দুদকের নামে চাঁদাবাজি করতে গিয়ে দুদক সদস্যসহ চারজন গ্রেপ্তার

আপডেট : ২৪ জুন ২০২৩, ১৩:৫২

আশিকুজ্জামান একজন সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী। বায়তুল মোকাররম মসজিদের কার্পেটের দোকানে ইমপোর্ট করা কার্পেট ও জায়নামাজ সরবরাহ করে থাকেন। গত ১৯ জুন তার স্ত্রী সন্তান প্রসব করা সংক্রান্তে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ২০ জুন সকালে আশিকুজ্জামানের উত্তরার বাসায় দুদুকের মনোগ্রাম সম্বলিত খাকি রঙের খামে একটি নোটিশ নিয়ে একজন অফিসার হাজির হন। কার্পেটের ব্যবসার আড়ালে স্বর্ণের চোরাচালান এবং মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন আশিকুজ্জামানের বিরুদ্ধে। স্ত্রীর হাসপাতালে অবস্থান এবং দুদকের এই ভয়ানক অভিযোগ শুনে ঘাবরে যান আশিকুজ্জামান। তখন দুদকের সেই অফিসার আশিকুজ্জামানকে একটু সহানুভূতি দেখানোর ভান করে তাকে তখনই মোবাইল বন্ধ করে দিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দেযন। ভয় দেখান ডিবি, সিআইডি, বাংলাদেশ ব্যাংক দুদক এবং এনএসআই নাকি দুর্নীতি সংক্রান্ত বিষয় তাকে খুঁজছে। দুদকে তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে দুর্নীতি সংক্রান্ত একটি অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে। নোটিশ বহনকারী ব্যক্তি হোয়াটসঅ্যাপে দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে আশিকুজ্জামানকে কথা বলিয়ে দেন। হোয়াটসঅ্যাপে দুদকের ঐ কর্মকর্তা মোবাইলে কথা বলা সমীচীন নয় মর্মে বিস্তারিত জানার জন্য তাকে দুদক অফিসে সশরীরে হাজির হতে বলেন।

দুদকের নোটিসে বিভিন্ন অভিযোগের পাশাপাশি উল্লেখ করা হয়। শূন্য থেকে সে আজ কোটি কোটি টাকার মালিক। তাকে দুদকের জিম্মায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সকল প্রমাণ পাওয়া যাবে। এমতাবস্থায় প্রচলিত আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। কারণ দর্শানোসহ ব্যক্তিগত শুনানির জন্য ১০ জুলাই নির্ধারণ করা হয়। ঘাবড়ে যাওয়া আশিকুজ্জামানকে দফায় দফায় ফোন দেওয়া হয় হোয়াটসঅ্যাপে। সম্পত্তি ক্রোক করা, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের ব্যবস্থা করা, প্রিন্টেড ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে বেজ্জতি করাসহ সিআইডি, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনএসআই, ডিবি পুলিশ এবং দুদক দিয়ে গ্রেফতার করিয়ে কঠোর শাস্তির ভয় দেখানো হয়।

এক পর্যায়ে আশিকুজ্জামানকে মতিঝিলের হিরাঝিল হোটেলের দ্বিতীয় তলায় এসে সমঝোতার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। সমঝোতা অনুসারে প্রথমে দুই কোটি টাকা দিতে বলা হলেও পরবর্তীতে দিতে বলা হয় এক কোটি টাকা। বিনিময়ে সমস্ত অভিযোগ থেকে অব্যাহতির নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এক কোটি টাকার মধ্যে গত ২৩ জুন জুম্মার আগে ২০ লক্ষ টাকা প্রদান করতে বলা হয়। বাকি টাকা আগামী রোববার ব্যাংক আওয়ারে পরিশোধের সমঝোতা হয়। ভিকটিম বিষয়টি গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগককে অবহিত করলে তারা দুদকের সাথে যোগাযোগ করে এবং দুদকের উপ-পরিচালক নজরুল ইসলামকে হোটেল হিরাঝিলের আশেপাশে অবস্থান নেয়। সমঝোতা অনুসারে ভিকটিম আশিকুজ্জামান চারটি মিষ্টির প্যাকেটে তার স্বাক্ষরিত দেড় লক্ষ টাকা ভরে হোটেল বহিরাঝিলে যান। তার কাছ থেকে মিষ্টির প্যাকেটে সংরক্ষিত টাকা গ্রহণ করা কালে আশেপাশে অবস্থান নিয়ে থাকা ডিবি পুলিশ তাদেরকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। ডিবি লালবাগ বিভাগের এডিসি রাকিবের নেতৃত্বে গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- গৌতম ভট্টাচার্য (৪২), হাবিবুর রহমান (৪২), পরিতোষ মন্ডল (৬৩) ও মোঃ এসকেন আলী খান (৫৭)।

গ্রেপ্তারকৃতদের হেফাজত থেকে মিষ্টির ৪টি প্যাকেট, নগদ দেড় লক্ষ টাকা, ৪টি মোবাইল ফোন, দুদকের মনোগ্রাম সম্বলিত খাকি রঙের ১টি খাম ও দুদকের একটি নোটিস উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে গৌতম ভট্টাচার্য দুদকের ডিজি মানি লন্ডারিং-এর পিএ হিসেবে কর্মরত, বাড়ি মৌলভীবাজার। এসকেন আলী খান চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য, বাড়ি গোপালগঞ্জ। অপর দুইজন গোপালগঞ্জের বাসিন্দা এবং পেশাগতভাবে দালাল ও প্রতারক।

এদের মধ্যে গৌতম ভট্টাচার্য দীর্ঘদিন ধরে দুদকের বিভিন্ন মহাপরিচালকদের পিএ হিসেবে কাজ করে আসছেন। তিনি কখনো দুদকের ডিজি (তদন্ত), ডিজি (এডমিন), ডিজি (প্রসিকিউশন), ডিজি (মানি লন্ডারিং) এর অফিসের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট (পিএ) হিসেবে কাজ করে আসছেন। গৌতম ভট্টাচার্য কর্ম সূত্রেই জানেন দুর্নীতি সংক্রান্তে কীভাবে মানুষকে নোটিশ পাঠাতে হয়, কীভাবে তাদের কাছ থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক ব্যাখ্যা নেওয়া হয় এবং কীভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। এই অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি তার দুষ্কর্মের সহযোগীদেরকে দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং চাকরিজীবীকে টার্গেট করেন। এরপর তাদের ব্যক্তিগত নানা তথ্য সংগ্রহ করে দুদকের চিঠির খাম ও প্যাড/ফরমেট ব্যবহার করে অভিযোগের নোটিশ পাঠাতেন। পরবর্তীতে কখনো মোবাইলে-হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলে, কখনো শিল্পকলা একাডেমির ভেতরে বসে, কখনো আশেপাশের বিভিন্ন হোটেলে টার্গেটের টাকায় খেতে খেতে তাদেরকে অভিযোগের দায় হতে অব্যাহতি দান/সমঝোতার নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

এদের সাথে দুদুক কার্যালয়ের দায়িত্বশীল আরও কেউ জড়িত আছেন কি না, খতিয়ে দেখার জন্য আসামিদের জিজ্ঞাসা করা হবে।

ইত্তেফাক/এসকে