কুকিচিনের প্রধান নাথান বমকে আত্মসমর্পণ করতে নিষেধ করেন শারক্কীয়ার শামিন

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৩, ০২:৩৯

জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়ার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পর আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন সংগঠনটির পাহাড়ে আশ্রয়দাতা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) প্রধান নাথান বম। শারক্কীয়ার প্রতিষ্ঠাতা শামিন মাহফুজ আত্মসমর্পণের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। বরং তিনি নাথান বমকে আত্মসমর্পণ করতে নিষেধ করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সিটিটিসির (কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম) একটি টিম শুক্রবার রাতে রাজধানীর ডেমরার একটি বাড়ি ঘেরাও করে শারক্কীয়ার প্রতিষ্ঠাতা শামিন মাহফুজ ও তার স্ত্রী নাজনীন সুলতানাকে গ্রেফতার করে। এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল ও বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক এবং সংগঠনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার নথি উদ্ধার করা হয়।

ডেমরা থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দায়ের করা মামলায় তাদের ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা সিটিটিসির এসআই সাইফুল ইসলাম। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আহমেদ হুমায়ুন কবীর শারক্কীয়ার প্রতিষ্ঠাতা শামিন মাহফুজের চার দিন ও তার স্ত্রীর তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

গতকাল শনিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান জানান, ছাত্রজীবন  থেকেই শামিন মাহফুজ অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। এসএসসিতে রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে রাজশাহী বোর্ডে পঞ্চম স্থান অর্জন করেন। এরপর কলেজে পড়াকালীন সময়ে শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন তিনি। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তাকে ক্যাডেট কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি অন্য একটি কলেজে ভর্তি হন এবং এইচএসসিতে রাজশাহী বোর্ডে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হওয়ার পরেই বড় ভাইয়ের ছেলের মাধ্যমে এক জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত হন তিনি। ঐ সংগঠনটি আনসার আল ইসলাম নামে আত্মপ্রকাশ করে। ২০০৭ সাল থেকেই শামিন মাহফুজ সংগঠনের আধ্যাত্মিক নেতা জসীম উদ্দিন রহমানীসহ শীর্ষ নেতৃত্বের সংস্পর্শে আসেন। সে সময় আরেকটা বিদেশি চরিত্র বাংলাদেশের জঙ্গিবাদে আবির্ভূত হয় বলে জানা গিয়েছিল। কিন্তু সে চরিত্রের বিষয়ে আমরা স্পষ্ট নই, সেই চরিত্রের বিষয়ে আমরা শামিন মাহফুজের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করব।

সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামান বলেন, ঢাবিতে পড়াকালীন সময়েই শামিন মাহফুজ পাহাড়ে ক্যাম্পের পরিকল্পনা করেন। সে অনুযায়ী তিনি পাহাড়ে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি এসএম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। আর কুকি চিনের প্রধান নাথান বম ছিলেন চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী, থাকতেন জগন্নাথ হলে। তাদের মধ্যে ঐ সময় থেকে যোগাযোগ হতো। এরপর ঢাবি থেকে পড়াশুনা শেষ করে তিনি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরমধ্যেই তার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে ভর্তি হন। তার গবেষণার বিষয় ছিল পাহাড়ে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার বিশ্লেষণ। ইচ্ছা করেই তিনি এই বিষয়টি নেন, যাতে তিনি পাহাড়ে  যেতে পারেন এবং সেখানে নিরাপদ আস্তানা তৈরি করতে পারেন।

