ভাড়া নৈরাজ্যের মধ্যে ঘরমুখী মানুষ

আপডেট : ২৮ জুন ২০২৩, ০৬:০২

রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে ঘরমুখী মানুষ। সরকারি ছুটি শুরু হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার থেকে। এর আগে থেকেই সোমবার অফিসে হাজিরা দিয়েই অনেকে ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন। প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছাড়ছে। রাজধানীতে যানজট, দূরপাল্লার বাস, ফেরিতে গাদাগাদি করে যাত্রীদের পারাপার হতে হচ্ছে। এছাড়া চলছে সড়ক ও নৌপথের বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ। আন্তঃজেলা পরিবহনের বিভিন্ন পথে বিভিন্ন শ্রেণির পরিবহনে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি।

এর পরেও রয়েছে প্রচণ্ড দাবদাহ ও বৃষ্টি। গাদাগাদি করে যাতায়াত করলে তাপদাহের কারণে হতে পারে মৃত্যুও। এমন ঝুঁকি আর দুর্ভোগ-ভোগান্তি মাথায় নিয়েই ঢাকা ছাড়ছে হাজার হাজার মানুষ। আর এই সুযোগে বিভিন্ন পরিবহনে ও লঞ্চে  কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্যের অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির নেতৃবৃন্দ। দ্রুত ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিআরটিএ, জেলা প্রশাসনের ভ্রামমাণ আদালতের তত্পরতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, এবারের ঈদে যানজট ও জনজট নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশংসনীয় তত্পরতা লক্ষ করা গেলেও ঈদযাত্রায় বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের পথে বিভিন্ন রুটে গতকাল থেকে যাত্রাভেদে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছিল। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে এই ভাড়া আরো বাড়তি আদায় করা হচ্ছে।

তিনি জানান, চট্টগ্রাম থেকে ভোলা, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীসহ উত্তরবঙ্গের পথে যাত্রীপ্রতি দিগুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা থেকে ফেনীর যাত্রীদের চট্টগ্রামের ভাড়া, ঢাকা থেকে সাতকানিয়া বা আমিরাবাদের যাত্রীদের কক্সবাজারের ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ঠিক তেমনি ঢাকা থেকে বগুড়ার যাত্রীদের যশোরের ভাড়া বা সাতক্ষীরার ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এভাবে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের বেশি দূরত্বের ভাড়া গুনতে হচ্ছে। নৌপথেও কূটকৌশলের ফাঁদে ফেলে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। জুলুম ভাড়া নৈরাজ্য চললেও ভাড়া নৈরাজ্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের তেমন কোনো তত্পরতা দেখা যাচ্ছে না।

তিনি ঈদযাত্রায় যাত্রীসাধারণের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধে বিআরটিএ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসনের ভ্রমমাণ আদালতের তত্পরতা বাড়ানোর দাবি জানান। তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে এখনো টিকিট অব্যবস্থাপনা, টিকিট কালোবাজারি, অপরিকল্পিত যানবাহন ব্যবস্থাপনাসহ নানা ক্ষেত্রে ঈদ ব্যবস্থাপনায় গলদ থাকায় যাত্রীরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছে। এসব ভাড়া নৈরাজ্য প্রতিরোধে বিআরটিএ ও বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে প্রতি বছর ঈদে গতানুগতিক পদ্ধতিতে ভিজিল্যান্স টিম বা মনিটরিং কমিটি গঠন করা হলেও প্রকৃতপক্ষে কোথাও তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ভাড়া নৈরাজ্য প্রতিরোধের পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান মোজাম্মেল হক।

দূরপাল্লার বিশেষ সার্ভিসের বাস চালু না হলেও বিকল্প উপায়ে চার-পাঁচগুণ বেশি টাকা খরচ করে ঢাকা ছেড়েছে ঘরমুখী মানুষ। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে যাত্রীর জন্য মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। রামপুরা, বাড্ডা, চিটাগং রোড, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, আমিনবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা এমনকি ট্রাক ও পিকআপে করেও যাত্রী নিতে দেখা গেছে। এ ছাড়া ভেঙে ভেঙেও বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেছেন অনেকেই। তাছাড়া জরুরি যানবাহান পরিবহনের জন্য চালু থাকা ফেরিতে গাদাগাদি করে নদী পার হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। তবে সদরঘাটের নৌপথ চলাচল ছিল স্বাভাবিক। ঈদ ঘিরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানবাহন ও ঘরমুখী যাত্রীর চাপ বেড়েছে। ফলে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ অংশে কাঁচপুর এলাকায় ১০ কিলোমিটার সড়কে তীব্র যানজট দেখা গেছে।

স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে ছুটির আগে বাড়ির দিকে ছুটছেন অনেকে। এতে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়ছে। গতকাল সকাল থেকে সিরাজগঞ্জের মহাসড়ক ও টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। সিরাজগঞ্জের মহাসড়কে বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম থেকে হাটিকুমরুল গোলচত্বর পর্যন্ত মহাসড়ক ঘুরে দেখা গেছে, সকালের দিকে রাস্তা অনেকটা ফাঁকা থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বাড়তে থাকে। দূরপাল্লার বাস ও ট্রাকের পাশাপাশি বাড়ছে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার। এদিকে যানজটমুক্ত ও মহাসড়ক নিরাপদ রাখতে জেলা পুলিশ, জেলা ট্রাফিক বিভাগ ও হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সকাল ৬টা থেকে প্রায় ৮০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ৪৫ কিলোমিটার মহাসড়কে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তার পরেও ভোর থেকে যানবাহনের চাপে টাঙ্গাইলের বঙ্গবন্ধু সেতু থেকে কালিহাতীর এলেঙ্গা পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। পরে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক হয়ে যায়। বর্তমানে যানজট নেই, তবে রয়েছে যানবাহনের চাপ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ১০ কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

ইত্তেফাক/ইআ