কোটিপতি হওয়ার প্রবণতা ও সমাজে অবক্ষয়

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৩, ০০:৩২

দৈনিক ইত্তেফাকের ১৪ জুনের একটি খবরের শিরোনাম হচ্ছে :‘বিদেশে অর্থ পাচারে শীর্ষে আমলারা।’ খবরের ভেতরে বলা হয়েছে, বিদেশে সম্পদ আছে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ কিনেছেন এমন ব্যক্তিদের গোয়েন্দা তালিকায় বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আছেন। মূলত বিগত তিন দশকে দেশে একশ্রেণির লোক নিজেদের অবস্থান, পদ বা অর্পিত ক্ষমতার সক্রিয় অপব্যবহারের মাধ্যমে পাঁচ-দশ বছরের মধ্যে কোটি, হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তাদের অর্থবিত্তের পরিমাণ এতটাই, যা দিয়ে তাদের ১৪তম রক্তধারা প্রজন্মও দেশে-বিদেশে রাজপুত্র-রাজকন্যার মতো বেঁচে থাকতে পারবেন। যার যতটুকু অবস্থান ও ক্ষমতা ততটুকুর অসৎ ও অসাধু ব্যবহার করে শত কোটি ও হাজার কোটি টাকার মালিক হওয়ার অর্থই হলো ক্ষুদ্র সম্পদ ও অর্থের মালিকদের ‘ক্ষুদ্র অবস্থান’ হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। এভাবে এক জনের কোটিপতি হওয়ার পেছনে থাকে ১০০ জনের দরিদ্র, হতদরিদ্র হওয়ার বেদনার ইতিহাস।

এ প্রক্রিয়ায় যারা কোটিপতি হয়েছেন, তাদের ‘অমানুষ’ বলে না-হয় ছেড়ে দেওয়া গেল; কিন্তু যাদের মানুষ শ্রদ্ধা করে, দেখলে মাথা নত করে, তারা যখন একইভাবে কোটিপতি হওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত থাকেন, তখন হাহাকার করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। এ সমাজে ডাক্তারদের একাংশ যেভাবে রোগী পিষে কোটিপতি হচ্ছেন, তা ভাবলে স্থির থাকা কষ্টকর। ১৮ জুন ২০২৩ ইত্তেফাকের শিরোনাম :‘টাকার লোভে মহামারিতে রূপ নিয়েছে সিজার ডেলিভারি।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে বাংলাদেশের তিন দশমিক তিন শতাংশ, অর্থাত্ প্রায় সাড়ে ৫২ লাখ মানুষ চিকিত্সাব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতি বছর নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। কাকে ভালো বলব কিংবা কাকে ভরসার জায়গায় দাঁড় করিয়ে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়বে জনগণ। শিক্ষক হলেন জাতি গড়ার কারিগর, কিন্তু তাদের লক্ষ্যও দ্রুত কোটিপতি হওয়া। ৯-১১-২০১৯ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২তম সমাবর্তনে এসে রাষ্ট্রপতি ও আচার্য (প্রাক্তন) আবদুল হামিদ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্য ও ডিপ্লোমা কোর্সের কঠোর সমালোচনা করে তা বাতিলের অনুরোধ করেন। এরপরে ১৫-১২-২০১৯ তারিখের ইত্তেফাকের শিরোনাম :‘দুই প্রতিষ্ঠানে বন্ধ ঘোষণা বাকিরা সিদ্ধান্তহীনতায়।’ ২৬-০২-২০ তারিখের ইত্তেফাকের শিরোনাম :‘বন্ধের সম্ভাবনা নেই ঢাবির সান্ধ্যকালীন কোর্স, নেপথ্যে ৬৮৫ শিক্ষকের আর্থিক স্বার্থ।’ এর বাইরে রয়েছেন বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, গ্রামে জন্ম হওয়া বখাটে জীবন থেকে উত্তরোত্তর পদোন্নতিপ্রাপ্ত প্রতিপত্তিশালী একশ্রেণির নেতা, পাতি নেতা। সংশ্লিষ্ট জনপদে এসব নেতা, পাতি নেতারা আবির্ভূত হয়েছেন একেবারে রুদ্ররূপে। তারা কোটিপতি হওয়ার জন্য বেছে নিয়েছেন চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভূমিদস্যুতা, সরকারি সম্পত্তি কিংবা নদীনালা, খালবিল দখল। ক্ষেত্র বিশেষে মাদকব্যবসা কিংবা মানবপাচার। এজন্য তাদের দরকার আধিপত্য বিস্তার করে সংশ্লিষ্ট জনপদকে প্রকারান্তরে অধিকৃত অঞ্চলে পরিণত করা  এবং তা করার জন্য কারোর হাত-পা ভেঙে দেওয়ার প্রয়োজন হলে, তারা তা করছেন।  

কেউ প্রতিপক্ষ, প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ালে তাকে খুন করতেও তারা দ্বিধাবোধ করছেন না। তাদের বিরুদ্ধে টু শব্দটি উচ্চারণ করবে এমন দুঃসাহস সংশ্লিষ্ট জনপদে কারোর নেই। কোনো পরিবারের কোনো সদস্য কিংবা আত্মীয়স্বজনের কেউ সিভিল, পুলিশ কিংবা আর্মি প্রশাসনে চাকরি না করলে সংশ্লিষ্ট জনপদের  প্রত্যেকটি মানুষকে প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু হারানোর ভয় নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। 

২০২৩-২০১৪ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতা, উপকারভোগীদের সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, বিধবা ভাতার পরিমাণ ৫০০ টাকা থেকে ৫৫০ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু ভাতাপ্রাপ্ত বিধবা মহিলাটিকে যদি গণধর্ষণের শিকার হয়ে বিচার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়, কিংবা ভাতাপ্রাপ্ত জেলে মানুষটিকে যদি নদীতে জাল পাততে গিয়ে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয় বা বড় মাছটি নেতার বাড়িতে পৌঁছে দিতে হয়, তাহলে প্রাপ্ত ভাতা কী কোনো উপকারে আসে?

উল্লিখিত চাঁদাবাজ, দখলবাজ, মাদক ব্যবসায়ী কিংবা দুর্নীতিবাজদের মধ্যে দুই-চারজন মাঝেমধ্যে যে ধরা পড়েন না বা শাস্তি পান না, তা কিন্তু নয়। তবে যে সংখ্যায় ধরা পড়েন, শাস্তি পান না তার ১০ ভাগের একভাগও। এই ১০জনের মধ্যে ৯ জন কোনো না কোনোভাবে ছাড়া পাওয়ার কারণে দুর্নীতিবাজ নব্বই জনের মনে কোনো ভীতির সঞ্চার ঘটে না। দুর্নীতি দমন কমিশনে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বেরোনোর মুখে সাংবাদিকদের সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের অনেক দুর্নীতিবাজদের কথোপকথন শুনলে মনে হয়, তারা এখানে এসেছিলেন ব্রেকফাস্ট কিংবা লাঞ্চ সারতে। বিন্দুমাত্র লজ্জাবোধের  ছাপ তাদের চোখেমুখে দেখা যায় না। শীর্ষ পর্যায়ে যখন এই পচন-অবস্থা তখন চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, দখলবাজদের দোষ কোথায়?

তাই এভাবে অন্যায়-অনিয়মের মাধ্যমে ইতিমধ্যে যারা কোটি-হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে  রেখে অবক্ষয়শূন্য সমাজের কথা চিন্তা করে লাভ নেই। কারণ সমাজে ৮০ ভাগ অবক্ষয়ের মূলে রয়েছে রাষ্ট্রের শেকড় থেকে শিখর  পর্যায়ে একটা বেপরোয়া শ্রেণির নীতি-নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গলি প্রদর্শন করে কোটিপতি হওয়ার প্রবণতা।

লেখক : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ (অব.) 

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন