ত্যাগ, একেশ্বরবাদে বিশ্বাস, আল্লাহভীতি, পারস্পরিক সৌহার্দ আর আনন্দের বার্তা লইয়া আসিয়াছে পবিত্র ঈদুল আজহা। এই ঈদের প্রধান দুইটি অনুষঙ্গ হইল পবিত্র হজ পালন ও পশু কোরবানি। এবার করোনা মহামারির পর বিপুলসংখ্যক তথা ২৫ লক্ষাধিক হাজি হজব্রত পালন করিতেছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ পৃথিবীব্যাপী মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে থাকিয়া ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ পশু কোরবানি করিতেছেন বা তাহারা প্রস্তুতি লইতেছেন। পশু কোরবানির বিষয়টি মানবজাতির আদিপুরুষ হজরত আদম (আ.)-এর পুত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিলের কোরবানির পর হইতেই চলিয়া আসিতেছে। সেই সূত্রে বিগত সকল উম্মতের উপর ইহা জারি ছিল। তবে আমাদের উপর যে কোরবানির নিয়ম নির্ধারিত হইয়াছে, তাহা মূলত হজরত ইবরাহিম (আ.) কর্তৃক শিশুপুত্র ইসমাইলকে (আ.) আল্লাহর রাহে কোরবানি দেওয়ার অনুসরণে ‘সুন্নাতে ইবরাহিমি’ হিসাবে চালু হইয়াছে। মক্কা নগরীর জনমানবহীন ‘মিনা’ প্রান্তরে আল্লাহর দুই আত্মনিবেদিত বান্দা ইবরাহিম ও ইসমাইল (আ.) আল্লাহর নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তুলনাহীন ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছিলেন, বর্ষপরম্পরায় তাহারই স্মৃতিচারণ হইতেছে ‘ঈদুল আজহা’ বা কোরবানির ঈদ। ‘কোরবানি’ শব্দের অর্থ ‘নৈকট্য’। কেননা কোরবানি দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল হয়।
স্নেহমমতায় ভরা এই জগত্সংসারে পিতার পক্ষে আপন পুত্রকে কোরবানি দেওয়া অসম্ভব এক অগ্নিপরীক্ষা; কিন্তু আল্লাহর নির্দেশ পাইয়া হজরত ইব্রাহিম (আ.) বিনা দ্বিধায় আপন পুত্রকে কোরবানি দিতে উদ্যত হইয়াই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মহান আল্লাহর নির্দেশে তাহার ছুরির নিচে প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-এর স্থলে কোরবানি হইয়া যায় একটি জান্নাতি দুম্বা। এই প্রতীকী ঘটনার অন্তর্নিহিত বাণী হইল স্রষ্টার প্রতি পরিপূর্ণ ও শর্তহীন আনুগত্য ও ত্যাগ স্বীকার। কোরবানি করিবার সময় আমরা পবিত্র কোরআনের এই বাণীটি পড়িয়া থাকি : ইন্না সলাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়াইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রব্বিল আলামিন। অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও মরণ সকল কিছু আল্লাহ রব্বুল আলামিনের জন্য। এই দোয়া পড়িয়া পশু কোরবানি করা হইলেও ইহার মর্মার্থ আমরা কত জন উপলব্ধি করি? উপলব্ধি করিতে পারি না বলিয়া অনেক সময় এই আধ্যাত্মিকতাকে ছাপাইয়া যায় বস্তুগত আনুষ্ঠানিকতা। মূলত সম্পদের মোহ, ভোগবিলাসের আকর্ষণ, সন্তানের স্নেহ, স্ত্রীর ভালোবাসা, সুনাম-খ্যাতি ইত্যাদি সকল কিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রতি আত্মসমর্পণ করাই হইল ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা। এই জন্য পবিত্র কুরআনে এরশাদ হইয়াছে যে, আল্লাহ তায়ালার নিকট কোরবানি করা পশুর রক্ত বা মাংস কিছুই পৌঁছায় না, শুধু পৌঁছায় বান্দার তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। কোরবানির এই ত্যাগের শিক্ষা যেমন অতুলনীয়, তেমনি চির অনুকরণীয়।
উল্লেখ্য, পুত্রকে কোরবানি করাটাই হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ইমানের একমাত্র পরীক্ষা ছিল না। তাহাকে অত্যাচারী শাসক নমরুদ জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডেও নিক্ষেপ করিয়াছিল। আল্লাহর অসীম কুদরতে তিনি সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় পরিত্রাণ লাভ করেন। হজরত মুসাকেও (আ.) আল্লাহ তায়ালা জালিম শাসক ফেরাউনের নানা অত্যাচার ও নির্যাতনের মুখোমুখি করিয়া পরীক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন। ফেরাউন নিজেকে খোদাও দাবি করিয়াছিল। রাসুলুল্লাহর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসেনের পরীক্ষাও ছিল কঠিন। সেই সকল অত্যাচারী শাসক নমরুদ, ফেরাউন ও ইয়াজিদ আজ নাই; কিন্তু তাহাদের দোসররা আজও রহিয়াছে এবং একই পরিণতি ভোগ করিতেছে। যুগে যুগে জালিম শাসকরা ঠিকই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। দুঃখজনক হইল, মহান ব্যক্তিদের ত্যাগতীতিক্ষা যেমন, তেমনি ইতিহাসের খলনায়কদের করুণ পরিণতি হইতেও আমরা অনেকে শিক্ষা গ্রহণ করি না। সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীনদের কারণে যেই সকল অঘটন ঘটিতে থাকে, সেখানে জনগণ তাহা প্রতিরোধ করিতে পারে কি না, তাহার পরীক্ষা লওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত জনশক্তির নিকট অত্যাচারী শাসকদের পরাজয় হয়।
পবিত্র ঈদুল আজহার দিন বিপুলসংখ্যক পশু কোরবানি করা হয়। এই জন্য আমাদের চারিপার্শ্বের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখিবার ব্যাপারে আমাদের প্রত্যেককে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করিতে হইবে। কেননা পবিত্রতা হইল ইমানের অঙ্গ। ইহা ছাড়া কোরবানির পশু যেমন, তেমনি ইহার চামড়া ক্রয়বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও সততা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করিতে হইবে। পবিত্র ঈদুল আজহার ত্যাগের শিক্ষায় আমাদের জীবন উদ্ভাসিত হউক, ইহাই আমাদের একান্ত কামনা। ইহার সহিত সকলের ঈদযাত্রা ও কর্মস্থলে প্রত্যাবর্তন নিরাপদ ও নির্ঝঞ্ঝাট হউক। সকলকে জানাই পবিত্র ঈদুল আজহার অনাবিল শুভেচ্ছা—ঈদ মোবারক।
