দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে একটি অবাধ, অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নহে। বিভিন্ন ছোট ছোট নির্বাচন তথা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে যেই সকল কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হইতেছে, তাহাতেও বিষয়টি পরিষ্কার। যাহারা এই সকল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়াছেন এবং ভুক্তভোগী তাহাদের নিকটও এই বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই সকল নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া কত তুলকালাম কাণ্ডই না ঘটিয়া গেল; কিন্তু তাহা দেখিবার কেহ নাই। পদে পদে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন, প্রতিপক্ষের নির্বাচনি প্রচারণায় ও নির্বাচনি অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষ, এমনকি প্রার্থীর ওপর হামলা, গোপনকক্ষে অনিয়ম, প্রিজাইডিং কর্মকর্তাকে হুমকি, বিরোধী এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র হইতে বাহির করিয়া দেওয়া ইত্যাদি নানা অপকর্মমূলক ঘটনা ঘটিয়াছে। এই সকল ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অথচ আমরা জানি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্বাচন কমিশনের অধীনে কাজ করিবার কথা। ইহার বাহিরে বিজিবি বা সেনাবাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন হইলে তাহাও সরকার দিতে বাধ্য; কিন্তু এই সকল কিতাবের কথায় পরিণত হইয়াছে। বাস্তব ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে অসহায় ও ঠুঁটো জগন্নাথ বলিয়া প্রতীয়ান হইয়াছে। এই অবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব?
আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী ও বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের সময় সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—সকলে নির্বাচন কমিশনকে সমীহ করিয়া চলিতে বাধ্য হয়। অনিয়ম হইলে যে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়; কিন্তু আমাদের দেশে নির্বাচন কমিশন সেইরূপ ভূমিকা পালন করিতে পারিতেছে না বলিয়া সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনগণের আস্থা কম। এইখানে মিথ্যা মামলা দিয়া নির্বাচনকে যেমন বাধাগ্রস্ত করিবার প্রয়াস চলে, তেমনি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সরকারের পক্ষে কাজ করিতে দেখা যায়। ইহাতে বিদেশি বন্ধুরাও বলিতেছেন যে, এই পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব। তাহাদের কথা বাদ দিলেও যাহারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, তাহাদের অভিমত আমলে নিলেও এমন আশঙ্কা অমূলক নহে। সর্বোপরি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বত্র ছড়াইয়া পড়িয়াছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। তাই এই সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা প্রকাশ করা ছাড়া আমাদের আর কিছু বলিবার থাকিবে না।
একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কেন অসম্ভব, সেই ব্যাপারে যাহারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করিয়া থাকেন তাহাদের জিজ্ঞাসা করিলেই চলিবে। ইহাতে বাহিরের লোকের সার্টিফিকেট নেওয়ার প্রয়োজন নাই। আজ এই অবস্থা যাহারা সৃষ্টি করিয়াছে তাহারা নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের সদস্য বলিয়া দাবি করিলেও তাহারা বহিরাগত ও অনুপ্রবেশকারী। অথচ তাহাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা লওয়া হইতেছে না। এই জন্য আমরা মনে করি, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পূর্বে তাহাদের সঠিক দায়িত্ব পালন করিতে হইবে। তাহাদের নাকের ডগায় কীভাবে প্রকাশ্যে কেহ বলিতে পারে যে, প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাড়িগাড়ি সকল কিছু মাটির সহিত মিশাইয়া দেওয়া হইবে? প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এইখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করিতেছে। উলটা তাহাদের কথায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী-কর্মীদের গ্রেফতার করা হইতেছে। নির্বাচনকালেও কীভাবে তাহাদের গ্রেফতার করা হয়?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা সকলের দায়িত্ব; কিন্তু যাহারা এইভাবে প্রকাশ্যে হুমকি-ধামকি দিয়া যাইতেছে তাহাতে কেহ যদি পালটা ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহা হইলে সেই এলাকার পরিস্থিতি কোথায় গিয়া দাঁড়াইবে? তাহাতে কি নৈরাজ্য সৃষ্টি হইবে না এবং তখন ইহা হইতে উদ্ধার করিবার কি কেহ থাকিবে? মানুষ কি শান্তিতে বসবাস করিতে পারিবে? এই পরিস্থিতি যে ক্ষমতাসীনদেরও নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যাইবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। অতএব, একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে সর্বাগ্রে প্রশাসন ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পালন করিতে হইবে দায়িত্বশীল ভূমিকা।
