পাহাড়ে ফলের সম্ভার

দেশের মোট ফল উৎপাদনের ১৫ শতাংশ আসছে পার্বত্য জেলা থেকে

আমেরিকান পামলার, রেড আইভরি, রেড এম্পেরর বা চাকাপাত, ব্যানানা ম্যাংগো, কার্টিমন, কিউজাই, রেড লেডি, আপেল ম্যাংগো, মিয়াজাকি বা সূর্যডিম; অস্ট্রেলিয়ান কেনসিংটন প্রাইড, হানিডিউ, আরটুইটুসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশি আমের চাষ করা হচ্ছে

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৩, ০৬:০৫

খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভূয়াছড়ি এলাকার আমচাষি মংশিতু চৌধুরীর বাগানে এবারও থোকায় থোকায় ধরেছে নানা জাতের মনলোভা বিদেশি রঙিন আম। আমেরিকান পামলার, রেড আইভরি, রেড এম্পেরর বা চাকাপাত, ব্যানানা ম্যাংগো, কার্টিমন, কিউজাই, রেড লেডি, আপেল ম্যাংগো, মিয়াজাকি বা সূর্যডিম; অস্ট্রেলিয়ান কেনসিংটন প্রাইড, হানিডিউ, আরটুইটুসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশি আমের চাষ করেছেন তিনি। প্রচলিত দেশি আমের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয় এসব আম। পাহাড়ি জমিতে বিদেশি জাতের আম চাষে পুরোপুরি সময় দিতে সরকারি চাকরি ছেড়েছেন মংশিতু চৌধুরী। অন্যদিকে, বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের বসন্তপাড়ার তয়ো ম্রো গড়ে তুলেছেন জনপ্রিয় বিদেশি ফল ড্রাগনের বিশাল বাগান। একইভাবে রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার সাপমারার মধ্যমপাড়ার গ্রামের মিল্টন চাকমাও বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন এ ড্রাগন ফল।

এদের দেখে তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে এখন অনেকেই দেশি ফলের চেয়ে বেশি উৎসাহী হয়ে  বিভিন্ন ধরনের বিদেশি ফল চাষাবাদ করছেন। উপযোগী মাটি ও আবহাওয়ায় অধিক ফলন এবং বেশি চাহিদা ও লাভজনক হওয়ায় পাহাড়ে বিদেশি ফল চাষাবাদে  ঝুঁকছেন বাসিন্দারা।

তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ৪০ হাজার ছোটবড় উদ্যোক্তা ফল চাষে যুক্ত হয়েছেন। তাদের হাত ধরে পাহাড়ি এলাকায় আম, কলা, কাঁঠাল, পেঁপে, আনারস, কমলাসহ ৪৪ জাতের ফল উত্পাদিত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, সারা দেশে উত্পাদিত ফলের প্রায় ১৫ শতাংশ এখন আসে এই তিন পার্বত্য জেলা থেকে। পাহাড়ের ফল এখন পাওয়া যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তিন পার্বত্য জেলায় উৎপাদিত মোট ফলের প্রায় ৮১ শতাংশই ছয়টি ফল-আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, আনারস ও কমলা। এই ছয়টি ফল ১৪ লাখ ৬৭ হাজার ৫৯৪ টন উৎপাদিত হয়ে থাকে। এসব ফল ছাড়াও এখন ড্রাগন, কাজুবাদাম, জলপাই, আপেল কুলসহ ৩৮টি ফল উত্পাদিত হয়।

তিন জেলার ফলচাষি, কৃষিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তাদের মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির কল্যাণে জুমচাষ ছেড়ে স্থায়ী বাগান করার প্রবণতা ও বিপণন আগের চেয়ে সহজ হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে ফল চাষ বাড়ছে। পাশাপাশি শিক্ষিত উদ্যমী তরুণেরা এই খাতে আসায় নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হয়েছে।

দুই দশক আগেও পাহাড়ে বাণিজ্যিকভাবে ফল চাষ হতো না। ২০০৪ সাল থেকে মূলত বাণিজ্যিকভাবে ফলের বাগান করা শুরু হয়। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ফলবাগানের সংখ্যা। পাহাড়ি জমিও ফল চাষের আওতায় আসতে থাকে। ২০১৭ সালে প্রায় ৯২ হাজার হেক্টর জমিতে ১৫ লাখ ৫৯ হাজার টন ফল উত্পাদিত হয়। ছয় বছরের মাথায় উত্পাদন ১৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায়  ২০ লাখ টনে। ফল চাষে জমির পরিমাণ ১ লাখ হেক্টর। তিন পার্বত্য জেলায় সবচেয়ে বেশি ফল উত্পাদিত হয় বান্দরবান জেলায়। গত বছর প্রায় ৯ লাখ টন ফল উত্পাদিত হয়েছে এই জেলায়। ফল উত্পাদনে দ্বিতীয় অবস্থান রাঙ্গামাটির, প্রায় সাড়ে ৬ লাখ টন। আর খাগড়াছড়িতে উত্পাদিত হয় প্রায় ৪ লাখ টন। এ বছর উত্পাদনের পরিমাণ আরো বেড়েছে।

