ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটি আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। তাহারাও বাংলা ভাষাভাষী। ‘গণতন্ত্র’ বলিয়া একটা অদ্ভুত বিষয় চালু আছে এবং তাহারাও সেই ব্যবস্থার মধ্য দিয়া নির্বাচন করে। ৮ জুলাই পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছে এবং ১১ জুলাই মঙ্গলবার ছিল ভোট গণনার দিন। ভোট হইয়াছে জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতের। অর্থাৎ আমরা যাহাকে বলি স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ফলাফলে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসেরই জয় ঘটিয়াছে বিস্তর ব্যবধানে। এবং নির্বাচন ঘিরিয়া ঘটিয়াছে তুলকালাম কাণ্ড। নির্বাচনকে ঘিরিয়া সহিংসতায় নিহত হইয়াছে অন্তত ২০ জন।
একতরফা নহে, নিহতদের মধ্যে সকল বড় দলের কর্মী-সমর্থকই রহিয়াছে। খুনাখুনি, রক্তারক্তি, শক্তিপ্রয়োগ, ভোটারদের কেন্দ্রে যাইতে বাধা প্রদান—সকলই ঘটিয়াছে এই নির্বাচনে। বেদনাদায়ক তো বটেই। এই নির্বাচনে সহিংসতার অভিযোগ করিয়া সাড়ে ১০ হাজার বুথে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছে অন্যতম বিরোধী দল বিজেপি। মঙ্গলবার ফলাফল ঘোষণার দিনই নির্বাচন কমিশনের সামনে ‘ধন্না’য় বসিয়াছে। এমনকি ভোট গণনার এই দিনেও জেলায় জেলায় সহিংসতা ও অশান্তি বিরাজ করিতে দেখা গিয়াছে। নির্বাচনের এই সকল বৈশিষ্ট্যই আমাদের দেশেও বিদ্যমান; কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হইল, এই নির্বাচনের ফলাফল, নির্বাচন কমিশন অথবা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কোনো বিভাগ বা সংস্থার বিরুদ্ধে ব্যাপক পক্ষপাতিত্বের কোনো অভিযোগ নাই।
আমাদের দেশ এই দিক দিয়া আরো এক কাঠি আগাইয়া আছে। বাংলাদেশে কোনো বিভাগ নাই যাহার বিরুদ্ধে পক্ষপাত এবং অর্থকড়ির লেনদেনের অভিযোগ নাই। এই হীন স্বার্থে সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য এমনকি বিবেকও বিসর্জন দিতে দেখা যায়। আর এই সুযোগ গ্রহণ করিয়া থাকে রাজাকার-আলবদরের পরম্পরা। যাহারা স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর আজীবন বিরোধিতা করিয়া আসিয়োছে, তাহারাই আজ কাউকে খাটো করিতে, দোষারোপ করিতে বঙ্গবন্ধু ও তাহার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ব্যবহার করিতে সচেষ্ট থাকে। তুচ্ছ কারণে তাহারা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাঙিয়াছে বলিয়া মিথ্যা অভিযোগ তুলিয়া বঙ্গবন্ধুর অনুসারীদেরকেই হেনস্তা করিতে এতটুকু কার্পণ্য করিতেছে না। কে কাহাকে বুঝাইবে যে অন্যকে হেনস্তা করিতে বঙ্গবন্ধু ও তাহার কন্যার ছবি অপব্যবহার সরাসরি বঙ্গবন্ধু ও তাহার কন্যাকেই অপমান করার শামিল? এখন প্রশ্ন হইল, এই সকল খোলস পালটাইয়া ক্ষমতাসীন দলে ঢুকিয়া পড়া রাজাকার আলবদর বলিলেই যাহাদের দেখিবার দায়িত্ব, যাহাদের বিষয়টি লইয়া সিদ্ধান্ত দেওয়ার দায়িত্ব তাহারা শুনিবেন কেন? প্রয়োজনে কঠিন তদন্ত হওয়া দরকার। তদন্তে নিশ্চয়ই সত্য বাহির হইয়া আসিবার কথা। সেই অনুযায়ী যাহার যে শাস্তি পাওয়া উচিত সেই শাস্তি প্রদান করা যাইতে পারে; কিন্তু তাহার পূর্বে কোনো নাগরিককে হেনস্তা করা রীতিমতো অন্যায় ও অপরাধ! বাংলাদেশে নির্বাচনকালে এই ধরনের হেনস্তা করিবার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ইহা কেবল দুর্ভাগ্যজনকই নহে, আমাদের নিকট ইহাই প্রতীয়মান হয় যে দেশের সর্বাঙ্গই পচিয়া গিয়াছে। পূর্বে আমরা শুনিতাম পচন ধরে মাথা হইতে। এখন পচন কোন জায়গা হইতে শুরু হইবে তাহা বলা মুশকিল। তবে শরীরের যেই অংশ হইতেই পচন ধরুক, তাহার চিকিৎসা না হইলে সর্বাঙ্গ পচিবে ইহাই স্বাভাবিক। এখন আমাদের মনে হয়, ঔষধ প্রয়োগের জায়গাও নাই, চিকিৎসকও নাই! আমরা যতটুকু খোঁজখবর রাখি তাহা হইতে ইহা জানিতে পারি যে, পার্শ্ববর্তী দেশে রাজনৈতিক হানাহানি, আইনশৃঙ্খলাজনিত অবক্ষয় ঘটিলেও, সেইখানে সর্বাঙ্গে পচন ধরে নাই। অন্তত পচনের দিক হইতে আমরা আগাইয়া আছি।
