭৫ কেজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন স্যান্ড (বালু) সিমেন্টের গানি ব্যাগের বদলে ৩০ কেজি ধারণক্ষমতাসম্পন্ন চালের ব্যাগ ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া কাজ চলমান থাকা অবস্থায় অধিকাংশ ব্যাগ ছিঁড়ে ও ফেটে গেছে। অর্থাত্ এসব ব্যাগের বেশির ভাগই পচা। মবিল ও ময়লাযুক্ত। বস্তায় সিমেন্টমিশ্রিত বালু থাকার নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ছেঁড়া ও ফেটে যাওয়া ব্যাগে শুধু বালুর অস্তিত্ব রয়েছে। একইভাবে ২৫০ কেজির ধারণক্ষমতার ৭৫ হাজার জিও ব্যাগের বদলে আনুমানিক ৫২ হাজার বস্তা ফেলেই কাজ শেষ করা হয়েছে। জিও ব্যাগে নির্ধারিত মাপের বালু ভরানোর কথা। সেখানে বালুর পরিবর্তে কাদা ও কাদামিশ্রিত বালু ভরানো হয়েছে। অনেক বস্তা এখনই ফেটে গেছে। টাস্কফোর্সের বাতিল করা বস্তাও হিসাবের খাতায় তুলে ডাম্পিং করা হয়েছে। অভিযোগে আরো উল্লেখ করা হয়, রংপুরের ঠিকাদার হাসিবুল হাসানের লাইসেন্স ব্যবহার করে তিনিসহ কাজটি ভাগাভাগি হয় কুড়িগ্রাম পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন, তাদের ব্যাবসায়িক অংশীদার চিলমারীর দুই ব্যক্তি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমানের মধ্যে।
গত রবিবার সকালে প্রকল্প এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, নদীর তীরে জমি ঘেঁষা কিছু জায়গায় স্যান্ড সিমেন্ট গানি ব্যাগ। কিছু চটের ব্যাগ ফেটে গেছে। তাতে সিমেন্টের মিশ্রণ নেই বললেই চলে। কিছু জায়গায় জিও ব্যাগ। নিম্নমানের হওয়ায় সেগুলোর বেশ কয়েকটি ফেটে গেছে। তবে স্যান্ড সিমেন্ট গানি ব্যাগই বেশি। জিও ব্যাগ নিচে বসানো হয়েছে। উভয় ব্যাগে বালু ও সিমেন্টের ভাগ কম। বর্ষা এলেই ভেসে যাবে। বস্তা স্থাপনের হিসাবেও গরমিল রয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন। কারেন্ট বাজারসংলগ্ন মাদারীপারা এলাকার কৃষক বাদশা মিয়া (৬০) বলেন, এখানে ৩০ কেজির চালের চটের বস্তা দেওয়া হয়েছে। বস্তায় বালু বেশি, সিমেন্ট কম। নদীর চরের চিকন বালু দেওয়া হয়েছে। কাজের মান খারাপ। ফলে বর্ষা আসার আগেই ভেঙে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে ঠিকাদার হাসিবুল হাসানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। খুদে বার্তাও দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। জাপা নেতা মিজানুর রহমান মোবাইল ফোনে বলেন, ‘আমি ঠিকাদারের পক্ষে অর্ধেক অংশ সাব কন্টাক্টে কাজ করেছি। দরপত্রের নিয়ম অনুযায়ী কাজ হয়েছে। ঢাকা থেকে টাস্কফোর্স কমিটিও কাজ দেখে গেছে।’
কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমি কাজ করব কেন। ঠিকাদারের কাজ ঠিকাদার নিজেই করেছেন। তার সঙ্গে কথা বলেন। দ্রুত কাজ সম্পন্ন করতে ঠিকাদার দুই-তিনটি গ্রুপকে দিয়ে কাজ করিয়েছেন। প্রতিটি বস্তা ভরাটের আগে ওজন করা হয়েছে। যেসব বস্তা খারাপ ছিল, তা বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া টাস্কফোর্স কমিটি তদন্ত ও পরীক্ষানিরীক্ষা করেছে।’ তিনি আরো বলেন, এ পর্যন্ত ৯০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখনো চূড়ান্ত পুরো বিল দেওয়া হয়নি। যাচাই-বাছাইয়ের পর কাজ সন্তোষজনক হলে পুরো বিল দেওয়া হবে।