বিভিন্ন জাতের বিদেশি আম, ড্রাগন ছাড়াও পার্বত্য জেলায় রাম্বুটান, ভিয়েতনামি  সুপার আর্লি জ্যাকফ্রুট (কাঁঠাল) ইত্যাদি বিদেশি ফলেরও কমবেশি চাষাবাদ হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ফল উত্পাদনের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হলেও পার্বত্য জেলায় উত্পাদিত ফলের বিপণন, সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থায় রয়েছে ব্যাপক সমস্য। বাগানি ও ব্যবসায়ীরা জানান, ফল সংরক্ষণের কোনো হিমাগার না থাকায় প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার ফল নষ্ট হয়। এছাড়া সংরক্ষণের সুবিধা না থাকায় অনেক সময় সস্তায়ও ফল বিক্রি করে দিতে হয়। সমতলে ফল পরিবহনে রয়েছে ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি। এছাড়া পার্বত্য এলাকার পাহাড়ি আঞ্চলিক সংগঠনগুলোকেও দিতে হয় নির্দিষ্ট হারে চাঁদা।

পার্বত্য এলাকায় দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (অব.) ড. জুলফিকার আলী ফিরোজ বলেন, পাহাড়ে ফল উত্পাদনের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। তিন পার্বত্য জেলাকে ফ্রুট জোন ঘোষণা এখন সময়ের ব্যাপার। তিনি বলেন, ফল আবাদ, বিপণন ও পরিবহনে সরকারি ব্যবস্থাপনা জরুরি। ফল গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হলে এখানে আরো নতুন নতুন ফলের চাষাবাদ বৃদ্ধি পাবে। বিদেশি ফল চাষের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘যে যেভাবে পারছে দেশের বাইরে থেকে নতুন নতুন ফল ও জাত নিয়ে আসছে। এটি উত্সাহজনক হলেও কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কি না, বা আমাদের পরিবেশের জন্য অনুপযোগী কি না—এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কিশোর কুমার মজুমদার বলেন, ‘দাম বেশি হওয়ায় বিদেশি জাতের আম চাষে ঝুঁকছেন কৃষক। এবার ব্যানানা ম্যাংগোর আড়াই হাজার ও কাটিমন আমের ৩ হাজার চারা করেছি।’

খাগড়াছড়ি হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক কৃষিবিদ কিশোর কুমার মজুমদার জানান, খাগড়াছড়ি জেলার ভূমির গঠন ও আবহাওয়া আম উত্পাদনের জন্য অনুকূল। উৎপাদন গত বছরের চেয়ে বেশি হবে। জেলায় এবার ৩ হাজার ৭৯৩ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হয়েছে। হেক্টরপ্রতি উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ১২ টন। সেই হিসেবে উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪৫ হাজার ৫২০ মেট্রিক টন। যার বাজারমূল্য প্রায় ২ হাজার ২৭৫ কোটি টাকা। এখানে চাষাবাদ হওয়া আমের সিংহভাগই বিদেশি জাতের। 

বান্দরবানের পাহাড়ে চাষ হচ্ছে বিদেশি ফল ড্রাগন। উপযুক্ত পরিচর্যা পাওয়ায় পাহাড়ি মাটিতে ড্রাগনের আশানুরূপ ফলন মিলছে। এই ফলটি দেখতেও বেশ সুন্দর। পাহাড়ি জমিতে ড্রাগন চাষে সফল হয়েছেন, এমন চাষিদেরই একজন চিম্বুক পাহাড়ে বসন্তপাড়ার তয়ো ম্রো। তয়ো ম্রোর ৫০ শতকের টিলা জমিতে ৭০টি খুঁটিতে রয়েছে ড্রাগনগাছ। ৭০টি খুঁটিতে ৩০০ চারা থেকে ১৫ মণ ড্রাগন ফল পেয়েছি। বিক্রি করে লাভ হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, রাঙ্গামাটিতে হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে ২০১৪ সালে ড্রাগন চাষ শুরু হয়। পরে পরীক্ষামূলকভাবে কৃষকদের ড্রাগন চাষে উদ্বুদ্ধ করা হয়। লাভজনক হওয়ায় ২০১৯ সাল থেকে পাহাড়ের কৃষকরা ড্রাগন চাষ শুরু করেন। পার্বত্য জেলাসহ রাঙ্গামাটিতে সাম্প্রতিক সময়ে ড্রাগন চাষে বেশ সফলতা মিলছে। ড্রাগন চাষের জন্য পার্বত্য এলাকার মাটি ও পরিবেশ বেশ উপযোগী হওয়ায় রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম। কৃষকরা সহজে ড্রাগন চাষ করে লাভবান হতে পারেন। রাঙ্গামাটি ছাড়াও তিন পার্বত্য জেলায় প্রতি বছর ড্রাগন ফলের চাষ বাড়ছে। বর্তমানে রাঙ্গামাটিতে ১৫ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ হচ্ছে।

ইত্তেফাক/এসটিএম