নোমোফোবিয়া সারাইবে কে

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৩, ০৫:০১

মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও নূতন নূতন ডিভাইসের প্রতি শিশু-কিশোরদের আকর্ষণ থাকিবে, ইহাই স্বাভাবিক। কারণ এই বয়সে তাহাদের নূতন কিছু জানিবার আগ্রহ থাকে; কিন্তু এই সকল শিশু যখন মোবাইল গেমসসহ নানা ক্ষতিকর বিষয়ে আসক্ত হইয়া পড়ে, তখন তাহা তাহার শারীরিক ও মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। এই আসক্তি আজকাল এমন ভয়াবহ রূপ লাভ করিয়াছে যে, ডিভাইসে আসক্ত শিশুরা ঠিকমতো খেলাধুলা করিতে চাহে না, খাইতেও চাহে না। এই প্রবৃত্তি তাহাদের নিয়মিত লেখাপড়া, ক্যারিয়ার ও উন্নত ভবিষ্যৎ গঠনের প্রতিবন্ধক। ইন্টারনেটের ভালো ও মন্দ উভয় দিকই রহিয়াছে। আমরা কোনটা গ্রহণ করিব?

বিশ্বে প্রথম মোবাইল ফোনের আবিষ্কারক মার্কিন নাগরিক মার্টিন কুপার নিজেই ডিভাইসে মানুষকে সময় নষ্ট করিতে দেখিয়া বিস্ময় প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি জীবনকে উপভোগ করিতে ইহার ব্যবহার কমাইয়া দেওয়ার পরামর্শ দিলেও তাহা কে শোনে? অথচ মাত্রাতিরিক্ত ডিভাইস ব্যবহারের কারণে শিশুদের চোখের সমস্যা এখন একটি কমন বিষয়। মাথাব্যথা ও চোখের সমস্যা লইয়া তাহারা এখন অধিক হারে হাসপাতালমুখী। তাহাদের বাড়িয়া যাইতেছে মায়োপিয়া বা চোখের মাইনাস পাওয়ার। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য মতে, বাংলাদেশের ৪ হইতে ১৭ লক্ষ শিশু-কিশোর বর্তমানে ডিভাইসে আসক্তির কারণে ভুগিতেছে নানা জটিলতায়। ডিভাইস বলিতে মোবাইল ফোন, ট্যাব, টেলিভিশন, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার ইত্যাদিকে বুঝানো হইয়া থাকে। অবুঝ শিশুরা পর্যন্ত অ্যানড্রয়েড ডিভাইসে মজিয়া রহিয়াছে। এমনকি তাহাদের খাওয়া হইতে শুরু করিয়া ঘুম পাড়ানোর জন্যও ব্যবহূত হইতেছে এই সকল ডিভাইস। ইউনিসেফের এক তথ্য মতে, বিশ্বে প্রতি তিন জন ইন্টারনেট ব্যবহারীর একজন শিশু। এমনকি ফেসবুক ব্যবহারকারীর ২৫ শতাংশের বয়সই ১০ বত্সরের কম। অর্থাত্ তাহারা ইন্টারনেট ব্যবহার করিতেছে না, বরং ইন্টারনেটই তাহাদের ব্যবহার করিয়া চলিয়াছে নানাভাবে।

প্রকৃতপক্ষে কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও জুম বা অনলাইন ক্লাস জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইহাতে লেখাপড়ার ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়। এখন অনেক স্কুল-কলেজের প্রতিটি ক্লাসে হোয়াটসআপ গ্রুপ রহিয়াছে। ইহার মাধ্যমে শিক্ষকরা পরীক্ষার রুটিন, হোমওয়ার্ক, নোটিশসহ বিভিন্ন তথ্য শিক্ষার্থীদের জানাইয়া দেন। ইহাতে লেখাপড়া সহজ হইয়াছে কোনো সন্দেহ নাই; কিন্তু একশ্রেণির শিশু ইহার চাইতে মোবাইলের বিভিন্ন অ্যাপসভিত্তিক গেমস, পর্নোগ্রাফি ভিডিও, পাবজি, টিকটক, ফ্রি-ফায়ার, ইউটিউব, লাইকি, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদিতে ঝুঁকিয়া পড়িতেছে। ইহার কারণে বড় বড় শহরে গড়িয়া উঠিতেছে কিশোরগ্যাংও। ইহাতে বাড়িতেছে খুনখারাবি, মানসিক অস্থিরতা। তাহাদের ২৬ শতাংশ দিনে চার হইতে ছয় ঘণ্টা এবং ৩১ শতাংশ দুই হইতে চার ঘণ্টা করিয়া মোবাইলে সময় কাটাইতেছে। কী বিপজ্জনক কথা!

গবেষকরা মোবাইল ফোনের সহিত যোগাযোগ হারানোর ভয়জনিত যে অসুখ, তাহার নাম দিয়াছেন নোমোফোবিয়া। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ৫৩ শতাংশ এবং ২৯ শতাংশ ভারতীয় তরুণ এ রোগের শিকার। ইহার কারণে শুধু দৃষ্টিশক্তি নহে, শ্রবণশক্তি,  শরীরের অস্থিসন্ধিগুলি ও প্রজননতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইহার হাই ফ্রিকোয়েন্সির ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক রেডিয়েশনের সহিত রহিয়াছে মস্তিষ্ক ক্যানসারের যোগসূত্র। ইহার কারণে ঘুমের যে সমস্যা হয় তাহার নাম ইনসমনিয়া বা স্পিং ডিসঅর্ডার। মোদ্দাকথা, বিজ্ঞানের অনন্য আবিষ্কার মোবাইল ফোন এড়াইয়া চলিবার উপায় না থাকিলেও ইহার অপব্যবহার যেন না হয়, দিনকে দিন যাহাতে ছেলেমেয়েরা ইহার প্রতি আসক্ত না হইয়া পড়ে, সেই জন্য শিক্ষক ও অভিভাবকদের সচেতনতা খুবই জরুরি। ইহার ভয়াবহতা বা আসক্তি হইতে শিশু-কিশোর ও ছেলেমেয়েদের দূরে রাখিতে হইলে তাহাদের হাতে তুলিয়া দিতে হইবে আকর্ষণীয় বই, পত্রপত্রিকা ও বিভিন্ন ধরনের ম্যাগাজিন। তাহাদের যোগাযোগ ঘটাইতে হইবে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সহিত। বিনা প্রয়োজনে ইহার অতিরিক্ত ব্যবহার পরিহার করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। 

 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন