সামাজিক প্রতিহিংসার আদিম রূপ!

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৩, ০২:৩১

‘আমাদের ছোট গাঁয়ে ছোট ছোট ঘর,

থাকি সেথা সবে মিলে নাহি কেহ পর।...’

কবি বন্দে আলী মিয়া রচিত ‘আমাদের গ্রাম’ শিরোনামের এই কবিতা শৈশবে অনেকেরই পাঠ্য ছিল, বিশেষত যাদের স্কুলজীবনের রঙিন দিনগুলো অতিবাহিত হয়েছে গত শতাব্দীর শেষ কয়েক দশক নাগাদ। এটি গ্রামবাংলার পাখির নীড়ের মতো শান্তির এক প্রশান্ত ছবি। আজও পাঠমাত্র আমাদের মানশ্চক্ষে এক অপূর্ব সম্প্রীতিময় গ্রামবাংলার স্নিগ্ধ জীবনচিত্র তুলে ধরে। হোক সে আঠারো-উনিশ শতকের গ্রামবাংলা, কিংবা হোক সে বিশ শতকের বিভক্ত পূর্ববঙ্গ অথবা পশ্চিমবঙ্গ।

কিন্তু বাস্তবতা বড়ই নির্মম। আজ একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের মধ্যভাগও প্রায় অতিক্রান্ত হতে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও জ্ঞান-গরিমায় নতুন শতাব্দী আজ নতুন রূপে। কিন্তু আমাদের বাংলার মানুষের মূল্যবোধে নতুন শতাব্দীর নতুন আলোয় আদৌ কি কোনো ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে? সমাজের উপরিকাঠামোয় যতই চাকচিক্য থাকুক, ভেতরের কাঠামো যদি ঘুণপোকায় আক্রান্ত হয়, অশিক্ষা ও প্রতিহিংসার চর্চাই যদি সেখানে মুখ্য হয়, তাহলে সেই সমাজ যে কোনো মুহূর্তে ধসে পড়বে—এ কথা কে না জানে? ফলে সমাজে নানা রকম অসুস্থ প্রতিযোগিতা, অসহনশীলতা, প্রতিহিংসা, জিঘাংসা ব্যাপক মাত্রায় যে বেড়েছে, তা সমাজে সংঘটিত কিছু ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুধাবন করা যায়।

সমাজের এই প্রবণতাকে অনেক সমাজবিজ্ঞানী মধ্যযুগীয় বর্বরতা বলেও আখ্যায়িত করে থাকেন। কেউ কেউ প্রশ্ন করে বলেন, এসব কোথায় নেই? সারা পৃথিবীতেই আছে। কিন্তু গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে পালটা প্রশ্ন করা যায়, বাঙালি সমাজকে কি আরো নৈতিক, আরো মানবিক করে তোলা যায় না? উনিশ শতকের বাঙালি রেনেসাঁর পর বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-শিল্প, সমাজ-সংস্কৃতিতে বাঙালি সমাজের কি আরেকটা দুনিয়া কাঁপানো পুনর্জাগরণ ঘটানো যায় না? কিন্তু আজও আমাদের অনেকগুলো প্রাচীন-বর্বর সামাজিক আচরণ সমাজজীবনে জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে লালিত হচ্ছে। এসব দূর না করে বাঙালি জীবনে দ্বিতীয় রেনেসাঁ কখনোই সম্ভব নয় বলে সমাজচিন্তকদের একটি বৃহদংশ মনে করছে। যদিও প্রকৃত বিচারে আমাদের সমাজে সমাজচিন্তক ও সমাজবিজ্ঞানীর সংখ্যা হাতে গোনা।

