‘মাসটা শেষ অইলেই চান্দা নিতে আহে। বিদ্যুতের বিলটা হাতে দিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। গ্যারেজের মালিক নিজে হাতে গুঁজে দেয় নগদ ৫ হাজার টাকা। গ্যারেজে ৩০টি অটোগাড়ি। রাতদিন অবৈধ লাইন দিয়ে অটোগাড়ির ব্যাটারি চার্জ করা হয়। বিভিন্ন শিফটের চালকরা চার্জ করা অটোগাড়ি নিয়ে রাস্তায় বের হন। এক বেলা শেষে ফের গাড়ি জমা করতে হয় গ্যারেজে।’ এটাই এখন নারায়ণগঞ্জের বাস্তব চিত্র। আগে রিকশা রাখা হতো। এখন পরিবর্তন ঘটেছে সবকিছুর। মহল্লায় মহল্লায় চার্জের অটোগাড়ির গ্যারেজ তৈরি হয়েছে। রিকশা ছেড়ে মালিকরা এখন অটোগাড়ির ব্যবসা ধরেছে। এ গাড়িতে উপার্জন হয় বেশি। চার্জ দিতে অটো গ্যারেজে বিদ্যুৎ বিল লাগে না। দুয়েকটা গাড়ির বিল দিয়ে বাকিগুলোর বিল চুরি করা হয়। অটো গ্যারেজ মালিকের সঙ্গে মিটার রিডার ও বিল বিলিকারকদের দহরমমহরম সম্পর্ক।
মিটার রিডাররা নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ায় তারাও একবারেই নিশ্চুপ। প্রশাসনের কারো এ ব্যাপারে বাড়তি কোনো নজর নেই। পশ্চিম দেওভোগ মাদ্রাসার শেষ মাথা এলাকায় বিদ্যুতের ভ্রাম্যমাণ আদালতের পিকআপ ভ্যান দেখে অটো গ্যারেজ চালকরা দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয়। প্রত্যেক মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত আসে। অনেক গ্যারেজের ড্রাইভাররা ভ্রাম্যমাণ আদালতের খবর পেয়ে অটোগ্যারেজ বন্ধ করে চলে যান। তখন আদালত বকেয়া বিল খেলাপি গ্রাহকদের লাইন কেটে তার নিয়ে যায়। নাগবাড়ী ও বেপারিপাড়া এলাকার কয়েক জন অটোচালক বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ভাড়ার টাকা জমা দিয়েই অটো নিয়ে রাস্তায় বের হই। অটোর চার্জে অনেক বিদ্যুৎ খরচ হয়। গ্যারেজ মালিকরা ছয়-নয় করে বিদ্যুৎ বিল মেরে দেয়। সেই টাকা দিয়ে নতুন বা চোরাই অটো কিনে আয় বাড়ায়। সরকার দিনের পর দিন বিদ্যুতের বিল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর বিপরীতে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ চুরির মহোত্সব চলছেই।
তাঁতীপাড়ার কয়েক জন বাড়ির মালিক জানান, ‘এলাকায় অনেকগুলো রিকশার গ্যারেজ রয়েছে। অনেকে বংশ পরম্পরায় রিকশার ব্যবসা করে আসছেন। এরা অধিকাংশ প্যাডেল রিকশায় মোটর সংযুক্ত করে দৈনিক জমা বৃদ্ধি করেছেন। এতে তাদের আয় বেড়েছে। তবে বিপদ হয়েছে আমাদের। আমাদের বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে। মহল্লায় রিকশার গ্যারেজগুলো অটোর গ্যারেজে রূপান্তরের পর থেকেই আমাদের বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে। মিটার রিডারকে প্রশ্ন করলে তারা আজগুবি কথাবার্তা বলেন। কখনো বলেন, পুরনো বিল এডজাস্ট হচ্ছে। কখনো বলেন, ভূতুড়ে বিল। এর সঙ্গে কম্পিউটারের ভুলের কথা তো আছেই। আসলে মহল্লার অটোগ্যারেজগুলোতে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে। অটোগ্যারেজের সেই চুরির খেসারত দিতে হয় মহল্লার অন্যান্য সাধারণ গ্রাহকদের। চুরি যাওয়া বিদ্যুৎ বিলের কিছু অংশ মহল্লার সবার মধ্যে বাটোয়ারা করে দেওয়া হয়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাবুরাইলের একটি অটোগ্যারেজের ম্যানেজার জানান, মাসদাইর গুদারাঘাট, ঘোষেরবাগ, দেওভোগ পানির ট্যাংক, নাগবাড়ী, মাদ্রাসার শেষমাথা, বাঁশমুলি, গাইবান্দা বাজার, বারৈভোগ, ভোলাইল বাজার, গেদ্দারবাজার, কাশীপুর দেওয়ানবাড়ী, খিলমার্কেট, হোসাইনীনগর, ভূঁইয়াপাড়া, বউবাজার, ১নং বাবুরাইল শেষমাথা, আমবাগান, হাকিম কন্ট্রাক্টারের মাঠ, বাংলাবাজার ও আশপাশ এলাকায় শতাধিক অটোগ্যারেজ রয়েছে। এসব গ্যারেজে কমপক্ষে ২ হাজার অটোগাড়ি দিনরাত চার্জ দেওয়া হয়। রাস্তায় তিন শিফটে এসব গাড়ি চলে।
গ্যারেজগুলোতে বৈধ মিটার থাকলেও অবৈধ লাইন টেনে অটোগাড়ি চার্জ করা হয়। ফলে গ্যারেজের বৈধ মিটারে বিল আসে একেবারেই একটা টোকেন মানি। অটোগ্যারেজের বিদ্যুৎ চুরির খেসারত দিতে হয় আশপাশের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের। গ্যারেজে যতটুকু বিদ্যুৎ চুরি হয় তার অর্ধেকই ঐ মহল্লার সাধারণ গ্রাহকদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়। মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল নিয়ে এলেই গ্যারেজের মহাজন বিল বিতরণকারীর হাতে গুঁজে দেন মোটা অংকের টাকা। অটোগ্যারেজ মহাজন ও বিদ্যুৎ বিল বিতরণকারীর মধ্যে অলিখিত চুক্তি রয়েছে। ওদের চুক্তিতে জনগণের পকেট কাটা হচ্ছে। এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ ডিপিডিসির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হলেও বলেন, ‘আমরা নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে চলেছি।’
