দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। ২০১৮ সালের চেয়ে এবার ডেঙ্গুর ধরন ভয়ংকর। আক্রান্তদের বেশির ভাগই শক সিনড্রোমে (সিভিয়ার) চলে যাচ্ছে। গত দুই দশকের মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল ২০১৮ সালে। ঐ বছরও শক সিনড্রোমে বেশি মৃত্যু হয়েছিল। তবে এবার কেন রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গুর শক সিনড্রোম বেশি দেখা যাচ্ছে জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে চার জনের মৃত্যু হয়েছে। এবার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই ফুসফুস, মস্তিষ্ক, লিভার ও হার্টের জটিলতায় ভুগছেন। এর ফলে দেখা যায় আক্রান্তের পাঁচ দিন পর রোগী যখন মনে করে সে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে তখনই তাদের অবস্থা আবার খারাপ হচ্ছে। জ্বর যখনই কমে আসছে, রোগীর রক্তচাপও কমে যাচ্ছে।
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন আছে। ডেনভি-১, ডেনভি-২, ডেনভি-৩ ও ডেনভি-৪। এবার ডেনভি-৩-এর প্রকোপ বেশি। এর উপসর্গ ও জটিলতা অনেক বেশি মারাত্মক। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই শক সিনড্রোমে।
অতি সম্প্রতি সচিবালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার শিশু সন্তান ডেঙ্গুর শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। শিশুটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় প্রথমে সুস্থ হয়। এরপর আবার অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। চিকিৎসকরা পরীক্ষানিরীক্ষা করে দেখেন ঐ শিশু কোভিডেও আক্রান্ত ছিল। ডেঙ্গু ভাইরাসের পিক টাইম আগস্ট-সেপ্টেম্বরে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেন, ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের উপসর্গ হলো শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়া কিংবা শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া। ত্বক শীতল হয়ে যাওয়া। ত্বকের ভেতরের অংশে রক্তক্ষরণের কারণে ত্বকের ওপর লাল ছোপ সৃষ্টি হওয়া। বমি, মল কিংবা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, প্রচণ্ড পেটব্যথা ও অনবরত বমি হওয়া, নাক ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ ও অবসাদ। শিশু-বৃদ্ধদের মধ্যে যারা দ্বিতীয় বার আক্রান্ত হচ্ছেন কিংবা কিডনি রোগে আক্রান্ত, ডায়াবেটিস, হার্ট, লিভারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত তারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে মৃত্যুঝুঁকি বেশি। আরো বিপজ্জনক তথ্য হলো, এবার কোভিড ও ডেঙ্গুতে একসঙ্গে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।
চলতি বছর এডিসের শিকার অধিকাংশই দ্বিতীয় বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত, তাই জটিলতাও বেশি। সঙ্গে আবার অনেকে কোভিডে আক্রান্ত। এ অবস্থায় স্বতঃপ্রণোদিত চিকিৎসা বা ওষুধ সেবন না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশে প্রথম ডেঙ্গু ছড়ায় ২০০০ সালে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করে ২০১৮ সালে। শিক্ষার্থীরা আক্রান্তের ঝুঁকিতে রয়েছেন জানিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন, ঈদের ছুটি শেষে সামনে স্কুল-কলেজ খুলবে। একটানা গত পাঁচ দিন বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলে এডিস মশা ডিম পাড়ে। তাই বন্ধ স্কুল-কলেজ খোলার কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টা আগে বাথরুম ও ক্লাস রুমসহ পুরো শিক্ষাঙ্গন এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। মশার লার্ভা পরিষ্কার করতে হবে। মশা মারার ওষুধ দিয়ে মশা নিধন করতে হবে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে গত ১৫ দিনে ৬০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এই বিভাগে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার চালু রয়েছে। একই সঙ্গে কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের জন্যও রয়েছে আলাদা কর্নার। শিশুদের জন্য আলাদা আইসিইউ রয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা শামসাদ বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত শিশুদের বেশির ভাগ শকে চলে যাচ্ছে। এ হাসপাতালে কোভিড ও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কর্নারে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে চিকিৎসকদের টিম ২৪ ঘণ্টা এসব রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’ তিনি আরো বলেন, কাঁপুনি জ্বরের সঙ্গে শিশুদের সর্দি-কাশি হলে যেন কোভিড পরীক্ষা করা হয়। ডেঙ্গুতে যেন আক্রান্ত না বাড়ে সেজন্য অভিভাবকদের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। সামনে স্কুল-কলেজ খুলবে। কমপক্ষে দুই দিন আগে স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গণ পুরোপুরি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। বাসাবাড়িও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। শিশুদের রাতের বেলার পাশাপাশি দিনের বেলায়ও মশারিতে রাখতে হবে। যারা ডেঙ্গুতে একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছেন, সঙ্গে কোভিডে আক্রান্ত হলে ঝুঁকির মাত্রা বেশি বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এমিরেটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ‘অনেকে ডেঙ্গু ও করোনা দুটিতেই আক্রান্ত হচ্ছেন। শিশুদের সর্দি-কাশি হলেই দুটিই পরীক্ষা করতে হবে। শিশু, গর্ভবতী মা, বয়স্ক মানুষ এবং যারা বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি। জ্বর হলে শুধু প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেতে হবে। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আরো বলেন, ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে সবার সচেতন হতে হবে। বাসাবাড়ি ও এর আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। নইলে এবার ডেঙ্গু ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে জ্বর হলে গাফিলতি না করার পরামর্শ দেন তিনি।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, রাজধানীসহ সারা দেশ থেকে সব বয়সি ডেঙ্গু রোগী আসছে। বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে ১২৫ জন ভর্তি আছেন। এর বেশি ডেঙ্গু রোগী এলে হাসপাতালের ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১০৪ জন রোগী। প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে শিশুরা আসছে। অন্য বছরের তুলনায় এবার আক্রান্তের হার বেশি। ডেঙ্গুর সঙ্গে কোভিডেও আক্রান্ত রয়েছে অনেকে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. খলিলুর রহমান বলেন, বর্তমানে এই হাসপাতালে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন আছেন। শিশুরাই বেশি। কেউ কেউ ডেঙ্গু ও কোভিড—দুটিতেই আক্রান্ত। এ জন্য উপসর্গ দেখা মাত্রই তিনি সবাইকে কোভিড পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন।
এক দিনে চার মৃত্যু :রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত (এক দিনে) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরো ৪৩৬ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৭৪ জন, আর ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ২৬২ জন। এই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরো চার জনের মৃত্যু হয়েছে। সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম এ তথ্য জানায়।
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট ১ হাজার ৫৩১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন আছে। ঢাকার ৫৩টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ১ হাজার ২২ জন এবং অন্যান্য বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫০৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছে। চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ১৯৩ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গতকাল পর্যন্ত ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