এসব কথা বলা হলো যে জন্য, তার প্রেক্ষাপটে রয়েছে চট্টগ্রামে অতি সম্প্রতি সংঘটিত দুটি ঘটনা। ঘটনা দুটি এক অর্থে বাংলাদেশের সামাজিক অপরাধজগতে নতুন কিছু নয়। আজ থেকে দেড় শ-দুই শ বছর আগেও বৃহৎ বাংলায় এই দুর্বৃত্তপনার নজির ছিল বলে জানা যায় পুরোনো সংবাদপত্রের পাতা থেকে, এমনকি অনেক পুরোনো গল্প-উপন্যাসেও এর বিবরণ মেলে। পরদিন ঈদ উদযাপনের জন্য সবাই তখন ব্যস্ত। প্রথম বিষ প্রয়োগের ঘটনাটি ঘটে চট্টগ্রাম মহানগরীর অত্যন্ত জনবহুল এলাকা চান্দগাঁওয়ের বড় বাড়ি এলাকার এসএস ডেইরি ফার্মে। ফার্মের  জলাধারে চাষ করা মাছ ও হাঁস মরে ভেসে উঠেছে। ফার্ম মালিকের ধারণা হয়, প্রতিবেশী কেউ শত্রুতাবশত এ ঘটনা ঘটিয়েছে। এই বিষ প্রয়োগের ঘটনা রাতেই সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার বরমা ইউনিয়নের কেশুয়া গ্রামে। ধারণা করা হয়, ঈদের ব্যস্ততায় মানুষ যখন অন্যদিকে মনোযোগী, রাতের অন্ধকারে দুর্বৃত্তরা সেই সুযোগটাই নিয়েছে। ৪ জুলাই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হলো, ‘পুকুরে দুর্বৃত্তের দেওয়া বিষে তিন দিন ধরে মরছে মাছ।’ চট্টগ্রামে এরকম ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু আজ সাধারণ মানুষ তাদের স্বল্প অর্থের পুঁজি নিয়ে কিছু করে খেতে উদ্যোগী হতেও চাইছে না দুর্বৃত্তদের ভয়ে। দুর্বৃত্তরা কী চায়? উত্তর সহজ, তারা কোনো কিছু না করে আর্থিক সুবিধা চায় মাছচাষিদের কাছ থেকে। তাদের এই আর্থিক চাহিদাকে কেউ বলেন ‘চাঁদা’, আবার কেউ বলেন ‘সেয়ানা ট্যাক্স’। কিন্তু দুর্বৃত্তদের যে দাবি, তা মিটিয়ে মাছ চাষ করা স্বল্প আয়ের চাষিদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে দুর্বৃত্তরা কুপিত হয়ে মাছচাষিদের খামারে রাতের অন্ধকারে বিষ ঢালছে, যাতে পুকুরের সব মাছ হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে মাছচাষি বোঝে—চাঁদা না দিলে এভাবেই কপাল পুড়বে। এটাই নিয়তি যেন।

আবার পুকুরের ইজারা না পাওয়ার ক্ষোভ থেকেও এক চাষি তার প্রতিদ্বন্দ্বী চাষির পুকুরের ৩০-৪০ লাখ টাকার মাছ রাতের অন্ধকারে নিজে কিংবা দুর্বৃত্ত লেলিয়ে দিয়ে বিষ ঢেলে নিধন করেছে—এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রতিনিয়তই উঠছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সত্যি হলো, ঘটনা সবার জানা থাকলেও সাক্ষী-প্রমাণের অভাবে বিষ প্রয়োগকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এই পার পেয়ে যাওয়াটাই যেন উত্সাহিত করছে দুর্বৃত্তদের পরবর্তী ঘটনাগুলো ঘটানোর জন্য।

শুধু চট্টগ্রাম নয়, এর বাইরেও সাম্প্রতিক সময়সহ গত কয়েক বছরে সংঘটিত বিষ প্রয়োগের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে কারণও সেই একই। ইজারাসংক্রান্ত বিরোধ, চাঁদা না দেওয়া, পূর্বশত্রুতার জের ধরে জিঘাংসা, অন্যের আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনে ঈর্ষা এবং কখনো কখনো সামাজিক প্রতিপত্তি ও আধিপত্যের লড়াই। যেমন—গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ :২০২১ সালে নরসিংদীতে পুকুরে বিষ ঢেলে ১২ লাখ টাকার মাছ নিধন। ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সংবাদ, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের পুকুরে বিষ ঢেলে ক্ষুদ্র মাছচাষির বেঁচে থাকার স্বপ্ন বিনাশ।  ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সংবাদ, রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় পুকুরে বিষ ঢেলে দেওয়ার কারণে ৩লাখ টাকার মাছ মরে ভেসে ওঠে ইত্যাদি।

এসব ঘটনা থেকে এরকম প্রশ্নও ওঠে, মাছ নিধনের বিষ কি বাজারে খুবই সহজপ্রাপ্য? যদি সহজপ্রাপ্য হয়,তাহলে এর সহজপ্রাপ্যতা কমাতে নিশ্চয়ই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মাছ মারার একধরনের বিষের নাম ‘গ্যাস বড়ি’ এই গ্যাস বড়িটা আসলে কী এবং আরো কী কী বিষ প্রয়োগ করা হয়, তা জানা এবং সেগুলোর সহজলভ্যতা রোধ করা অতি জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এমনকি বিষের কারণে মরে যাওয়া বিপুল পরিমাণ মাছ নিরাপদ জায়গায় মাটি খুঁড়ে সেগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে কি না, সেদিকেও সবার নজর রাখা প্রয়োজন। কারণ বিষে মারা যাওয়া মাছ বাজারে তোলা জনস্বাস্ব্যের জন্য মারাত্মক—এই নৈতিক জ্ঞান স্বল্পশিক্ষিত মাছচাষি ও বিক্রেতার মধ্যে না-ও থাকতে পারে। এই বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার। দেশের সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে এবং মাছচাষিদের আর্থিক নিরাপত্তা বিধানে এই বিষ প্রয়োগের সংস্কৃতি যত দ্রুত বন্ধ করা যাবে, তত দ্রুত সাধারণ মানুষের কল্যাণ সাধিত হবে—এ কথায় কোনো ভুল নেই।

লেখক : সাংবাদিক, শিল্প সমালোচক, কবি-গল্পকার ও চিত্রশিল্পী

 

ইত্তেফাক/ইআ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন