বিশ্ববিবেকের প্রতি প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও দার্শনিক থমাস জেফারসনের সংক্ষুব্ধময় আবেদন ছিল—‘অন্যায়-অনিয়ম যখন আইন হইয়া উঠে, সেই মুহূর্তে প্রতিরোধ করাটাই দায়িত্ব ও কতর্ব্যের অংশে পরিণত হয়।’ বাস্তবিক অর্থেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমরা যেই সকল ঘটনার ঘনঘটা দেখিতে পাইতেছি, তাহাতে ‘প্রতিবাদ-প্রতিরোধ’ অনিবার্য কর্তব্য হইয়া পড়িতেছে। কুড়াল হাতে ইউএনওর গাড়িচালককে ধাওয়া করিতে করিতে রাজনৈতিক দলের নেতা-সমর্থকদের নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলা পরিষদ ভবনে ঢুকিয়া পড়িবার একটি ভিডিও ছড়াইয়া পড়িতে দেখা গিয়াছে অতি সম্প্রতি। এই ঘটনাকে কি স্বাভাবিক ও তুচ্ছ করিয়া দেখিবার কোনো সুযোগ আছে? পিছনের ঘটনা যাহাই হউক না কেন, ইহা কোনোভাবেই আইনসিদ্ধ কাজ হইতে পারে না। এই সাহস ও ঔদ্ধত্য তাহারা পাইতেছে কোথা হইতে? তাহারা ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙাইয়া যাহা খুশি তাহা করিলে এই দেশে আইনের শাসন কায়েম হইবে কীভাবে? এইরূপে ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নেতাকর্মীকে যেইভাবে মারমুখী আচরণ করিতে দেখা যাইতেছে, রাজনৈতিক বিষয় লইয়া স্পর্শকাতর-অনাকাঙ্ক্ষিত কথাবার্তা বলিতে শুনা যাইতেছে, তাহার পরিপ্রেক্ষিতে বলিতেই হয়, ইহা সরকারের জন্য কেবল ক্ষতিই ডাকিয়া আনিবে। তাহাদের এখনই প্রতিরোধ করিতে না পারিলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজ ও রাজনীতির পরিবেশ বিনষ্ট হইবে নিঃসন্দেহে।
আজ দেশের রাজনীতিতে বিরাজ করিতেছে থমথমে অবস্থা। বিরোধী দলগুলি সুষ্ঠু নির্বাচন দাবি করিতেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়া চলিয়াছেন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে এই সকল ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ মানিয়া নেওয়া যায় না। যাহারা বলিতেছেন, নৌকা মার্কা পাইয়া গেলে আবার ইলেকশন কীসের, তাহাদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হইতেছে না? কেননা ইহাতে দেশ-বিদেশে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হইতেছে। ইহা প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিরও পরিপন্থি। সম্প্রতি দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার একটি পৌরসভা ও একটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনকে কেন্দ্র করিয়া যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা অনাকাঙ্ক্ষিত। তপশিল ঘোষণার পরও মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলা দিয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নেতাকর্মীদের অযথা হয়রানি ও নির্যাতন করা হইতেছে। প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হইতেছে। তথ্য-উপাত্ত হাজির করিয়া আমরা বারংবার বলিতেছি, এই গোষ্ঠীটি ক্ষমতাসীন দলে রাতারাতি নাম লিখিয়াছে কেবল দলটির বদনাম করিবার জন্য। তাহাদের কাজকর্ম দলের জন্য আত্মঘাতীস্বরূপ। তাহারা রাজাকার-আলবদর-আলশামসের উত্তরসূরি। এই সমস্ত দুষ্কৃতকারী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ‘স্টিকার’ গায়ে চড়াইয়া খেয়ালখুশিমতো যাহা ইচ্ছা তাহা বলিলে এবং নানা অন্যায়-অপকর্ম করিয়া চলিলে তাহার পরিণাম কখনোই শুভ হইবে না। ‘আমি সরকারি দল করি বিধায় প্রশাসন, আইন ও বিচার আমার কাছ থেকে ২০ হাত দূরে থাকবে’—তাহাদের এমন মনোভাব বিপজ্জনক। অথচ আইনের শাসনকে পাশ কাটাইয়া অপকর্ম করিয়া পার পাইয়া যাওয়া কি এতটাই সোজা? রাষ্ট্রযন্ত্র কি এতটাই দুর্বল?
প্রশ্ন হইল, তাহাদের দৌরাত্ম্য না কমিয়া বরং ক্রমশ বাড়িতেছে কেন? বস্তুত, দল ও প্রশাসনের ভিতরে ঘাপটি মারিয়া থাকা একশ্রেণির অসাধু লোক ও কর্মকর্তা তাহাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও ইন্ধন দিতেছেন! এবং সম্ভবত সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত এই সকল খবর ক্ষেত্রবিশেষে পৌঁছাইতেছে না। আরো দুঃখজনক কথা হইল, এই সকল রাজনৈতিক নামধারী দুষ্কৃতকারীর বিরুদ্ধে আইনের দ্বারস্থ হইলেও শেলটারদাতার হস্তক্ষেপ কিংবা অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ধামাচাপা পড়িয়া যাইতেছে আসল ঘটনা। তাহা না হইলে, নির্বাচনের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রতীক লইয়া অশালীন গলাবাজি করিয়াও তাহারা পার পাইয়া যাইতেছে কী প্রকারে? এই সকল অনুপ্রবেশকারী সুবিধাবাদীর দল প্রায়শ বলিয়া থাকে ‘ম্যাজিক’ আছে, ‘খবর’ আছে। কী সেই খবর, কীসের ম্যাজিক দেখাইবার কথা বলিতেছেন তাহারা?
মোদ্দা কথা, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল যদি নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী নেতাকর্মীকে শাস্তির আওতায় আনিতে ব্যর্থ হয় কিংবা পাশ কাটাইয়া যাইবার চেষ্টা করে, তবে তাহার ‘ফল’ ভোগ করিতে হইবে সেই দলকেই। সুতরাং অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করিয়া আইন হাতে তুলিয়া লওয়া অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধই আজ প্রধান কর্তব্য হইয়া উঠিয়াছে।
