জীবিকার সংগ্রামে জীবন যখন গৌণ। দুমুঠো ভাত, মাথা গোঁজার ঠাই কিংবা স্ত্রী সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য মানুষকে নানা রকম প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়। তেমনি বাস্তবতার আলোকে ভোলার বোরহানউদ্দিনের রহমান বদ্দার ১৬ জন মাঝি-মাল্লা নিয়ে মাছ ধরতে গিয়ে প্রায় ৭ দিন উত্তাল বঙ্গোপসাগরে যুদ্ধ করতে হয়েছে।
সরেজমিনে মঙ্গলবার (৪ জুলাই) দুপুরে গংগাপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তেতুঁলিয়ার উপকূলে তাদের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। ইত্তেফাককে তারা জানান সাগরের ভয়াবহতার সেই ৭ দিনের অভিজ্ঞতা।
জেলে রহমান বদ্দার জানান, ২৬ জুন রোববার ১৬ জন মাঝিমাল্লা নিয়ে চরমন্তাজ এলাকা হয়ে সোনার চর দিয়ে ইলিশ শিকারের উদ্দেশ্যে বঙ্গোপসাগরে অভিমুখে যাত্রা করেন। সারারাত বোট চালিয়ে শেষ রাতের দিকে জাল ( ক্ষেপ) ফেলেন। সমুদ্র তখন বেশ শান্ত ছিলে। কিছুক্ষণ পরে শুরু হলো ঝড়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই উত্তাল হয়ে উঠল সমুদ্র। ক্রমেই রুদ্র রূপ ধারণ করতে লাগলো। সিদ্ধান্ত নেই ফিরে আসার। বিধাতা ও যেন খেপে উঠলো। হঠাৎ বিকল হয়ে যায় বোটের মেশিন। চোখে-মুখে কিছু দেখছি না। কি করব? মাথায় যেন কাজ করছে না। সঙ্গে থাকা জেলেরা হায় হুতাশ শুরু করলো। সবাই আল্লাবিল্লা করছি। বোটে থাকা অতিরিক্ত ছোট মেশিনটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করলাম। সেটাও কাজ করছে না। ভাবলাম সাগর হবে হয়তোবা শেষ ঠিকানা! কেউ কেউ চিৎকার শুরু করলো। মনের সামনে ভেসে উঠলো স্ত্রী, ছোট ছোট সন্তান আর বাবা মায়ের কথা। সবার আশা ছেড়ে দিলাম। কারো সাহায্য চাইবো সেই সুযোগও নেই। আল্লার ওপর ভরশা করে জীবনের মায়া ত্যাগ করলাম। সমুদ্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। হঠাৎ আল্লাহ যেন ফেরেশতা পাঠালেন। দূর থেকে দেখি দুটো বোট আসছে। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর এলাকার তারা। আমাদের দুর্দশা দেখে, ওদের একজন ফিটার (মিস্ত্রি) আমার বোটে উঠেন।অনেকক্ষণ চেষ্টার পর ছোট মেশিনটি সচল করতে সক্ষম হন। মনে একটু সাহস আইলো। আল্লাকে ধন্যবাদ দিলাম। শুরু হলো বেঁচে থাকার তাগিদের জন্য যুদ্ধ। ঢেউয়ের অনুকূলে আস্তে আস্তে চলতে থাকল আমাদের বোট। ২৮ জুন থেকে এভাবে চলতে থাকল। ছোট ইঞ্জিন গতি কম। দিন যেন যাচ্ছে না। ২৮ জুন থেকে ২ জুলাই একইভাবে চললাম। হঠাৎ মোবাইল স্ক্রিনে দেখলাম নেটওয়ার্ক শো করছে। কান্নাকাটির জন্য ঠিকমতো কথা বলতে পারছিলাম না। অবশেষে বাড়িতে স্বজনদের জানালাম আমরা সবাই জীবিত ও নিরাপদ আছি। ৩ জুন আমরা চরফ্যাশন উপজেলার স্বামরাজঘাটে আসি। ওখান থেকে সড়ক যোগে সবাই রাতে বোরহানউদ্দিন আমাদের বাড়িতে আসি।’ ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের সময়ও এ রকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন তারা। তবে ওইবার বোট ফেলে রেখে অন্য বোট দিয়ে নিরাপদে আসেন।
একই ওয়ার্ডের উদ্ধার হওয়া অপর জেলে আক্তার হোসেন বলেন, এই স্মৃতি ভুলবার নয়। কিংবা বলে বুঝানো সম্ভব নয়। বেঁচে আসতে পারব এ চিন্তাও করিনি। এক মাস আগে আমার ছোট ছেলেটি মারা যায়। মা মারা যায় এর কিছুদিন পূর্বে। বাড়িতে আমার স্ত্রী ও একমাত্র ছোট ছেলেটি ছিল। আমার শ্বশুর-শাশুড়িও নেই। ওই সময় মনে পড়ল, আমি যদি ফিরে না যেতে পারি আমার স্ত্রী ও মেয়েটির কী হবে? শুধু আল্লাহ আল্লাহ করছি। তিনিই তো সবকিছুর মালিক। আমাদের আরেক বার জীবন দিয়েছেন তিনি।
নৌকার মাঝি আব্বাস জানান, এ রকম পরিস্থিতিতে আল্লাহ যেন আর কাউকে না ফেলে। আসলে মাছ ধরা ছাড়া আমরা চলবো কীভাবে? ইচ্ছা করে কেউ কী আর এ রকম পরিস্থিতিতে পড়ে? সংসার চালানোর জন্য আর ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের জন্য সবকিছু জেনেও নদীতে মাছ শিকারে যায়। বিকল্প কোনো কাজ করার তো সামর্থ্য আর আমাদের নাই।
জেলে হাসান, নেছার, আলামিন, মান্না, কুট্টি হাবু অভিন্ন কথা বলেন। তারা আরও জানান, নিখোঁজ ১৬ জন জেলে উদ্ধার হয়েছে। তারা সবাই ভালো আছে। যার যার বাড়িতে আছে।
বৈরী আবহাওয়ায় বঙ্গোপসাগরে জেলে কিংবা ট্রলার সনাক্ত করে তাদের নিরাপত্তা দিতে মাছ ধরার ট্রলারে গ্লোবাল সিস্টেম মনিটরিং বা জিএসএম ডিভাইস এই প্রসঙ্গে জেলেরা বলেন, এটার ক্ষমতা (ফ্রিকোয়েন্সি) খুবই কম। এটা ছোট ছোট নৌকার জন্য প্রযোজ্য।
উপজেলার সামুদ্রিক মৎস্য কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, এ প্রকল্প প্রাথমিকভাবে চালু হয়েছে। এখানে ৯৬টি ডিভাইজ বিতরণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কার্যক্রম আরও প্রসারিত হতে পারে।