তিনি বলেন, পিএইচডিতে গবেষণারত অবস্থায় শামিন মাহফুজকে ২০১১ সালের ২৮ মার্চ থানচির বলিপাড়ার কলাইপাড়া এলাকার বিজিবি তার সহযোগী ইসমাইল হোসেনসহ আটক করে। ঐ সময় অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় বান্দরবান জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। বছর দুয়েক পর বান্দরবানের কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও তিনি জঙ্গি কার্যক্রম শুরু করেন। ২০১৪ সালে ডিবি আবার গ্রেফতার করে তাকে। এরপর তিনি কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন। সেখানে থাকাকালীন আটক হুজি এবং জেএমবির শীর্ষ নেতা সাইদুর রহমান, মুফতি হান্নান ও আবু সাঈদের সংস্পর্শে আসেন তিনি। সে সময় জঙ্গি নেতারা জানতেন যে শামিন মাহফুজ এবং রক্সি নামে একজন আগেই জেল থেকে বের হবে। তাই তাদের ওপর দায়িত্ব  দেওয়া হয় নতুন প্ল্যাটফরম তৈরির জন্য। ২০১৭ সালে রক্সি এবং ২০১৮ সালে শামিন মাহফুজ জেল থেকে জামিনে ছাড়া পান। এরপর থেকে তারা সদস্য সংগ্রহ শুরু করেন কিন্তু সংগঠনের নামকরণ হয়নি। রক্সি দাওয়াতি কার্যক্রম এবং শামিন মাহফুজ পাহাড়ে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেন। তখন ২০১৯ সালে রক্সিকে সংগঠনের আমির হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

সিটিটিসির প্রধান আরো বলেন, ঢাবিতে থাকাকালীন সময় থেকেই শামিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল কুকি চিনের প্রধান নাথান বম। শামিন উদ্দেশ্যমূলকভাবেই নাথান বমের সঙ্গে পরিকল্পনা করে ঘনিষ্টতা করে। তখনই নাথান বমের সঙ্গে পাহাড়ে বেড়াতে গেছেন শামিন। ২০১৯ সালে নাথান বমকে জঙ্গি সংগঠন তৈরির কথাটি জানান এবং সশস্ত্র জিহাদের প্রস্তুতের জন্য তাকে ট্রেনিং ক্যাম্পে স্থাপনের প্রস্তাব দেন। ২০২০ সালে কক্সবাজারের একটি হোটেলে বসে কুকি চিন ও নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কীয়ার মধ্যে সমঝোতা স্মারক হয়। শুক্রবার রাতে ডেমরার বাসায় অভিযান চালানোর সময় দুই পৃষ্ঠার লিখিত সেই সমঝোতা স্মারক উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ২০২১ সালে সিলেট থেকে ছয় তরুণ নিখোঁজ হয়। এপ্রিলে প্রথম ১২ জন নিয়ে পাহাড়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। কুকি চিনের ক্যাম্পের পাশেই কেডিসি ক্যাস্প নামে ক্যাম্পটি পরিচালিত হয়। তখনই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে বসে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। ২০২২ সালের শুরুর দিকে ৩০-এর বেশি তরুণ নিখোঁজ হয়। পরে শারক্কীয়ার আমির রক্সি গ্রেফতারের পর তমালকে আমির হিসেবে নিয়োগ দেন শামিন। ২০২২ সালে সুরা কমিটি গঠন করে বিভিন্ন জনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

সিটিটিসি প্রধান বলেন, আমরা শামিনের মোবাইল থেকে একটি গোপন কথোপকথন উদ্ধার করেছি। সেখানে সুরা কমিটির সঙ্গে নাথান বমও কানেক্টেড ছিল। অভিযানের শুরুর দিকে শামিন মাহফুজকে আত্মসমর্পনের প্রস্তাব দেন নাথান বম। কিন্তু শামিন আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নাকচ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত নেন। শামিন নির্দেশনা দিয়েছে, ‘যুদ্ধ হবে আক্রমণাত্মক, রক্ষণাত্মক নয়।’

শামিন মাহফুজের স্ত্রী আগে ছিলেন আনসার আল ইসলামের ইজাজ কারগিলের স্ত্রী। কারগিল যুদ্ধে ড্রোন হামলায় ইজাজ মারা যান। ইজাজ যখন পাকিস্তান চলে যান তখন সংগঠনের সিদ্ধান্তে তার স্ত্রীকে বিয়ে করেন শামিন। তার স্ত্রী সংগঠনে নারীদের দাওয়াতি কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন। এক প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান বলেন, আমরা নাথান বমের সঙ্গে শামিনের সর্বশেষ যোগাযোগটা উদ্ঘাটন করতে পারিনি। আমরা মনে করি, কোনো না কোনোভাবে নাথান বমের সঙ্গে শামিনের যোগাযোগ থাকতে পারে। নাথান বমের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন শামিন। তার কথায় কেন নাথান বম আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন—এই প্রশ্ন আমাদেরও।

ইত্তেফাক/ইআ