আড়তদার ও সিন্ডিকেটে ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত আম চাষিরা

আপডেট : ২৬ জুন ২০২৩, ১৯:৩৭

শ্রমিক খরচ, কীটনাশক, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ বৃদ্ধি পেলেও নওগাঁয় এ বছর আম কম দামে কেনা-বেচা হচ্ছে। আম চাষিদের অভিযোগ, আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট আমের দাম বেঁধে দিয়েছে। ফলে আমের ভরা মৌসুমেও ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না আম চাষিরা। আমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিদেশে আরও বেশি করে রপ্তানি, নিরাপদ আম উৎপাদন, প্যাকেটিং ব্যবস্থাসহ হিমাগার নির্মাণের দাবি জানানো হয়েছে। 

জানা গেছে, নওগাঁয় ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে উন্নত জাতের আম্রপালি, বারি-ফোর, গৌড়মতি, ব্যানানা ম্যাংগো, ফজলি, ল্যাংড়াসহ স্থানীয় জাতের আম চাষ করা হয়েছে। মুকুল আসার সময় তীব্র খরা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেলেও সিন্ডিকেটের আমের দাম বেঁধে দিয়েছে। ফলে ভরা মৌসুমে আমের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন আম চাষিরা। এ ছাড়াও আম কেনা-বেচার জেলার সবচেয়ে বড় বাজার সাপাহারে আড়তদারদের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগ করেন চাষিরা।

ছবি: ইত্তেফাক

বর্তমানে এই হাটে মানভেদে প্রতি মণ ল্যাংড়া আম ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগর আম ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা, নাক ফজলি আম ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং আম্রপালি আম ২ হাজার টাকা থেকে ২৮শ, টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। দিনশেষে এসব আম চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

নিয়ামতপুর থেকে আম বিক্রি করতে আসা ইদ্রিস আলী বলেন, কিছুদিন আগেও আম বিক্রি করেছি। দেখা যায় দরদাম ঠিক হওয়ার পর আড়তে আম নিয়ে গেলে বলা হয় আম আকারে ছোট। ৫১-৫২ কেজিতে মণ দিতে হবে। তখন বাধ্য হয়ে বেশি দিয়ে বিক্রি করতে হয়। এছাড়াও আম বিক্রির টাকা দিতে গিয়েও দুই-তিন ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয় আবার কখনো বলা হয় পরের দিন আসতে। এমনিতেই গত বছরের চেয়ে এ বছর আমের দাম কম। কীটনাশকের দাম বেশি। ৫২ কেজিতে মণ নেওয়া হয়। সব দিক দিয়েই আমরা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারের নজর থাকলে আমরা এই ক্ষতির মধ্যে পড়তাম না।

শহিদুল ইসলাম নামে এক আম চাষি বলেন, আম্রপালি ১৬ ক্যারেট আম নিয়ে আসছি। ২ হাজার থেকে ২২০০ টাকা মণ বলছে এখনো বিক্রি করি নাই। আগে ৪৫ কেজিতে মণ নেওয়া হতো। এখন ৫১-৫২ কেজিতে মণ নেওয়া হয়। এতে করে খুব সমস্যায় পড়তে হয় আমাদের। বাজারে সব জিনিসের দাম বেশি। কীটনাশক, শ্রমিকের দাম বেশি, গাড়ি ভাড়া বেশি এর ওপর আবার এক মণে ৫২ কেজিতে মণ দিতে হয়। আড়তদার ও বড় বড় কোম্পানির লোকজনের বেঁধে দেওয়া দামের কারণে আম চাষিরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না।

এ বিষয়ে সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমিতি সভাপতি কার্তিক সাহা বলেন, দুই ক্যারেটের ওজন চার কেজি। ভালো আম হলে দুটি ক্যারেটসহ ৪৮ কেজিতে মণ নেওয়া হয়। কৃষকরা ভালো ও বড় আকারের আমের মধ্যে ছোট জাতের আম নিয়ে আসে। তখন ৫০-৫২ কেজিতেই প্রতি মণ আম দিয়ে যান। এর প্রভাবে সাপাহারে ব্যবসায়ীরা কম আসছে। ওজন সব জায়গায় সমান হলে আমের দাম আরও বেশি হয়ে থাকত।

ছবি: ইত্তেফাক

সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক জুয়েল হক জানান, কর্পোরেট গ্রুপ স্কয়ার ও প্রাণ কোম্পানির প্রতিনিধিদের বেধে দেওয়া দামের কারণেই বাজারে কম দামে আম কিনতে বাধ্য হন। কর্পোরেট গ্রুপ সিন্ডিকেট আমের দাম বেঁধে না দিলে আম চাষিরা আমের ভালো দাম পেতেন। 

সাপাহারের বরেন্দ্র অ্যাগ্রো পার্ক এর স্বত্বাধিকারী ও তরুণ উদ্যোক্তা সোহেল রানা বলেন, আমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বিদেশে আরও বেশি করে আম রপ্তানিযোগ্য করতে হবে। আম চাষিদের প্রশিক্ষণ, শুল্ক কমানো, প্যাকেটিং করাসহ হিমাগার নির্মাণ করে দিতে হবে। হিমাগারে আম এক মাস পর্যন্ত রাখা যায়। আম কাঁচামাল হওয়ায় খোলা পরিবেশে রাখা সম্ভব হয় না। ভরা মৌসুমে ফলে আম কম দামে ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। 

নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেন, গত কয়েক বছরে আম উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে নওগাঁ জেলা। এ বছরও তিন লাখ ৭৮ মেট্রিক টন উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। গত বছর নওগাঁ থেকে ৭৭ মেট্রিক টন আম বিদেশে রপ্তানি হলেও এ বছর ৪০০ মেট্রিক টন আম রপ্তানি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নওগাঁয় আম উৎপাদনের ধারা অব্যাহত হলে আগামীতে হিমাগার স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে।

ইত্তেফাক/এবি/পিও